বর্তমান বিশ্বে অসংখ্য মুসলিম শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, চিকিৎসা কিংবা পারিবারিক কারণে অমুসলিম দেশে বসবাস করছেন। কেউ অস্থায়ীভাবে, আবার কেউ স্থায়ীভাবে। এমন বাস্তবতায় অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে— অমুসলিম দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করা কি বৈধ? এ বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী?
ইসলামী শিক্ষার আলোকে দেখা যায়, একজন মুসলিম যেখানেই থাকুক না কেন, তার প্রথম পরিচয় হলো সে আল্লাহর বান্দা এবং ইসলামের একজন প্রতিনিধি। তাই অমুসলিম দেশে বসবাসের প্রশ্নটি শুধু নাগরিকত্ব বা পাসপোর্টের বিষয় নয়; বরং ইমান, চরিত্র, দাওয়াহ এবং ইসলামি পরিচয় রক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
অমুসলিম দেশে বসবাসের বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
অমুসলিম দেশে ব্যবসা করতে যাওয়া, চাকরি করা, অস্থায়ীভাবে থাকা, চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যাওয়া বা পড়াশোনার জন্য যাওয়া—এসব ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু স্থায়ীভাবে যদি কোনো অমুসলিম দেশের পাসপোর্ট নিয়ে থাকতে হয় বা বসবাস করতে হয়, তবে তাকে অবশ্যই দাওয়াতের নিয়তে থাকতে হবে। এ ছাড়া অমুসলিম দেশে বসবাস করা বৈধ নয়। কেননা অমুসলিম দেশে বসবাসকারীদের উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি হাদিসে কঠোর বাণী ঘোষণা করেছেন—
أَنَا بَرِيءٌ مِنْ كُلِّ مُسْلِمٍ يُقِيمُ بَيْنَ أَظْهُرِ الْمُشْرِكِينَ
‘আমি ঐ মুসলিম থেকে দায়মুক্ত যারা মুশরিকদের মধ্যে বসবাস করে।’ (আবু দাউদ ২৬৪৫, তিরমিজি ১৬০৪)
দাওয়াহর দায়িত্ব ও মুসলিম পরিচয়
অমুসলিম দেশে বা সমাজে বসবাসকারী একজন মুসলিম কেবল একজন সাধারণ নাগরিক নন; তিনি ইসলামের একজন প্রতিনিধি। মুসলিমদের আচরণ, কথা, লেনদেন, সততা ও চরিত্র দেখে অনেক মানুষ ইসলাম সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ
‘আপনি আপনার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করুন প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।’ (সুরা আন-নাহল: আয়াত ১২৫)
অতএব, একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো নিজের উত্তম চরিত্র ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য মানুষের সামনে তুলে ধরা। এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, অমুসলিম দেশে যদি কোনো মুসলিম বসবাস করতে চায়, তবে তাকে দাওয়াতের নিয়তে থাকতে হবে।
ইসলামকে উপস্থাপন করার সর্বোত্তম মাধ্যম
অনেক সময় মানুষ ইসলামের বই পড়ে নয়, বরং মুসলমানদের দেখে ইসলামকে বিচার করে। তাই একজন মুসলিম যদি মিথ্যা বলে, প্রতারণা করে বা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, তখন মানুষ শুধু তাকে নয়, ইসলামের অনুসারীদের সম্পর্কেও নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ صَالِحَ الْأَخْلَاقِ
‘আমি উত্তম চরিত্রকে পরিপূর্ণ করার জন্যই প্রেরিত হয়েছি।’ (মুসনাদে আহমদ ৮৯৫২)
তাই অমুসলিম সমাজে বসবাসকারী মুসলিমের প্রথম দাওয়াহ হলো তার চরিত্র, সততা ও আমল।
আগে নিজে ইসলাম মানতে হবে
মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করার আগে নিজেকে ইসলামের শিক্ষার আলোকে গড়ে তোলা জরুরি। নিজের জীবনে নামাজ, সততা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা ও তাকওয়া প্রতিষ্ঠিত না হলে দাওয়াহর প্রভাবও দুর্বল হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা এমন কথা কেন বলো যা নিজেরা করো না? তোমরা যা করো না তা বলা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয়।’ (সুরা আস-সাফ: আয়াত ২-৩)
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ইসলামের দাওয়াহ শুরু হয় নিজের জীবন থেকেই।
একজন মুসলিমের প্রকৃত মিশন
যেখানেই একজন মুসলিম বসবাস করুক, তার লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং মানুষের কাছে ইসলামের সত্য ও সৌন্দর্য পৌঁছে দেওয়া। এটি কেবল বক্তৃতার মাধ্যমে নয়; বরং সুন্দর ব্যবহার, সহমর্মিতা, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবসেবার মাধ্যমেও সম্ভব।
অমুসলিম দেশে বসবাসের বিষয়টি ইসলামী শরিয়তে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সূক্ষ্ম আলোচনা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট— একজন মুসলিম যেখানেই থাকুক না কেন, তাকে নিজের ইমান, ইবাদত ও ইসলামী পরিচয় অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। একই সঙ্গে উত্তম চরিত্র, সততা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে মানুষের কাছে ইসলামের প্রকৃত বার্তা পৌঁছে দিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, একজন মুসলিমের জীবনই ইসলামের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয়পত্র। তাই আমরা যেন নিজেদের আমল, চরিত্র ও আচরণের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সেই তৌফিক দান করুন। আমিন।



