আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অপব্যবহারে লন্ডনের সাবেক ইমাম দোষী সাব্যস্ত
পূর্ব লন্ডনের সাবেক ইমাম আব্দুল হালিম খান (৫৪) আধ্যাত্মিক ক্ষমতার দোহাই দিয়ে এবং তার ধর্মীয় পদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নারী ও শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন চালানোর দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। গত সপ্তাহে লন্ডনের স্নেয়ার্সব্রুক ক্রাউন কোর্টে দীর্ঘ শুনানি শেষে জুরি বোর্ড তাকে ২১টি পৃথক অপরাধে দোষী ঘোষণা করে, যা স্থানীয় কমিউনিটিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ
আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, ২০০৪ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে টাওয়ার হ্যামলেটসের ওল্ড ফোর্ড রোডের বাসিন্দা আব্দুল হালিম খান তার ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থানকে অপব্যবহার করে এই নারকীয় অপরাধযজ্ঞ চালিয়েছেন। প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, খান নিজেকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী দাবি করতেন এবং ভুক্তভোগীদের বিশ্বাস করাতেন যে তিনি তাদের পরিবারকে ‘অশুভ শক্তি’ বা ‘কালো জাদু’ থেকে রক্ষা করতে পারেন।
এই আধ্যাত্মিক ভয়ের সুযোগ নিয়ে তিনি ১২ বছর বয়সী শিশুসহ অন্তত সাতজন ভুক্তভোগীকে নির্জন স্থানে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি করতেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে ‘জ্বিন’ দ্বারা আবিষ্ট বলে দাবি করে ভুক্তভোগীদের বিভ্রান্ত ও আতঙ্কিত করতেন, যা তার অপরাধের মাত্রাকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
অপরাধের প্রকাশ ও তদন্ত প্রক্রিয়া
আব্দুল হালিম খানের এই ভয়াবহ অপরাধের কথা প্রথম প্রকাশ্যে আসে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যখন তার কনিষ্ঠতম ভুক্তভোগী সাহস করে স্কুলের এক শিক্ষকের কাছে নিজের ওপর হওয়া নির্যাতনের বর্ণনা দেয়। এরপরই মেট্রোপলিটন পুলিশ ‘অপারেশন স্পেয়ারব্যাঙ্ক’ নামে একটি বিশেষ তদন্ত শুরু করে, যা অপরাধের গভীরতা উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তদন্ত চলাকালীন ডিটেকটিভরা ৫০ জনেরও বেশি সাক্ষীর বয়ান রেকর্ড করেন এবং ১০টি মোবাইল ফোন থেকে ডিজিটাল তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করেন, যা আদালতে দৃঢ় প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। যদিও জিজ্ঞাসাবাদে খান সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে একে তার বিরুদ্ধে ‘প্রতিশোধমূলক ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেছিলেন, কিন্তু আদালত তার সেই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে।
আদালতের রায় ও ভুক্তভোগীর প্রতিক্রিয়া
আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর আব্দুল হালিম খানকে বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে। আগামী ১৪ মে তার চূড়ান্ত সাজা ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়েছে, যা স্থানীয় কমিউনিটির মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এই রায়কে কেন্দ্র করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা আরও জোরদার করার দাবি উঠেছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপব্যবহার রোধ করা যায়।
একজন ভুক্তভোগী আদালতের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে বলেন, "এই অবিচার আমার জীবনের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে, তবে আজকের রায় প্রমাণ করে যে অপরাধী যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, সত্যের জয় অনিবার্য।" এই মামলাটি সমাজে আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শিশু ও নারী সুরক্ষার গুরুত্বকে নতুন করে তুলে ধরেছে।
