দারিদ্র্য-ব্যর্থতা জয় করে হজে যাচ্ছেন সাফদার খান
দারিদ্র্য-ব্যর্থতা জয় করে হজে যাচ্ছেন সাফদার খান

ইসলামাবাদের হজ ক্যাম্পে বসে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন সাফদার খান। ৬৬ বছর বয়সী এই বৃদ্ধের চোখে-মুখে যেন একসঙ্গে মিশে ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার ক্লান্তি আর স্বপ্নপূরণের প্রশান্তি। টানা ১০ বছরের ব্যর্থ চেষ্টা, করোনা মহামারির বাধা, আর্থিক সংকট এবং প্রিয় স্ত্রীকে হারানোর গভীর শোক— সবকিছু পেরিয়ে অবশেষে এ বছর পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় যাচ্ছেন তিনি। পাকিস্তান সরকারের হজ কোটায় নির্বাচিত হওয়া সর্বশেষ হজযাত্রীও তিনি।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার শুরু

পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির বাসিন্দা সাফদার খান ২০১৬ সাল থেকেই নিয়মিত হজের আবেদন করে আসছিলেন। সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য জীবনে একবার হজ পালন ফরজ— আর সেই স্বপ্নই তাকে বারবার আবেদন করতে অনুপ্রাণিত করেছে। কিন্তু কখনো লটারিতে নাম আসেনি, আবার কখনো সুযোগ পেয়েও পরিস্থিতির কারণে যেতে পারেননি।

২০১৯ সালে বহু প্রতীক্ষার পর তিনি হজের সুযোগ পান। কিন্তু ঠিক সেই সময় বিশ্বজুড়ে আঘাত হানে করোনাভাইরাস মহামারি। কঠোর বিধিনিষেধের কারণে সৌদি আরব হজযাত্রীর সংখ্যা সীমিত করে দেয়। ফলে পাকিস্তান সরকার সাফদার খানসহ হাজারো আবেদনকারীর টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হয়। থমকে যায় তার বহু বছরের স্বপ্নযাত্রা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংকট ও শোক

এরপরের সময়টা ছিল আরও কঠিন। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর আর্থিক সংকট বাড়তে থাকে। এর মধ্যেই হারান জীবনসঙ্গিনীকে। একাকীত্ব আর অর্থকষ্ট তাকে ভেঙে দিলেও হজে যাওয়ার আশা ছাড়েননি তিনি।

ইসলামাবাদ হজ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণে এসে সাফদার খান বলেন, ‘এ বছরও আবেদনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১২ লাখ রুপি জোগাড় করতে পারিনি। ১৮ আগস্টের ডেডলাইন পেরিয়ে যাওয়ার পর মনে হয়েছিল, এবারও হয়তো আর যাওয়া হবে না।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা

তবুও শেষ চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি। বিশেষ পরিস্থিতির জন্য সংরক্ষিত হার্ডশিপ কোটায় ফেব্রুয়ারিতে আবার আবেদন করেন। সাফদার জানান, প্রথমে তাকে মেসেজে জানানো হয়েছিল যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু পরদিনই আসে আরেকটি বার্তা— যা বদলে দেয় তার জীবন। সেখানে জানানো হয়, তার আবেদন গৃহীত হয়েছে এবং দ্রুত প্রস্তুতি নিতে বলা হয়।

তবে নাটকীয়তা তখনও শেষ হয়নি। প্রথমে তাকে বলা হয়েছিল করাচি থেকে বিমানে উঠতে হবে, যা তার বাড়ি থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ কিলোমিটার দূরে। আল্লাহর ঘরে যাওয়ার আশায় সেই কষ্টও মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে জানানো হয়, ইসলামাবাদ থেকেই তার সিট নিশ্চিত করা হয়েছে।

আবেগঘন মুহূর্ত

আবেগঘন কণ্ঠে সাফদার খান বলেন, ‘আমি খুবই আনন্দিত। এটি একটি ফরজ ইবাদত। আল্লাহ আমাকে ডেকেছেন— এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’

অতীতের কঠিন দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর লটারিতে নাম আসেনি। ২০১৯ সালে সুযোগ পেয়েও করোনা সবকিছু নষ্ট করে দেয়। পরে স্ত্রীকে হারিয়ে একা হয়ে পড়ি, আর্থিক অবস্থাও ভেঙে যায়। কিন্তু এবার ভাই, বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনরা মিলে আমার জন্য টাকার ব্যবস্থা করেছেন।’

দীর্ঘ এক দশকের সংগ্রামের পর আজ কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠেছে সাফদার খানের মন। তার ভাষায়, ‘আল্লাহ যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন। দেরিতে হলেও তিনি আমাকে তার ঘরে যাওয়ার তৌফিক দিয়েছেন। এত বছরের অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে— এর চেয়ে বড় শান্তি আর কিছু হতে পারে না।’