চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড এবং ফেনী জেলার একাংশে গড়ে তোলা হচ্ছে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এটি প্রতিষ্ঠার জন্য জমির একটি অংশে কেটে ফেলা হয়েছিল গাছপালা। সেখানে কাটা গাছের গোড়া ও বীজ থেকে গড়ে উঠেছে বন। ৩ জুন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় ছবি: প্রথম আলো।
অর্থনৈতিক অঞ্চলের বর্তমান অবস্থা
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বড়তাকিয়া থেকে একটি পাকা সড়ক চলে গেছে ফেনী নদীর মোহনার দিকে। সেই সড়ক ধরে কয়েক কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল শুরু। এটি দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল। আয়তন ৩৩ হাজার ৮০৫ একর। ইতিমধ্যে সেখানে কিছু শিল্পকারখানার কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু ৩ জুন গিয়ে দেখা গেল, অর্থনৈতিক অঞ্চলটির বড় একটি অংশে গড়ে উঠেছে বন।
বন বিভাগ, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য সেখানে বিপুল গাছ কাটা হয়েছিল। এমন অনেক জমিতে এখনো শিল্পকারখানার কাজ শুরু হয়নি। গাছের গোড়া থেকে এবং ছড়িয়ে পড়া বীজ থেকে নতুন করে এই বন গড়ে উঠেছে।
বন বিভাগের জমি ফেরতের দাবি
সর্বশেষ গত ১১ জানুয়ারি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে দেওয়া এক চিঠিতে প্রধান বনসংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী লিখেছেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে যে কার্বন নিঃসরণ হবে, তা শুষে নিতে ভূমিকা রাখবে ৪ হাজার ১০৪ একর বনভূমির বন। উপকূলীয় অঞ্চলের জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত মোকাবিলায় এই বন প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
বন বিভাগ বলছে, অর্থনৈতিক অঞ্চলের পশ্চিম প্রান্তে ৪ হাজার ১০৪ একর জমি সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এই জমিতে গেওয়া, কেওড়া, হারগোজাসহ বিভিন্ন উদ্ভিদ জন্মেছে। এতে হরিণ, সাপসহ বিভিন্ন প্রাণী বাস করে। বিরল সামুদ্রিক ও জলচর পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে কাজ করে ওই বন।
বন বিভাগ এখন এই অব্যবহৃত জমি ফেরত চায়। এ নিয়ে চিঠি–চালাচালি চলছে।
বেজার পরিকল্পনা
বেজার ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩৩ হাজার ৮০৫ একর জমির মধ্যে সাড়ে ১৭ হাজার একর ব্যবহার করা হবে শিল্পকারখানা, বন্দর ও ব্যবসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য। খোলা জায়গা থাকবে প্রায় ৬ হাজার একর। বনায়ন ও সংশ্লিষ্ট কাজ করা হবে প্রায় ১ হাজার ৮০০ একর জমিতে। বাকি জমি রাস্তাঘাট, শিল্পাঞ্চলের আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা কাজে রাখা হবে।
অর্থনৈতিক অঞ্চলের অগ্রগতি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। এর মধ্যে সরকারি ও যৌথ উদ্যোগের পাঁচটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ এগিয়েছে। সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চলটির নাম জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এই নাম দেওয়া হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। এর আগে নাম ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর।
বেজা বলছে, জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ৪ হাজার ৮০০ একর জমি ১৪২টি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬০০ একর জমিতে কারখানা গড়ে উঠছে। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং সেখানকার কারখানা থেকে ১৫ বিলিয়ন (দেড় হাজার কোটি ডলার) ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
যদিও প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরুর পর ১০ বছর পেরিয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ প্রত্যাশিত হারে এগোয়নি। যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান জমি নিয়েছিল, তাদের বড় অংশই তা ফেলে রেখেছে। এর মধ্যেই অনেক জমি ভরে উঠেছে গাছপালায়।
প্রাকৃতিক বনের বৈচিত্র্য
জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের আয়তন ঢাকার অর্ধেকের কাছাকাছি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকা ৩০৫ বর্গকিলোমিটারের। অন্যদিকে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠছে ১৩৩ দশমিক ৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায়। ফলে পুরো অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘুরে দেখা কঠিন।
মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়ায় নেমে অর্থনৈতিক অঞ্চলের জিরো পয়েন্ট থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তৈরি করা সুপার ডাইক (সুরক্ষিত বাঁধ) ধরে দক্ষিণে ২১ কিলোমিটার গেলে ডোমখালী খাল। সেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চলের শেষ সীমানা। এ বাঁধের এক পাশে বঙ্গোপসাগর, অন্য পাশে জেগে উঠেছে বন।
দিনের বেলা হরিণ দেখা গেল না। তবে উড়তে দেখা গেল ধলা বকসহ নানা সামুদ্রিক পাখি। চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের মিরসরাই রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শাহানশাহ নওশাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সন্ধ্যা হলে এখানে হরিণের আনাগোনা বাড়ে। আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো, সেখানে ৪০০ থেকে ৫০০ হরিণ থাকতে পারে।’
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মাঝেমধ্যে সেখানে হরিণ হত্যার ঘটনা ঘটে। গত এপ্রিল মাসে হরিণ ধরে হত্যা করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় বন বিভাগ তিনজনকে অভিযুক্ত করে মামলা করেছে।
বেজার কাছে জমি হস্তান্তর
বেজার দাবি, জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জমির প্রায় ২৮ শতাংশ ছিল পতিত, ৩২ শতাংশ ছিল ম্যানগ্রোভ, গাছপালা অথবা উদ্ভিদে আবৃত এবং প্রায় ৯ শতাংশ ছিল খাল ও জলাশয়। বাকি জমি ছিল অন্যান্য শ্রেণির।
যদিও বন বিভাগ বলছে, ২০১২ সালে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের আওতাধীন ২২ হাজার ৩৩৫ একর জমি সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণার প্রক্রিয়ায় ছিল। এ–সংক্রান্ত প্রস্তাব পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। তবে পরে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জমিগুলো বেজার কাছে হস্তান্তর করে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক মো. কামাল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, একসময় চট্টগ্রামের উপকূল সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ছিল। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস হলে মূল জনপদে আঘাত করত। এ আঘাত থেকে উপকূলকে বাঁচাতে বন বিভাগ সীতাকুণ্ডের বগা চত্বর থেকে শুরু করে এ বন তৈরি করেছিল। পরে তা বিস্তৃত হয়। তিনি বলেন, ‘ছয়-সাত মাস আগে আমিও গিয়েছিলাম ওই অঞ্চলে। সেখানে সুন্দরবনের মতো একটি বন তৈরি হয়েছে। সেখানে হরিণ, অজগরের মতো প্রাণী দেখা যায় বলে স্থানীয় মানুষেরা জানিয়েছেন।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জমির একটি অংশ ফেরত পেতে চিঠি–চালাচালি শুরু করে বন বিভাগ। ওই বছর নভেম্বরে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জমির অবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যে ২২ হাজার ৩৩৫ একর জমি সংরক্ষিত বন ঘোষণার প্রক্রিয়ায় ছিল, তার মধ্যে ১৮ হাজার ২৩৫ একরে বেজা অবকাঠামো নির্মাণ করছে। গাছপালা রয়েছে ৪ হাজার ১০৪ একরে। বেজার বরাদ্দ দেওয়া জমিতে সাড়ে ১৩ লাখ গাছ কাটা হয়েছে। এসব গাছের দাম প্রায় ১৪ কোটি টাকা। মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে ৯ কোটি টাকার মতো। ৫ কোটি টাকা বকেয়া।
এই প্রতিবেদন ধরেই ৪ হাজার ১০৪ একর জমি ফেরত চেয়েছে বন বিভাগ। বন বিভাগের চিঠি পেয়ে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ভূমির তফসিল চেয়ে গত ৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বছর পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে এ–সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব এসেছে। প্রয়োজনীয় যাচাই–বাছাই শেষে আমরা তফসিল পাঠিয়ে দেব।’
বন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, তফসিল পাওয়ার পরে ভূমি মন্ত্রণালয়কে জমি ফেরত চেয়ে চিঠি দেওয়া হতে পারে। তখন সরকার সিদ্ধান্ত নেবে, জমি ফেরত দেওয়া হবে কি না।
বেজার সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি সম্প্রতি মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে গিয়েছি। যেখানে এখনো কোনো অবকাঠামো হয়নি, সেখানে কিছু বন তৈরি হয়েছে।’ তিনি বলেন, এ বিষয়ে বন বিভাগ ও বেজা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে। একসঙ্গে বসলে একটা উপায় বের হবে।
ফেরতই কি সমাধান?
