বর্তমানে অনেক নারী উচ্চশিক্ষা, চাকরি ও ব্যক্তিগত লক্ষ্য পূরণের কারণে আগের তুলনায় দেরিতে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ফলে অনেকের ক্ষেত্রেই মাতৃত্বের সময় ৩০ বছরের কাছাকাছি বা তার পরের বয়সে চলে যাচ্ছে। এ নিয়ে অনেকের মনে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ থাকলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও সেটিই একমাত্র নির্ধারক নয়। তবে বিষয়টি সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা জরুরি।
বয়সের সঙ্গে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে
ভারতের গাইনোকোলজিস্ট ও আইভিএফ বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, একজন নারী জন্মের সময় যত ডিম্বাণু নিয়ে জন্মান, জীবনে পরে নতুন ডিম্বাণু তৈরি হয় না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু ডিম্বাণুর সংখ্যা নয়, এর গুণগত মানও কমতে থাকে। তার মতে, ২০ বছরের শুরুর দিকে প্রতি মাসে গর্ভধারণের সম্ভাবনা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ থাকে। তবে ৩০ বছরের পর থেকে এই সম্ভাবনা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে এবং ৩৫ বছরের পর হ্রাসের গতি আরও বেড়ে যায়। ৪০ বছর বয়সে এসে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা প্রায় ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
আইভিএফ কি বয়সজনিত সীমাবদ্ধতা দূর করতে পারে?
সন্তান নিতে দেরি হলে অনেকেই আইভিএফের কথা ভাবেন। আইভিএফ বা ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন হলো এমন একটি প্রজনন প্রযুক্তি, যেখানে ল্যাবরেটরিতে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলনের মাধ্যমে ভ্রূণ তৈরি করে পরে তা জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। তবে অনেকের ধারণার বিপরীতে, আইভিএফ করলেই বয়সের প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায় না।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে আইভিএফের মাধ্যমে জীবিত সন্তান জন্মের সফলতার হার প্রায় ৪৩ শতাংশ। ৩৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সে তা কমে প্রায় ৩১ শতাংশে দাঁড়ায়। আর ৪০ থেকে ৪৪ বছর বয়সে এই হার নেমে আসে প্রায় ১১ শতাংশে। অর্থাৎ আইভিএফ সহায়ক হলেও বয়সের প্রভাব পুরোপুরি দূর করতে পারে না।
বয়স বাড়ার সঙ্গে যেসব ঝুঁকি বাড়তে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩৫ বছরের পর গর্ভধারণ করলে কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে-
- গর্ভপাতের সম্ভাবনা বৃদ্ধি
- গর্ভকালীন ডায়াবেটিস
- সিজারিয়ান অপারেশনের প্রয়োজনীয়তা
- শিশুর কিছু ক্রোমোজোমজনিত জটিলতার ঝুঁকি
তবে এও সত্য যে, ৩০ বা ৩৫ বছরের পরও অসংখ্য নারী সুস্থভাবে গর্ভধারণ করেন এবং সুস্থ সন্তানের জন্ম দেন। তাই অযথা ভয় না পেয়ে সচেতনভাবে পরিকল্পনা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দেরিতে মাতৃত্বের পরিকল্পনা থাকলে কী করবেন?
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, যদি ভবিষ্যতে দেরিতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। এজন্য নিয়মিত গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া, উর্বরতা পরীক্ষা করানো এবং পরিবারে সন্তান ধারণসংক্রান্ত কোনো স্বাস্থ্যগত ইতিহাস থাকলে তা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। প্রয়োজন মনে হলে ৩৫ বছরের আগে ডিম্বাণু সংরক্ষণের বিষয়েও চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, শুধু নারীর বয়স নয়, পুরুষের বয়সও প্রজননক্ষমতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ৪৫ বছরের পর পুরুষের শুক্রাণুর গুণগত মান কমে যেতে পারে, যা গর্ভপাত বা শিশুর বিকাশগত কিছু ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেরিতে মাতৃত্ব গ্রহণ করা কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নয়। তবে এটি হওয়া উচিত সচেতন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত। নিজের স্বাস্থ্য, বয়স এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়।



