ইসলামের ইতিহাসে কারাগার: শাস্তির স্থান নয়, মানবিক সহমর্মিতার কেন্দ্র
ইসলামের ইতিহাসে কারাগার: মানবিক সহমর্মিতার কেন্দ্র

কারাগার কেবল শাস্তির স্থান নয়, বরং এটি ছিল একটি বিচিত্র মানবসমাজের ক্ষুদ্র সংস্করণ। এখানে একদিকে অপরাধীদের সংশোধনের চেষ্টা চলত, অন্যদিকে চলত মানুষের টিকে থাকার লড়াই এবং পারস্পরিক সহমর্মিতা। ইতিহাসের এই পর্বে আমরা বন্দিদের দৈনন্দিন জীবন ও নারীর অধিকার রক্ষায় ইসলামি শাসনব্যবস্থার সংবেদনশীলতা নিয়ে আলোচনা করব।

কারাগারে মানবিক সহমর্মিতা

কারাগারে বন্দিদের জীবন শুধু কষ্টের গল্প নয়, বরং কখনও কখনও সেখানে গড়ে উঠত অভাবনীয় ভ্রাতৃত্ব। দামেস্কের আলি ইবনে হাসান হারিরি নামক এক ব্যক্তি ঋণের দায়ে কারাগারে বন্দী হন। তিনি বন্দিদের পরামর্শ দিলেন, কারও বাড়ি থেকে খাবার আসলে তা একবারে না খেয়ে সবাই মিলে জমা করতে। তারপর দুপুরে সবাই দস্তরখান বিছিয়ে একসঙ্গে খেতে বসতেন।

ইবনে ইমাদ হাম্বলি বর্ণনা করেছেন যে কারাগারে গিয়ে তিনি দেখলেন বন্দিরা ভীষণ কষ্টে আছে। হারিরি তখন বন্দিদের মাঝে এক নতুন প্রাণশক্তি সঞ্চার করেন। তিনি সবাইকে নিয়ে জামাতে নামাজ পড়তেন এবং জিকির করতেন। সবচেয়ে চমৎকার বিষয় ছিল, তিনি বন্দিদের পরামর্শ দিলেন, কারও বাড়ি থেকে খাবার আসলে তা একবারে না খেয়ে সবাই মিলে জমা করতে। তারপর দুপুরে সবাই দস্তরখান বিছিয়ে একসঙ্গে খেতে বসতেন। এভাবে কারাগারের ভেতর একটি সামাজিক সাম্য তৈরি হয়েছিল। এমনকি তারা নিজেরা চাঁদা তুলে কম সাজাপ্রাপ্ত ও দরিদ্র বন্দিদের ঋণ শোধ করে মুক্ত করে দিতেন। (ইবনে ইমাদ হাম্বলি, শাজরাতুজ জাহাব ফি আখবারি মান জাহাব, ৭/৪০৫, দারু ইবনে কাসির, বৈরুত, ১৯৮৬)

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পৃথক নারী কারাগার

নারীদের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে ইসলামি আইনশাস্ত্র শুরু থেকেই আপসহীন ছিল। উমাইয়া খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ যখন কারাগার সংস্কার করেন, তখন তিনি তাঁর প্রশাসকদের কড়া নির্দেশ দেন যেন নারীদের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক কারাগার তৈরি করা হয়। ফকিহদের মতে, নারীদের প্রহরার জন্য এমন বিশ্বস্ত নারী নিয়োগ করতে হবে যার চরিত্রে কোনো কলঙ্ক নেই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আব্বাসীয় যুগে বাগদাদে প্রতারক নারীদের জন্য বিশেষ কারাগারের উল্লেখ পাওয়া যায়। জহিরুদ্দিন বায়হাকির বর্ণনা অনুযায়ী, সমাজে নৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং নারী বন্দিদের মর্যাদা রক্ষায় এই পৃথক ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি ছিল। (জামালুদ্দিন কিফতি, ইখবারুল উলামা বি-আখবারিল হুকামা, পৃষ্ঠা ১৪২, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৫)