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপে সোনাদিয়া ইকোট্যুরিজম পার্ক এবং টেকনাফে নাফ নদীর মোহনার জালিয়ার দ্বীপে নাফ ট্যুরিজম পার্ক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তখন জালিয়ার দ্বীপ পুরোটা ছিল স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে। অন্যদিকে সোনাদিয়া দ্বীপে বন উজাড় করে চিংড়ি চাষ ও লবণ উৎপাদন করতেন প্রভাবশালীরা।
বেজা বলেছিল, পরিবেশ, বন ও জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করে তাতে পর্যটনের ব্যবস্থা করা হবে। তখন সোনাদিয়ায় বেজার উদ্যোগে গাছ লাগানো শুরু হয়েছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনুমোদন পাওয়া ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যক্রম বাতিল করে বেজা গভর্নিং বডি। এর মধ্যে সোনাদিয়া ইকোট্যুরিজম পার্ক রয়েছে। পরের মাসেই সোনাদিয়া দ্বীপের ৯ হাজার ৪৬৭ একর জমি বন বিভাগকে ফিরিয়ে দেয় সরকার।
স্থানীয় সূত্র বলছে, বিএনপি ও জামায়াতের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা এখন সোনাদিয়ায় চিংড়ি ও লবণ চাষ নিয়ন্ত্রণ করেন। আগে করতেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা।
যদিও সোনাদিয়ায় লবণ উৎপাদন ও চিংড়ি চাষ বন্ধ হয়নি; বরং স্থানীয় মানুষেরা বলছেন, বন উজাড়ের ঘটনা বেড়েছে। ৩ জুন সোনাদিয়ায় গিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদক আব্দুল কুদ্দুস দেখেছেন, সেখানে লবণ তোলার কাজ চলছে। লবণ মৌসুম শেষে চিংড়ি চাষ শুরু হবে।
লবণচাষি আবদুল গণী প্রথম আলোর প্রতিবেদককে বলেন, কয়েকজন অংশীদার মিলে ৩০ কানি জমিতে লবণ চাষ করেছেন। প্রতি কানি (৪০ শতক) জমির জন্য এক মৌসুমে ৪০ হাজার টাকা হারে মোট ১২ লাখ টাকা ‘ইজারা’ দিতে হয়েছে দখলদারদের। এ পর্যন্ত লবণ বিক্রি করে খরচ বাদে প্রায় ১৩ লাখ টাকা লাভ হয়েছে।
সোনাদিয়ায় কোটি কোটি টাকার চিংড়ি ও লবণ উৎপাদিত হয়। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, সেই টাকার ভাগ পান প্রশাসনের লোকেরাও। সে কারণে বন কার অধীনে থাকবে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। বন রক্ষার নামে বন বিভাগ কিছু মামলা করে। তবে তা নামকাওয়াস্তে। তাতে বন রক্ষা হয় না, দোষীদের শাস্তির নজিরও নেই বললেই চলে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক মো. কামাল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জমির যে অংশটি বন বিভাগ ফেরত চায়, সেটি তাদের দেওয়া যেতে পারে। তবে তারা কেন বন রক্ষা করতে পারে না, সেই জবাবদিহিও দরকার। তিনি বলেন, দেশের জন্য বন প্রয়োজন, শিল্পও প্রয়োজন। জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকেন্দ্রিক উপকূল ধরে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে এখন থেকেই কাজ শুরু করা দরকার। সেখানে নতুন চরও হয়েছে। তাতেও বনায়ন করা যেতে পারে।



