দাম্পত্য জীবন কেবল ভালোবাসা ও আবেগের বন্ধন নয়; এটি দায়িত্ব, কর্তব্য, ত্যাগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক অনন্য প্রতিষ্ঠান। আধুনিক সময়ে বহু নারী শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন এবং পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রায়ই আলোচনায় আসে—স্ত্রীর উপার্জনে সংসার চালানো কি ইসলামে বৈধ? স্বামী কি স্ত্রীর আয়ের ওপর নির্ভরশীল হতে পারেন? আর কোনো নারী যদি চাকরির শর্ত হিসেবে সংসারের খরচ বহনের অঙ্গীকার করেন, তাহলে সেই অর্থ ব্যয় করা কি তার জন্য আবশ্যক?
ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলাম এ বিষয়ে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক নির্দেশনা দিয়েছে। একদিকে স্বামীর ওপর পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব আরোপ করেছে, অন্যদিকে নারীর উপার্জনের স্বাধীন মালিকানা নিশ্চিত করেছে। ফলে বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়; বরং এটি দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সম্মান ও দাম্পত্য সৌন্দর্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
স্ত্রীর উপার্জনের পূর্ণ মালিকানা
ইসলামে নারী তার উপার্জিত অর্থ, ব্যবসায়িক লাভ, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ এবং মোহরানার একক মালিক। স্বামী বা অন্য কারো সেই সম্পদের ওপর স্বয়ংক্রিয় কোনো অধিকার নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন—‘পুরুষরা যা উপার্জন করে তার অংশ তাদের জন্য এবং নারীরা যা উপার্জন করে তার অংশ তাদের জন্য।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৩২) এই আয়াত প্রমাণ করে যে নারীর উপার্জিত সম্পদের মালিকানা ইসলাম স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তা তার নিজস্ব অধিকার।
সংসারের ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব কার?
ইসলামের বিধান অনুযায়ী স্ত্রী, সন্তান এবং পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর ওপর ফরজ। স্ত্রী ধনী হোক কিংবা চাকরিজীবী— এ দায়িত্ব থেকে স্বামী মুক্ত হন না। আল্লাহ তাআলা বলেন—‘পুরুষরা নারীদের অভিভাবক, কারণ আল্লাহ তাদের একদলকে অন্যদলের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তারা নিজেদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৩৪) আরও ইরশাদ হয়েছে—‘সচ্ছল ব্যক্তি তার সচ্ছলতা অনুযায়ী ব্যয় করবে। আর যার রিজিক সীমিত, সে আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকেই ব্যয় করবে।’ (সুরা আত-তালাক: আয়াত ৭) অতএব, সংসারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব মূলত স্বামীর ওপরই ন্যস্ত।
স্ত্রীর আয় কি সংসারে ব্যয় করা আবশ্যক?
সাধারণ অবস্থায় স্ত্রীর জন্য তার উপার্জনের অর্থ সংসারে ব্যয় করা আবশ্যক নয়। তিনি চাইলে নিজের প্রয়োজন, সঞ্চয় বা অন্য যেকোনো বৈধ খাতে তা ব্যয় করতে পারেন। স্বামী তার স্ত্রীর উপার্জনের অর্থ জোরপূর্বক নিতে পারবেন না এবং সংসারে খরচ করতে বাধ্যও করতে পারবেন না। কারণ এটি স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পদ।
স্বেচ্ছায় সংসারে খরচ করলে স্ত্রী কী সওয়াব পাবেন?
স্ত্রী যদি ভালোবাসা, সহানুভূতি ও পারিবারিক কল্যাণের উদ্দেশ্যে নিজের উপার্জন থেকে সংসারে ব্যয় করেন, তাহলে তা সদকা হিসেবে গণ্য হবে এবং তিনি আল্লাহর কাছে প্রতিদান লাভ করবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—‘নারী যখন কল্যাণের উদ্দেশ্যে ব্যয় করে, তখন সে তার প্রতিদান লাভ করে।’ (বুখারি ১৪৩৭) এ কারণে স্বেচ্ছায় সংসারে সহযোগিতা করা স্ত্রীর জন্য প্রশংসনীয় ও সওয়াবের কাজ।
চাকরির অনুমতির শর্তে সংসারের খরচ বহনের অঙ্গীকার করলে
প্রশ্নে উল্লেখিত ঘটনায় স্বামী প্রথমে চাকরির অনুমতি না দিলেও পরে স্ত্রীর বেতন সংসারের কাজে ব্যয় করার শর্তে সম্মতি দিয়েছেন। যদি স্ত্রী এই শর্ত মেনে চাকরিতে যোগদান করেন, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে সেই অঙ্গীকার পূরণ করা তার জন্য আবশ্যক হবে। প্রতিশ্রুতি পূরণের নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন—‘তোমরা অঙ্গীকার পূরণ কর। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা বনি ইসরাঈল: আয়াত ৩৪) সুতরাং শর্তটি যদি বৈধ এবং পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে হয়ে থাকে, তবে তা রক্ষা করা ইসলামের নির্দেশ।
স্বামীর জন্য সতর্কতা: দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই
স্ত্রীর আয় আছে বলে স্বামী নিজের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিতে পারেন না। একজন সক্ষম পুরুষের জন্য স্ত্রীর আয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে থাকা ইসলামের আদর্শ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেন—‘নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো... তাদের ভরণপোষণ ও পোশাকের দায়িত্ব তোমাদের ওপর, যথাযথভাবে তা আদায় করবে।’ (আবু দাউদ ১৯০৫) এ হাদিসে স্বামীর দায়িত্ব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্ত্রীর সহযোগিতা: দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্য
যদিও সংসারের ব্যয়ভার বহন করা নারীর দায়িত্ব নয়, তবুও ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সহমর্মিতা, ত্যাগ ও সহযোগিতার শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—‘তারা যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তোমাদেরকে তার কিছু অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তোমরা তা আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করো।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৪) এই আয়াত আমাদের শেখায় যে স্ত্রীর স্বেচ্ছাসেবী সহযোগিতা ভালোবাসা ও আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ।
উপসংহার
ইসলামের আলোকে স্ত্রীর উপার্জিত অর্থ তার নিজস্ব সম্পদ এবং তা সংসারে ব্যয় করা তার ওপর ফরজ নয়। পরিবারের ভরণপোষণের মৌলিক দায়িত্ব স্বামীর। তবে স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় সংসারের কল্যাণে তার উপার্জন ব্যয় করেন, তাহলে তিনি সদকার সওয়াব লাভ করবেন। আর যদি চাকরি গ্রহণের সময় সংসারের খরচ বহনের শর্তে অঙ্গীকার করে থাকেন, তাহলে সেই অঙ্গীকার রক্ষা করা তার জন্য আবশ্যক। সাময়িক অভাব বা বিশেষ পরিস্থিতিতে স্ত্রীর আয় দিয়ে সংসার পরিচালনা করা জায়েজ; কিন্তু স্বামী ইচ্ছাকৃতভাবে দায়িত্বহীন হয়ে স্ত্রীর আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন—এটি ইসলামের আদর্শ নয়।



