পিরামিড শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মিসরের বিশাল ধূসর মরুভূমি, মমির রহস্যময় গল্প ও ফারাওদের দেশ। সাধারণ ধারণা, পিরামিডের দেশ মানেই মিসর। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পিরামিড মিসরে নয়, বরং সুদানে অবস্থিত।
সুদানের পিরামিড সংখ্যা
মিসরে যেখানে ১০০ থেকে ১৩৮টি পিরামিড আবিষ্কৃত হয়েছে, সেখানে সুদানে পাওয়া গেছে প্রায় ২৫৫টি। অর্থাৎ মিসরের দ্বিগুণের বেশি। এই পিরামিডগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে কুশ সাম্রাজ্য বা প্রাচীন নুবিয়ান সভ্যতার ইতিহাস।
কে বানিয়েছিল এই পিরামিড?
মিসরের পিরামিড ফারাওরা বানালেও সুদানের পিরামিড বানিয়েছিলেন প্রাচীন কুশ সাম্রাজ্যের রাজা ও রানিরা। এই সাম্রাজ্য নুবিয়ান সভ্যতা নামেও পরিচিত। ইতিহাসবিদদের মতে, ২৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কুশ সাম্রাজ্য নীল নদের অববাহিকায় রাজত্ব করেছিল। এই সাম্রাজ্যের রাজারা এতটাই শক্তিশালী ছিলেন যে তাঁরা একসময় মিসর দখল করে প্রায় ১০০ বছর রাজত্ব করেছিলেন। ইতিহাসে তাঁদের 'কালো ফারাও' বলা হয়।
মজার ব্যাপার হলো, মিসরীয়রা যখন পিরামিড বানানো ছেড়ে দিয়েছিল, তারও প্রায় ৫০০ বছর পর কুশ সাম্রাজ্যের রাজারা নতুন করে পিরামিড বানানো শুরু করেন। প্রাচীন মিসরীয় সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাঁরা মৃত রাজা-রানিদের সম্মান ও পরকালের জন্য মমি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে পিরামিড নির্মাণ করেন।
মিসরের চেয়ে আলাদা কোথায়?
সংখ্যায় বেশি হলেও সুদানের পিরামিডগুলো মিসরের গিজার পিরামিডের মতো বিশাল নয়। মিসরের বড় পিরামিড প্রায় ৪৫৩ ফুট উঁচু হলেও সুদানের পিরামিডের উচ্চতা ২০ থেকে ৯৮ ফুটের মধ্যে। তবে আকারে ছোট হলেও গঠন আলাদা ও আকর্ষণীয়। এগুলো মিসরের পিরামিডের চেয়ে বেশি খাড়া। ইতিহাসবিদদের মতে, এগুলো বানাতে 'শাদুফ' নামে একধরনের কাঠের ক্রেন ব্যবহার করা হতো, যা পানি তোলার যন্ত্র। পিরামিডের ভিত সরু হওয়ায় এত খাড়াভাবে বানানো সম্ভব হয়েছিল।
আরেকটি বড় পার্থক্য হলো, মিসরের পিরামিডের ভেতরে গুপ্তকক্ষ বা সমাধিকক্ষ থাকত, যেখানে মমি রাখা হতো। কিন্তু সুদানের পিরামিডের ভেতর ফাঁকা নয়; পুরোটাই মাটি ও পাথরের টুকরা দিয়ে ঠাসা। আসল সমাধিকক্ষ পিরামিডের নিচে মাটির গভীরে, যেখানে মাটির নিচ দিয়ে লুকানো সিঁড়ি তৈরি করা হতো।
শুধু রাজা নন, রানিরাও
কুশ সাম্রাজ্যের রানিরা ছিলেন অত্যন্ত পরাক্রমশালী। ইতিহাসে তাঁদের 'কান্ডাক' বা 'ক্যান্ডেস' বলা হতো। এই সাহসী রানিরা রোমান সাম্রাজ্যের আক্রমণের বিরুদ্ধে রাজ্য রক্ষা করেছিলেন। সুদানের পিরামিডের নিচে শুধু রাজাদের নয়, বীর রানিদের সমাধিও অত্যন্ত মর্যাদায় তৈরি করা হয়েছিল। তাঁদের সমাধিকক্ষে সোনা, রুপা ও ব্রোঞ্জের অলংকার ও তৈজস দেওয়া হতো, যাতে পরকালেও রানির মতো জীবন কাটাতে পারেন।
পিরামিডের এক অজানা রাজধানী
সুদানের বেশির ভাগ পিরামিড একসঙ্গে মেরোউ নামক স্থানে পাওয়া যায়। এটি ছিল প্রাচীন কুশ সাম্রাজ্যের রাজধানী। এখানে লালচে বেলেপাথরের বুকে প্রায় ২০০ পিরামিড মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মরুভূমির রোদে এই দৃশ্য অদ্ভুত সুন্দর। ২০১১ সালে ইউনেসকো মেরোউ শহরকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়।
গুপ্তধন শিকারিদের নির্মম হামলা
সুদানের পিরামিডের ছবিতে অনেকের চূড়া ভাঙা দেখা যায়। এর পেছনে করুণ ইতিহাস আছে। ১৮৩০-এর দশকে ইতালিয়ান গুপ্তধন শিকারি গিউসেপে ফেরলিনি সুদানে এসে ডিনামাইট দিয়ে প্রায় ৪০টি পিরামিডের চূড়া গুঁড়িয়ে দেন, সোনা-দানার লোভে। যদিও তেমন গুপ্তধন পাননি, কিন্তু প্রাচীন সভ্যতার অমূল্য নিদর্শনের অপূরণীয় ক্ষতি করেন।
কেন সুদানের পিরামিড অবহেলিত?
মিসরের পিরামিডে প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক গেলেও সুদানের পিরামিড আড়ালে রয়ে গেছে। এর কারণ সুদানের দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধ ও যোগাযোগব্যবস্থার অভাব। দুর্গম মরুভূমির মধ্যে থাকায় পর্যটকদের জন্য যাওয়া কঠিন ও বিপজ্জনক ছিল। তবে এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমীরা মিসরের পাশাপাশি সুদানের কালো ফারাওদের রাজত্ব দেখতে যাচ্ছেন।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক



