ইবনে বতুতার চোখে বাংলা: প্রাচুর্যে ভরা নরক ও শাহজালালের সাক্ষাৎ
ইবনে বতুতার চোখে বাংলা: প্রাচুর্যে ভরা নরক

মধ্যযুগের ইতিহাসে এমন খুব কম ভ্রমণকারী আছেন, যাদের বর্ণনা আজও ইতিহাস গবেষণার নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। তাদের অন্যতম মরক্কোর কিংবদন্তি পর্যটক ইবনে বতুতা। প্রায় তিন দশক ধরে পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চল ঘুরে তিনি যেসব অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেছেন, তা শুধু ভ্রমণকাহিনি নয়—বরং সমকালীন সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতির মূল্যবান দলিল। সেই দীর্ঘ সফরের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল বাংলা ভ্রমণ। সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর সাক্ষাৎ থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের সমুদ্রবন্দর, সোনারগাঁর ঐশ্বর্য এবং বাংলার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য—সবকিছুই তার লেখায় স্থান পেয়েছে। তার চোখে দেখা সেই বাংলার গল্প আজও ইতিহাসপ্রেমীদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করে।

দীর্ঘ ২৭ বছরের বিশ্বভ্রমণ ও ‘রিহলা’ রচনা

ইবনে বতুতার পুরো নাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ। ৭০৩ হিজরি (১৩০৪ খ্রিষ্টাব্দে) মরক্কোর তানজায় তার জন্ম। পড়াশোনা শেষ হওয়ার পরই তার মনে জাগে পৃথিবী ঘুরে দেখার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। সেই স্বপ্ন পূরণে তিনি জন্মভূমি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন দীর্ঘ এক অভিযাত্রায়। একে একে ভ্রমণ করেন পশ্চিম আফ্রিকা, মিসর, সিরিয়া, হেজাজ, ইরাক, পারস্য, ইয়েমেন, বাহরাইন, তুর্কিস্তান, আফগানিস্তান, ভারতবর্ষ, চীন, মধ্য আফ্রিকাসহ বহু দেশ।

মাত্র ২৩ বছর বয়সে শুরু হওয়া এই ভ্রমণ স্থায়ী হয় দীর্ঘ ২৭ বছর। দেশে ফিরে তিনি তার অসাধারণ অভিজ্ঞতাগুলো লিপিবদ্ধ করেন বিখ্যাত ‘রিহলা’ গ্রন্থে, যার পূর্ণ নাম ‘তুহফাতুন নুযযার ফি গারাইবিল আমসার ওয়া আজাইবিল আসফার’। স্বভাবতই তিনি ছিলেন একজন কবিও। বিভিন্ন রাজদরবারে গিয়ে শাসকদের প্রশংসায় কবিতা রচনা করতেন এবং প্রাপ্ত পুরস্কার দিয়েই বহন করতেন তার দীর্ঘ সফরের ব্যয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাংলায় আগমন ও শাহজালাল (রহ.)-এর সাক্ষাৎ

ভারতবর্ষ সফরের একপর্যায়ে ইবনে বতুতা বাংলায় আসেন। ইতিহাসবিদদের মতে, তার এই সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সিলেটের মহান সাধক হজরত শাহজালাল ইয়েমেনি (রহ.)-এর সাক্ষাৎ লাভ। সে সময় বাংলার স্বাধীন শাসক ছিলেন সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ (শাসনকাল ১৩৩৮–১৩৪৯)। মালদ্বীপ থেকে টানা ৪৩ দিনের সমুদ্রযাত্রা শেষে ইবনে বতুতা চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে তিনি সিলেটে গিয়ে শাহজালাল (রহ.)-এর সাক্ষাৎ লাভ করেন। পরে বাংলার রাজধানী সোনারগাঁওও ভ্রমণ করেন।

ইবনে বতুতার চোখে চট্টগ্রাম ও সিলেট

সমুদ্রবন্দর ছেড়ে যে প্রথম জনপদে তিনি প্রবেশ করেন, তার নাম তিনি উল্লেখ করেছেন ‘সোদকাওয়াঁ’। গবেষকদের মতে, এটি বর্তমান চট্টগ্রামেরই প্রাচীন নাম বা তারই উল্লেখ। চট্টগ্রামে এসে তিনি অসংখ্য নৌকা দেখে মুগ্ধ হন। তার বর্ণনায় জানা যায়, স্থানীয় বাসিন্দারা নৌকার সাহায্যে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন। সফরের সময় চট্টগ্রামের শাসক শহরে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি দিল্লির শাসকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন বলেও ইবনে বতুতা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলার শাসক ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক বিদ্রোহী ফকিরের কথাও সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন।

অন্যদিকে, সিলেটকে তিনি উল্লেখ করেছেন ‘কামরু পাহাড়’ নামে। তার মতে, সেখানকার মানুষের চেহারা অনেকটাই তুর্কিদের মতো এবং তারা ছিল অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও কর্মঠ। সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ.) তাকে আন্তরিকভাবে বরণ করে নেন। বিদায়ের সময় একটি জোব্বা উপহার দেন এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেন—একদিন কোনো অমুসলিম শাসক এই জোব্বাটি তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবে, পরে সেটি নির্দিষ্ট এক দরবেশের হাতে পৌঁছাবে। পরবর্তী জীবনে সেই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে পরিণত হতে দেখে ইবনে বতুতা বিস্মিত হয়েছিলেন।

‘প্রাচুর্যে ভরা নরক’: বাংলা সম্পর্কে তার মূল্যায়ন

বাংলার প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৃষি উৎপাদনের প্রশংসা করলেও এখানকার আবহাওয়া তার কাছে খুব একটা সুখকর মনে হয়নি। ইবনে বতুতার ভাষ্য অনুযায়ী, খোরাসান তথা আফগানিস্তানের মানুষ বাংলাকে ‘দোজখপুর আজ নেয়ামত’, অর্থাৎ ‘প্রাচুর্যে ভরা নরক’ বলে অভিহিত করত। এর কারণ ছিল বাংলার অত্যধিক আর্দ্র আবহাওয়া। তিনি লিখেছেন, রাতের বেলা আলো ছিল খুবই সীমিত এবং চারদিকে নেমে আসত এক অদ্ভুত নীরবতা।

তবে বাংলার কৃষিসমৃদ্ধি তাকে বিস্মিত করেছিল। তার বর্ণনায় জানা যায়, এখানে প্রচুর পরিমাণে ধান উৎপাদিত হতো এবং চালের দাম ছিল অত্যন্ত কম। পৃথিবীর আর কোথাও এত সস্তায় চাল তিনি দেখেননি বলেও উল্লেখ করেন। এমনকি মাত্র আট দিরহামে একজন মানুষের পুরো বছরের খাদ্যের ব্যবস্থা হয়ে যেত বলেও তিনি লিখেছেন।

ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনি

ইবনে বতুতার ভ্রমণবৃত্তান্ত শুধু একজন পর্যটকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়; এটি মধ্যযুগের বাংলার সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিক জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার এক মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিল। তার লেখায় যেমন বাংলার প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য, কৃষি ও জনজীবনের চিত্র উঠে এসেছে, তেমনি স্থান পেয়েছে শাহজালাল (রহ.)-এর মতো আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের প্রভাবও। সাত শতাব্দী আগের সেই পর্যটকের চোখে দেখা বাংলা আজও আমাদের ইতিহাসকে নতুনভাবে জানার এবং নিজের অতীতকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার এক অনন্য সুযোগ করে দেয়।