বর্তমান নগরজীবনে কোরবানির পশু কেনা, লালন-পালন, জবাই ও মাংস বণ্টনের পুরো প্রক্রিয়া অনেকের কাছেই কষ্টকর ও অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এ কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে ‘অনলাইনে শরিকি কোরবানি’। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে গরুতে অংশ নেওয়া, কোরবানি সম্পন্ন করা এবং মাংস পৌঁছে দেওয়ার সেবা দিচ্ছে। ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, এভাবে অনলাইনে শরিকি কোরবানি শরিয়তসম্মত কিনা?
শরিয়তের দৃষ্টিকোণ
ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে, অনলাইনে শরিকি কোরবানি মূলত জায়েজ। কারণ, ভাগে কোরবানি দেওয়া সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সাহাবিরা এক গরুতে সাত জন শরিক হয়ে কোরবানি করেছেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘এক সফরে আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলাম। এরকম পরিস্থিতিতে কোরবানির ঈদ উপস্থিত হলো। তখন আমরা একটি গরুতে সাত জন অংশীদার হয়ে কোরবানি আদায় করলাম।’ (জামে তিরমিযী, হাদিস:১৫০১) আর অনলাইনে সমন্বয় করাও যেহেতু নিষিদ্ধ কিছু নয়, তাই শর্ত মেনে তা করা যেতে পারে। কিন্তু শর্ত হলো, এর পুরো প্রক্রিয়াটি শরিয়তসম্মত হতে হবে।
বাস্তবিক জটিলতা
তবে বাস্তবতার বিচারে এ পদ্ধতিকে ‘অনুত্তম’ বলা যায়। কারণ, প্রচলিত অনলাইন কোরবানি ব্যবস্থায় বহু সূক্ষ্ম শরয়ি জটিলতা ও অস্পষ্টতা থেকে যায়। প্রথমত, শরীকদের অর্থের উৎস। কোরবানি একটি ইবাদত; তাই এতে অংশগ্রহণকারী সবার অর্থ হালাল হওয়া জরুরি। অথচ অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সাধারণত কার অর্থ কোথা থেকে আসছে, তা যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না।
দ্বিতীয়ত, নিয়তের বিষয়। ভাগে কোরবানির ক্ষেত্রে প্রত্যেক শরীকের নিয়ত বিশুদ্ধ হওয়া আবশ্যক। কেউ যদি শুধু মাংস পাওয়ার উদ্দেশে শরিক হয়, তাহলে অন্যদের কোরবানিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু অনলাইন ব্যবস্থায় এ বিষয় যাচাই প্রায় অসম্ভব।
তৃতীয়ত, পশু ক্রয় ও মালিকানা হস্তান্তরের জটিলতা। অনেক প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই পশু কিনে রাখে, পরে অংশ বিক্রি করে। আবার কেউ শরিকদের টাকা নিয়ে পরে পশু কেনে। উভয় ক্ষেত্রেই ‘ওকালত’ (প্রতিনিধি নিযুক্ত করা), ‘কবয’ (পশু হস্তগত হওয়া) ও তার সার্ভিস চার্জের মতো শরয়ি বিষয়গুলো স্পষ্ট হয় না। অথচ, অন্যের দ্বারা কোরবানি করানোর ক্ষেত্রে এগুলো স্পষ্ট থাকা জরুরি।
এ ছাড়া অনলাইন ব্যবস্থায় কোরবানির মূল রূহ বা ত্যাগের যে অনুভূতিটা, সেটিও অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ, কোরবানি শুধু মাংস সংগ্রহ ও তা খাওয়ার নাম নয়; বরং এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একটি মহৎ ইবাদত ও ত্যাগের প্রতীক। তাই সামর্থ্য ও সুযোগ থাকলে পরিচিত, বিশ্বস্ত ও শরিয়তসচেতন ব্যক্তিদের সঙ্গে সরাসরি শরিক হয়ে কোরবানি করাই উত্তম।
পরামর্শ
তবে বিশেষ প্রয়োজন, ব্যস্ততা বা বাস্তব জটিলতার কারণে কেউ অনলাইনে শরিকি কোরবানিতে অংশ নিলে তাকে অবশ্যই বিশ্বস্ত ও শরিয়ত অনুসরণকারী প্রতিষ্ঠান বেছে নিতে হবে। পাশাপাশি নিয়ত, অর্থের উৎস ও পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে যথাসম্ভব নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
তথ্যসূত্র: আইএফএ কনসালটেন্সি ও আরও একাধিক মাধ্যম অবলম্বনে।



