আল্লাহ তাআলার অশেষ রহমতের একটি বিশেষ দিক হলো, তিনি তার বান্দাদের জন্য নেকি অর্জনের পথকে সহজ করে দিয়েছেন। ইসলামে এমন অনেক আমল রয়েছে, যা করতে সময়, অর্থ বা বিশেষ পরিশ্রমের প্রয়োজন হয় না; অথচ এর প্রতিদান অত্যন্ত বড়। একজন মুমিন যদি আন্তরিকতা ও বিশুদ্ধ নিয়তের সঙ্গে এসব আমল পালন করেন, তাহলে অল্প সময়েই তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও বিপুল সওয়াব লাভ করতে পারেন। তাই প্রতিদিনের জীবনে ছোট ছোট নেক আমলকে অবহেলা না করে গুরুত্ব দেওয়া একজন সচেতন মুসলমানের দায়িত্ব।
অল্প আমলের বিশাল প্রতিদান
আল্লাহ তাআলা বলেন—مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا ‘যে ব্যক্তি একটি নেক কাজ নিয়ে আসবে, সে তার দশগুণ প্রতিদান পাবে।’ (সুরা আল-আনআম: আয়াত ১৬০) এ আয়াত প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তাআলা সামান্য নেক কাজেরও বহুগুণ প্রতিদান দেন।
১. বিশুদ্ধ নিয়তে সামান্য দান
দান বড় অঙ্কের হতে হবে— এমন কোনো শর্ত নেই। বরং আল্লাহর কাছে দানের মূল্য নির্ধারিত হয় নিয়ত ও আন্তরিকতার ভিত্তিতে। হাদিসে পাকে এসেছে—مَنْ تَصَدَّقَ بِعَدْلِ تَمْرَةٍ مِنْ كَسْبٍ طَيِّبٍ... ‘যে ব্যক্তি হালাল উপার্জন থেকে একটি খেজুর পরিমাণ দান করে, আল্লাহ তা গ্রহণ করেন এবং তা লালন-পালন করতে থাকেন, এমনকি তা পাহাড়সম হয়ে যায়।’ (বুখারি)
২. রোজাদারকে ইফতার করানো
রোজাদারকে একটি খেজুর বা এক গ্লাস পানি দিয়েও ইফতার করানো যায়। অথচ এর প্রতিদান অত্যন্ত মহান। হাদিসে পাকে এসেছে—مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ ‘যে কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে।’ (ইবনে মাজাহ)
৩. তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো
মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণে সাহায্য করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। হাদিসে পাকে এসেছে— ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমকে পানি পান করায়, সে যেন একজন দাস মুক্ত করার সওয়াব লাভ করে।’ (ইবনে মাজাহ)
৪. মানুষের উপকারে এগিয়ে আসা
সাহায্য শুধু অর্থ দিয়ে হয় না; পরামর্শ, শ্রম, সময় ও আন্তরিকতাও সাহায্যের অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে যায়, তার এ কাজ বহু বছরের ইতিকাফ থেকেও উত্তম হতে পারে।’ (আল মু’জাম আল আওসাত)
৫. বিপদগ্রস্তকে সান্ত্বনা দেওয়া
দুঃখের সময়ে কারও পাশে দাঁড়ানো এবং তাকে সান্ত্বনা দেওয়া অত্যন্ত মহৎ আমল। হাদিসে পাকে এসেছে—مَنْ عَزَّى مُصَابًا فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ ‘যে ব্যক্তি কোনো বিপদগ্রস্তকে সান্ত্বনা দেয়, সে তার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করে।’ (ইবনে মাজাহ)
৬. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা
ছোট একটি কাজ হলেও এটি ইসলামের দৃষ্টিতে সদকা। হাদিসে পাকে এসেছে—إِمَاطَةُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ ‘পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া সদকা।’ (মুসলিম)
৭. অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া
রোগীর খোঁজখবর নেওয়া শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং বড় ধরনের ইবাদতও। হাদিসে পাকে এসেছে— ‘যে ব্যক্তি অসুস্থ মুসলমানকে দেখতে যায়, তার জন্য সত্তর হাজার ফেরেশতা দোয়া করতে থাকে এবং জান্নাতে তার জন্য একটি বাগান তৈরি করা হয়।’ (তিরমিজি)
৮. তাসবিহ পাঠ করা
আল্লাহর জিকির সবচেয়ে সহজ এবং সর্বাধিক সওয়াবপূর্ণ আমলগুলোর একটি। হাদিসে পাকে এসেছে—مَنْ قَالَ سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ وَبِحَمْدِهِ غُرِسَتْ لَهُ نَخْلَةٌ فِي الْجَنَّةِ ‘যে ‘সুবহানাল্লাহিল আজিম ওয়া বিহামদিহি’ পড়বে, তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছ রোপণ করা হবে।’ (তিরমিজি)
৯. হাসিমুখে মানুষের সঙ্গে কথা বলা
ইসলাম মানুষের প্রতি সুন্দর আচরণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। হাদিসে পাকে এসেছে—تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ ‘তোমার ভাইয়ের মুখোমুখি হাসিমুখে হওয়াও তোমার জন্য সদকা।’ (তিরমিজি)
আল্লাহ তাআলার রহমত এতই বিস্তৃত যে, তিনি ছোট ছোট আমলের মধ্যেও বিশাল প্রতিদান লুকিয়ে রেখেছেন। একটি হাসি, এক গ্লাস পানি, একটি সান্ত্বনার বাক্য, একটি তাসবিহ কিংবা সামান্য দান— এসবই হতে পারে জান্নাতের পথে এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যম। তাই নেক আমলকে কখনো ছোট মনে করা উচিত নয়। হয়তো এমন একটি ছোট আমলই কিয়ামতের দিন আমাদের নাজাতের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আসুন, প্রতিদিন অন্তত কিছু সহজ আমল নিয়মিত করার সংকল্প করি এবং অল্প আমলে বেশি সওয়াব অর্জনের সৌভাগ্য লাভ করি।



