মাছাপুচ্ছ্রে অভিযানে শেরপাদের অদ্বিতীয় নেতৃত্ব ও তিলক লিম্বুর সংকট
পর্বতারোহণের জগতে শেরপা সরদারদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আনুষ্ঠানিক দলনেতা থাকলেও পর্বতের কঠিন পথে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন শেরপারাই। কারণ, পর্বতের প্রতিটি ফাটল, ধেয়ে আসা তুষারঝড়ের তাণ্ডব সম্পর্কে তাদের গভীর জ্ঞান ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। শেরপারা পর্বতের মেজাজ-মর্জি বুঝতে সক্ষম, তারা জানেন কোন পথে এগোতে হবে আর কখন ফিরলে বিপদ এড়ানো যায়। তাদের নির্দেশনা ছাড়া অভিযাত্রীদের প্রতিটি পদক্ষেপই ঝুঁকিপূর্ণ। একটি সফল অভিযানের জন্য কেবল শক্তি বা সাহসই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন তাৎক্ষণিক ও সঠিক সিদ্ধান্ত। তাই শেরপার নির্দেশ অমান্য করা নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলা বলে গণ্য হয়।
তিলক লিম্বু: নেপালি শেরপাদের নীরব নেতা
মাছাপুচ্ছ্রে অভিযানে শেরপাদের নেতৃত্বে আছেন তিলক লিম্বু। তিনি অল্পভাষী, বেশিরভাগ সময় চুপচাপ থাকেন এবং প্রয়োজন হলে হাতের ইশারায় নির্দেশ দেন। তার চোখের চাহনিতেই তরুণ শেরপারা বুঝে ফেলেন কী করতে হবে। তিলকের প্রতি দলের শেরপাদের অগাধ শ্রদ্ধা রয়েছে, সেই শ্রদ্ধাবোধ থেকেই তারা বিনা প্রশ্নে তার সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। কিছুক্ষণ আগেই তিনি নিচে নেমে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, এবং সব শেরপারা তা মেনে নিয়েছেন।
তিলক চলে যাওয়ার পর চারজন অভিযাত্রী তাঁবুর ভেতরে গুটিসুটি মেরে বসে আছেন। ঠান্ডায় হাত-পা জমে আসছে, সবাই কম্বল ও জ্যাকেট জড়িয়ে শরীর গরম রাখার চেষ্টা করছেন। বাইরে হিমেল হাওয়া বইছে, তুষারঝড়ের তাণ্ডবে পর্বত কাঁপছে। তাঁবুর কাপড় থরথর করে কেঁপে উঠছে, যেকোনো মুহূর্তে ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। চার্জ লাইটের ক্ষীণ আলোয় অভিযাত্রীদের মুখে উত্তেজনা ও দুশ্চিন্তা স্পষ্ট।
স্বপ্নের চূড়া বনাম নিরাপত্তা: একটি কঠিন সিদ্ধান্ত
অভিযাত্রীদের দীর্ঘ দিনের পরিশ্রম ও স্বপ্ন এখন তিলক লিম্বুর উপর নির্ভর করছে। মাছাপুচ্ছ্রে চূড়ায় ওঠার জন্য তারা এত দূর এসেছেন, কিন্তু শেষ ধাপটি এখনো বাকি। সেই শেষ ধাপের দরজা খুলে দেওয়ার চাবি তিলকের হাতে। তার একটি সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে তারা স্বপ্নের চূড়ায় পৌঁছাবেন, নাকি নিচে ফিরে যাবেন। তিলক যদি আর এগোতে রাজি না হন, তবে অভিযান থেমে যাবে, যা কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, সম্মানহানিকরও হবে। নেপাল সরকার ও আন্তর্জাতিক মহলে এই অভিযান ব্যর্থ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।
চার্জ লাইটের মৃদু আলোয় তাঁবুর ভেতরে ভৌতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তিলকের সতর্কবার্তায় সবাই আতঙ্কিত, বিশেষ করে নেপালি অভিযাত্রীদের ধর্মীয় অনুভূতি জড়িত থাকায় তারা বেশি উদ্বিগ্ন। ইখতিয়ার হামিম বললেন, 'তিলক আমাদের পথপ্রদর্শক, তার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করা বিপদ ডেকে আনা। কিন্তু এতদূর এসে ফিরে গেলে অভিযান অর্থহীন হয়ে পড়বে।' রিনজো খড়কা পরামর্শ দিলেন, 'তিলককে শান্তভাবে বোঝানো দরকার, বিশ্বাস দেখালে তিনি সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেন।' সবাই মিলে ঠিক করলেন, তিলকের সঙ্গে ধৈর্য ধরে কথা বলতে হবে।
ধূপের গন্ধ: একটি রহস্যময় ঘটনা
বাইরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। তিলক লিম্বু লক্ষ্য করলেন, আজকের ঝড় অস্বাভাবিক, কারণ সাধারণত রাতে এমন তাণ্ডব দেখা যায় না। তিনি তাঁবুর ফাঁক দিয়ে বাইরে মুখ বাড়াতেই বিস্মিত হয়ে বললেন, 'ধূপের গন্ধ পাচ্ছি... তোমরা টের পাচ্ছ?' অন্যরা থমকে গেলেন, এত উচ্চতায় ধূপের গন্ধ আসা অসম্ভব বলে মনে হলেও পবন থাপাও নিশ্চিত করলেন গন্ধের উপস্থিতি। রিনজো খড়কা ব্যাখ্যা দিলেন, 'বেসক্যাম্পে কেউ ধূপ জ্বালালে তার গন্ধ বাতাসে ভেসে এসেছে, এটা স্বাভাবিক।' কিন্তু তিলক জোর দিয়ে বললেন, 'এই ধোঁয়া নিচ থেকে আসেনি, পর্বতের উপরেই উৎপত্তি হয়েছে।'
ইখতিয়ার হামিমের কূটনৈতিক চাপ
ইখতিয়ার হামিম উপলব্ধি করলেন, নেপালি অভিযাত্রীদের যুক্তিতে তিলকের মন গলবে না। তিনি সরাসরি তিলককে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'আমরা বাংলাদেশিরা ফিরে গেলে সমস্যা হবে না, কিন্তু তোমরা নেপালের নাগরিক, জীবিকা পর্বতারোহণের উপর নির্ভরশীল। সরকার যদি প্রমাণ পায় তোমাদের কারণে অভিযান ব্যর্থ হয়েছে, তবে নেপালে বসবাস কঠিন হয়ে পড়বে, পর্বতারোহণের পারমিটও বাতিল হতে পারে।' তার যুক্তি শুনে তিলকসহ সবাই নীরব হয়ে গেলেন। তিলকের চোখে-মুখে রাগ মিলিয়ে গেল, তিনি চুপচাপ বসে ভাবতে লাগলেন।
শৈলজিত রায় প্রশ্ন করলে তিলক বললেন, 'আমি তাঁবুতে ফিরে যাচ্ছি, শেরপাদের মতামত নিয়ে সকালে সিদ্ধান্ত জানাব।' ইখতিয়ার হামিম সম্মতি জানালেন, এবং দল অপেক্ষা করতে লাগল আগামী সকালের জন্য। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে শেরপাদের নেতৃত্ব, নিরাপত্তা চিন্তা ও বাস্তবতার চাপে তিলক লিম্বুর সিদ্ধান্ত কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