ফকিহ ইবনুল আজরাক গারনাতি পরামর্শ দিয়েছিলেন, যারা ভালো ঘরের নারী কিন্তু ঋণের দায়ে বন্দী হয়েছেন, তাদের যেন দাগী নারী অপরাধীদের থেকে আলাদা রাখা হয়। (ইবনুল আজরাক, বাদায়েউস সুলক ফি তাবায়েউল মুলক, ১/২১০, দারুল আরাবিয়া লিল কিতাব, তিউনিসিয়া, ১৯৯৫)

বন্দীদের কল্যাণে দান ও ওয়াক্‌ফ

মুসলিম শাসকরা এবং বিত্তবানরা অনেক সময় পুণ্য লাভের আশায় কারাগারের বন্দিদের জন্য বিশেষ দান বা ওয়াক্‌ফ করতেন। মিসরের আহমদ ইবনে তুলুন প্রতি মাসে বন্দিদের খাবারের জন্য পাঁচশ দিনার বরাদ্দ করতেন। (ইবনে খালদুন, তারিখু ইবনি খালদুন, ৪/৪১১, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৮)

মমলুক সুলতান জহির বারকুক রমজান মাসে প্রতিদিন ২৫টি গরু জবাই করে সেই মাংস এবং উন্নত মানের রুটি বন্দিদের মাঝে বিতরণ করতেন। অনেক দানবীর আবার বিশেষ তহবিল বা ‘ওয়াক্‌ফ’ গঠন করতেন, যার কাজই ছিল ঋণের দায়ে বন্দী হওয়া নিঃস্ব ব্যক্তিদের ঋণ শোধ করে জেলমুক্ত করা। (ইবনে তাগরি বারদি, আল-মানহালুস সাফি, ৩/১৮০, কায়রো, ১৯৫৬)

মুক্তির মাহেন্দ্রক্ষণ

বন্দী জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় সময় ছিল মুক্তির দিন। সাধারণত বিশেষ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় বা ধর্মীয় উৎসবের প্রাক্কালে গণহারে বন্দী মুক্তি দেওয়া হতো। খলিফা সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক তাঁর খেলাফতের শুরুতে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের হাতে নির্যাতিত হাজারো বন্দীকে মুক্তি দিয়ে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন।

এছাড়া কোনো মহামারী বা দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষার জন্য আল্লাহর কাছে অনুগ্রহ পেতেও অনেক রাজা-বাদশাহ বন্দিদের মুক্তি দিতেন। সুলতান নাসির মুহাম্মদ ইবনে কালাউনের প্রিয় অমাত্য যখন রোগমুক্ত হন, তখন সুলতান শুকরিয়া হিসেবে ৩০ হাজার দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) দিয়ে ঋণের দায়ে আটক হওয়া বন্দিদের মুক্ত করে দেন। (ইবনে তাগরি বারদি, আন-নুজুমুজ জাহিরা ফি মুলুকি মিস্‌র ওয়াল কাহিরা, ৯/১২০, দারুল কুতুব, কায়রো, ১৯৯২)

ইতিহাসের শিক্ষা

ইসলামের ইতিহাসে কারাগারের এই দীর্ঘ পরিক্রমা আমাদের দেখায় যে কারাগার মানেই কেবল মানুষের অধিকার হরণ নয়। জুলুমের বিপরীতে যখনই কোনো ন্যায়পরায়ণ শাসক এসেছেন, তিনি কারাগারকে মানবিক করার চেষ্টা করেছেন। কারাগারে ইমাম সারাখসির মতো মনীষীদের জ্ঞান সাধনা থেকে শুরু করে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের সংস্কার আমাদের শেখায়, বন্দিশালার চার দেয়ালও সত্য ও ইনসাফের পথ রুদ্ধ করতে পারে না।