উত্তর আফ্রিকার মুসলিমপ্রধান দেশ মরক্কো ইসলামের জ্ঞান, ফিকহ, আকিদা ও আধ্যাত্মিক চর্চার এক সমৃদ্ধ কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত। ইতিহাসজুড়ে দেশটি অসংখ্য আলেম, মুহাদ্দিস, ফকিহ ও সুফি মনীষীর জন্ম দিয়েছে। তাই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে— মরক্কোয় শতাব্দীর প্রাচীন ইসলামি ঐতিহ্য কী? আর মরক্কোর মুসলিমরা কোন মাজহাব অনুসরণ করেন?
মরক্কোর ধর্মীয় পরিচয়ের তিনটি ভিত্তি
মরক্কোর অধিকাংশ মুসলিম সুন্নি ইসলামের মালিকি মাজহাব অনুসরণ করেন। আকিদার ক্ষেত্রে প্রধানত আশআরি মতবাদ এবং আধ্যাত্মিক চর্চায় জুনায়েদি সুন্নি তাসাউফ অনুসৃত হয়ে আসছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই তিনটি ধারার সমন্বয়ই মরক্কোর ধর্মীয় ঐতিহ্য ও পরিচয়ের ভিত্তি গড়ে তুলেছে। মরক্কোতে ধর্মীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তিকে ‘আস-সাওয়াবিত আদ-দীনিয়্যাহ’ বা ‘ধর্মীয় ধ্রুবক’ বলা হয়। মরক্কোর রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় নীতিতেও এই তিনটি ধারাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং দেশের ধর্মীয় ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মরক্কোতে ইসলামের আগমন
সপ্তম শতাব্দীতে উত্তর আফ্রিকায় ইসলামের বিস্তারের মাধ্যমে মরক্কোতে ইসলামের আগমন ঘটে। বিশিষ্ট মুসলিম সেনাপতি উকবা ইবন নাফি (রহ.)-এর অভিযানের পর ইসলাম দ্রুত বিস্তার লাভ করে। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় আমাজিঘ (বার্বার) জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ইসলামের ন্যায়বিচার, সাম্য ও মানবিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করে। এর ফলে মরক্কো ধীরে ধীরে ইসলামি সভ্যতা, জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
কেন মালিকি মাজহাব মরক্কোতে এত প্রভাবশালী?
মালিকি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম মালিক ইবন আনাস (রহ.) (৯৩–১৭৯ হি.)। তিনি মদিনায় বসবাস করতেন এবং তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-মুওয়াত্তা’ হাদিস ও ফিকহের অন্যতম প্রাচীন সংকলন। মালিকি ফিকহের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ‘আমালু আহলিল মাদিনা’—অর্থাৎ সাহাবিদের যুগ থেকে মদিনাবাসীর ধারাবাহিক আমলকে শরয়ি দলিল হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। ইমাম মালিক (রহ.) মনে করতেন, মদিনার ধারাবাহিক আমল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তর আফ্রিকায় মালিকি মাজহাবের বিস্তারে ইমাম সাহনুন (রহ.) সংকলিত ‘আল-মুদাওয়ানাহ আল-কুবরা’ বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি আন্দালুস (মুসলিম স্পেন) থেকে আগত বহু আলেম ও মুসলিম পরিবার মরক্কোতে মালিকি ফিকহের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। মালিকি ফিকহে কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার পাশাপাশি আমালু আহলিল মাদিনা, মাসলাহা (জনকল্যাণ) এবং মাকাসিদুশ শরিয়াহ (শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্য) বিবেচনায় রেখে বহু ফিকহি মাসআলার সমাধান দেওয়া হয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকার বহু দেশে মালিকি মাজহাব দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপকভাবে অনুসৃত হয়ে আসছে।
‘আমিরুল মুমিনিন’ ও মরক্কোর ধর্মীয় নেতৃত্ব
মরক্কোর ইসলামি ব্যবস্থার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো— দেশটির বাদশাহ ‘আমিরুল মুমিনিন’ (মুমিনদের নেতা) উপাধি ধারণ করেন। ২০১১ সালের মরক্কোর সংবিধানের ৪১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাদশাহ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ধর্মীয় অভিভাবক হিসেবে দেশের ধর্মীয় ঐক্য, সুন্নি ইসলামের প্রতিষ্ঠিত ধারা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর তত্ত্বাবধানের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান আলাউয়ি রাজবংশ সপ্তদশ শতাব্দী থেকে মরক্কো শাসন করছে এবং তারা নিজেদের বংশধারাকে মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র হাসান ইবন আলী (রা.)-এর মাধ্যমে আহলে বাইতের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করে।
মরক্কো: ইসলামি জ্ঞানচর্চার এক ঐতিহাসিক কেন্দ্র
মরক্কোর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম আল-কাদি ইয়াদ (রহ.)। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আশ-শিফা’ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মর্যাদা, অধিকার ও ভালোবাসা বিষয়ক ইসলামের অন্যতম প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। এ ছাড়া ফেজ শহরে অবস্থিত আল-কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়, যা ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে ফাতিমা আল-ফিহরি (রহ.) প্রতিষ্ঠা করেন, ইউনেস্কো ও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের প্রাচীনতম ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি কুরআন, হাদিস, আরবি ভাষা ও মালিকি ফিকহের অন্যতম প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র। মরক্কোর আরেক গর্ব ইবন বতুতা (রহ.)। বিশ্বখ্যাত এই মুসলিম পরিব্রাজক মালিকি ফিকহে শিক্ষিত ছিলেন এবং ভারতসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কাজি (বিচারক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার বিখ্যাত ভ্রমণগ্রন্থ ‘আর-রিহলা’ ইসলামি ইতিহাস ও ভূগোল গবেষণার অন্যতম মূল্যবান উৎস।
মরক্কোতে কি অন্য মাজহাবের অনুসারী আছেন?
যদিও মরক্কোর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম মালিকি মাজহাব অনুসরণ করেন, তবুও দেশটিতে বসবাসরত কিছু বিদেশি মুসলিম ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে হানাফি, শাফেয়ি এবং হাম্বলি মাজহাবের অনুসারীও রয়েছেন। তবে রাষ্ট্রের সরকারি ধর্মীয় শিক্ষা, অধিকাংশ সরকারি ফতোয়া এবং ব্যক্তিগত আইন-সংক্রান্ত ফিকহি ভিত্তি মূলত মালিকি মাজহাব।
মরক্কোর ধর্মীয় পরিচয় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তিনটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত—ফিকহে মালিকি, আকিদায় আশআরি এবং আধ্যাত্মিক চর্চায় জুনায়েদি সুন্নি তাসাউফ। এই ঐতিহ্য দেশটির ইসলামি শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা, মসজিদকেন্দ্রিক কার্যক্রম এবং সামাজিক সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব রেখেছে। একই সঙ্গে মরক্কো প্রমাণ করেছে যে, ইসলামি ঐতিহ্য, জ্ঞানচর্চা এবং রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় কাঠামো পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দীর্ঘস্থায়ী একটি ধর্মীয় সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে। তাই ইসলামি সভ্যতা ও ফিকহের ইতিহাস বুঝতে চাইলে মরক্কোর মালিকি ঐতিহ্য বিশেষভাবে অধ্যয়নের দাবি রাখে।
তথ্যসূত্র: মরক্কোর সংবিধান (২০১১); আল-মুওয়াত্তা; আল-মুদাওয়ানাহ আল-কুবরা; আশ-শিফা; ইউনেস্কো; গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস; মরক্কোর আওকাফ ও ইসলামি বিষয়ক মন্ত্রণালয়; আর-রিহলা।



