প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে কোরআন মাজিদ এখন শুধু মসজিদ, মাদরাসা বা বইয়ের তাকেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে তা সহজেই মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছে গেছে। বর্তমানে অনেক মুসলমান নিয়মিত মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে কোরআন তিলাওয়াত করেন। তবে এ ক্ষেত্রে অনেকের মনে একটি প্রশ্ন দেখা দেয়—মোবাইলের পর্দায় কোরআন দেখে তিলাওয়াত করলে কি মুদ্রিত মাসহাফ থেকে পড়ার মতো একই সওয়াব পাওয়া যায়? এই প্রশ্নের উত্তর জানা গুরুত্বপূর্ণ; কারণ ইসলাম মানুষের জন্য ইবাদতকে সহজ করতে এসেছে। তাই আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং নিয়মিত তিলাওয়াত করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এ বিষয়ে ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি জানা প্রয়োজন।
মোবাইলে কোরআন পড়ার সওয়াব
মোবাইল কিংবা কোনো ডিভাইসের স্ক্রীনে কোরআন পড়লে সওয়াব হবে। কিন্তু সরাসরি কোরআন মাজিদ তথা মাসহাফ থেকে পড়ার সওয়াব হবে না। কারণ, মোবাইলের অ্যাপ বা ডিভাইসটি সরাসরি কোরআন নয়; বরং তার প্রতিচ্ছবি মাত্র। এ প্রসঙ্গটি হাদিসের একটি বর্ণনা থেকে সুস্পষ্ট। হজরত ওসমান ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু আওস আস্ সাকাফি (রহ.) তার দাদা আওস (রা.) হতে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'কোনো ব্যক্তির মাসহাফ ছাড়া (অর্থাৎ- কোরআন দেখা ছাড়া) মুখস্থ কোরআন পড়া এক হাজার গুণ মর্যাদা সম্পন্ন। আর কোরআন মাসহাফে পড়া (অর্থাৎ- কোরআন খুলে দেখে দেখে পড়া) মুখস্থ পড়ার দু'গুণ থেকে দু' হাজার গুণ পর্যন্ত মর্যাদা রাখে।' (তাবারানি ৬০১, বায়হাকি ২২১৮, মাজমাউজ জাওয়ায়েদ ১১৬৬৮, মিশকাত ২১৬৭)
মাসহাফ দেখে পড়ার ফজিলত
ফাতোয়া হিন্দিয়ায় বলা হয়েছে, 'কোরআন মুখস্থ থেকে (অর্থাৎ না দেখে) তিলাওয়াত করা জায়েজ। তবে মাসহাফ (কোরআনের কপি) দেখে তিলাওয়াত করা অধিক পছন্দনীয়। কারণ মুখস্থ পাঠের জন্য যে 'আসবাআ' বা নির্দিষ্ট অংশে ভাগ করা পদ্ধতি প্রচলিত হয়েছে, তা পরবর্তী সময়ে উদ্ভাবিত।' আল্লামা ত্বীবী (রহ.) বলেন, 'মাসহাফ দেখে পড়া বেশি ফজিলতপূর্ণ হওয়ার কারণ হলো—এতে কোরআনের দিকে তাকানোর সওয়াব পাওয়া যায়, মাসহাফ বহন ও স্পর্শ করার আমল হয় এবং আয়াতগুলো নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা ও অর্থ অনুধাবনের সুযোগ সৃষ্টি হয়।' অর্থাৎ, এই দিকগুলো বিবেচনায় মাসহাফ দেখে পড়া বেশি উত্তম। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সব অবস্থায় মুখস্থ পড়ে তিলাওয়াতের মর্যাদা কম। কারণ হাদিসে এসেছে, কোরআনে দক্ষ ব্যক্তি সম্মানিত ফেরেশতাদের সঙ্গী হবেন। আবার কোনো হাফেজের জন্য তার হিফজ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে মুখস্থ তিলাওয়াত করা কখনো প্রয়োজনীয়ও হতে পারে।
দ্বৈত ইবাদতের কারণে সওয়াব বেশি
আল্লামা ইবনু হাজার (রহ.) বলেন, 'মাসহাফ দেখে তিলাওয়াতের সওয়াব অনেক বেশি হওয়ার কারণ হলো, এতে তিলাওয়াতের ইবাদতের সঙ্গে কোরআনের দিকে তাকানোর ইবাদতও যুক্ত হয়। অর্থাৎ একটি আমলের সঙ্গে আরেকটি আমল সংযুক্ত হয়ে যায়।' এ কারণেই কিছু আলেম বলেছেন, 'মাসহাফ দেখে তিলাওয়াত করা সর্বাবস্থায় উত্তম।' আবার অন্য কিছু আলেম বলেছেন, 'মুখস্থ থেকে তিলাওয়াত করা সর্বাবস্থায় উত্তম।' তবে সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ মত হলো— যে পদ্ধতিতে একজনের খুশু (আল্লাহভীতি), মনোযোগ, চিন্তা-গবেষণা ও ইখলাস বেশি হয়, সেটিই তার জন্য উত্তম। যদি উভয় ক্ষেত্রে তা সমান হয়, তাহলে মাসহাফ দেখে পড়া অধিক উত্তম। কারণ মাসহাফ দেখে পড়লে সাধারণত আয়াতের অর্থ নিয়ে বেশি চিন্তা ও গভীর মনোযোগ সৃষ্টি হয়, যা মুখস্থ পাঠের তুলনায় বেশি সহায়ক।
মোবাইল অ্যাপ: কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যম
কোরআন আল্লাহ তাআলার কালাম। তা কাগজে মুদ্রিত মাসহাফ থেকে পড়া হোক কিংবা মোবাইল অ্যাপের পর্দা থেকে—উভয় ক্ষেত্রেই যদি একজন মুসলিম আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তিলাওয়াত করেন, তাহলে তিনি কোরআন তিলাওয়াতের সওয়াব লাভ করবেন, ইনশাআল্লাহ। কারণ সওয়াবের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর কালাম পাঠ করা, তা থেকে হেদায়েত গ্রহণ করা এবং এর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার চেষ্টা করা। তবে সুযোগ থাকলে মাসহাফ হাতে নিয়ে আদবের সঙ্গে কোরআন তিলাওয়াত করা অধিক মর্যাদাপূর্ণ ও মনোযোগ বৃদ্ধিকারী। আর যখন মাসহাফ কাছে না থাকে, তখন মোবাইল অ্যাপ কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার একটি উত্তম মাধ্যম হতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত, তা বুঝে পড়া এবং জীবনে বাস্তবায়নের তৌফিক দান করুন। আমিন।



