মানুষের দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। জন্মের পর থেকেই প্রতিটি মানুষ একদিন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মৃত্যু একজন মুমিনের জন্য ভয়ের বিষয় নয়; বরং এটি তার প্রভুর সান্নিধ্যে পৌঁছার এক মহিমান্বিত যাত্রা। ইসলামি বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের জন্য শুধু আকাশের দরজাই নয়, বরং জমিনের বক্ষও উন্মুখ হয়ে থাকে। এমনকি কবরও অপেক্ষা করে থাকে সেই সৌভাগ্যবান মুমিনের জন্য, যে ইমান, তাকওয়া ও নেক আমলের পাথেয় নিয়ে রবের দরবারে উপস্থিত হয়।
কবরও মুমিনের আগমনের প্রতীক্ষায়
যখন কোনো সত্যিকারের মুমিন ব্যক্তি পৃথিবীর জীবন শেষ করে পরকালের পথে যাত্রা করেন, তখন তার জন্য শুধু ফেরেশতারাই নয়, কবরও আনন্দিত হয়। বর্ণিত হয়েছে যে, কবরস্থানের প্রতিটি অংশ আকাঙ্ক্ষা করতে থাকে— ‘হায়! যদি এই নেককার বান্দাকে আমার বুকে স্থান দেওয়া হতো!’ এটি মুমিনের মর্যাদা ও সম্মানের এক অনন্য চিত্র। কারণ যে ব্যক্তি দুনিয়াতে আল্লাহর আনুগত্যে জীবন অতিবাহিত করে, তার জন্য মৃত্যুর পরের আবাসও হয়ে ওঠে প্রশান্তি, রহমত ও নূরের ঠিকানা।
ইবনু আসাকির, তারীখু দামাশক-এ বর্ণিত আছে— ‘যখন কোনো মুমিনকে দাফনের জন্য আনা হয়, তখন কবরস্থানের বিভিন্ন অংশ একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এবং প্রত্যেকটি অংশ কামনা করে যে তাকে যেন আমার মধ্যেই দাফন করা হয়।’
কুরআনের আলোকে মুমিনের জন্য সুসংবাদ
কুরআনে নেককারদের জন্য সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। সুরা ফুসসিলাতের ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন: ‘নিশ্চয় যারা বলে, ‘আমাদের রব আল্লাহ’, অতঃপর তার উপর অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতারা অবতীর্ণ হয়ে বলে— তোমরা ভয় কর না, চিন্তিত হয়ো না; আর তোমরা সেই জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেওয়া হয়েছিল।’
এছাড়া সুরা আল-ফজরের ২৭-৩০ আয়াতে প্রশান্ত আত্মাকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে: ‘হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার রবের কাছে ফিরে এসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।’
হাদিসের আলোকে কবরের অবস্থা
হাদিসে কবরকে জান্নাতের বাগান বা জাহান্নামের গর্ত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিরমিজি ২৪৬০ নম্বর হাদিসে এসেছে: ‘কবর হয় জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান, অথবা জাহান্নামের গর্তসমূহের একটি গর্ত।’
মুমিনের জন্য কবরের প্রশস্ততা সম্পর্কে বুখারি ১৩৭৪ ও মুসলিম ২৮৭০ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: ‘অতঃপর তার কবর তার দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রশস্ত করে দেওয়া হয়।’
মৃত্যুর পরের প্রস্তুতি
কবর কোনো ভীতিকর অন্ধকার গহ্বর নয়; বরং এটি একজন মুমিনের জন্য আখিরাতের প্রথম শান্তির নিবাস হতে পারে। যে ব্যক্তি ইমান, তাকওয়া, ইখলাস ও নেক আমলের মাধ্যমে জীবনকে সাজায়, তার জন্য কবরও অপেক্ষায় থাকে, রহমতের দরজা খুলে যায় এবং ফেরেশতারা সুসংবাদ নিয়ে আসে। তাই আমাদের প্রকৃত প্রস্তুতি হওয়া উচিত দুনিয়ার চাকচিক্যের জন্য নয়, বরং সেই দিনের জন্য— যেদিন আমরা কবরে অবতরণ করব এবং আমাদের আমলই হবে একমাত্র সঙ্গী।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ইমানের সঙ্গে জীবন অতিবাহিত করার এবং ঈমানের সঙ্গেই কবরে অবতরণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।



