চাকরি পরিবর্তনে অ্যাটকোর কঠোর নিয়ম, সাংবাদিকদের তীব্র প্রতিক্রিয়া
চাকরি পরিবর্তনে অ্যাটকোর কঠোর নিয়ম, সাংবাদিকদের প্রতিক্রিয়া

টেলিভিশন চ্যানেলে কর্মরত সংবাদকর্মী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম জারি করেছে অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স (অ্যাটকো)। এখন থেকে কোনও টেলিভিশন চ্যানেলে কর্মরত থাকা অবস্থায় কিংবা অব্যাহতি নেওয়ার পর যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) বা ছাড়পত্র ছাড়া অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানে চাকরি গ্রহণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাদের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাংবাদিক এবং সাংবাদিক নেতারা। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন— আদৌ টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে কিনা।

অ্যাটকোর জরুরি বিজ্ঞপ্তি

অ্যাটকোর সভাপতি অঞ্জন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালামের সই করা জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী, অন্য কোনও টেলিভিশন চ্যানেলে যোগদানের আগে কর্মরত বা সর্বশেষ কর্মস্থল থেকে অনাপত্তিপত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। টেলিভিশন মালিকদের এই সংগঠনটি তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুটি বিষয় কঠোরভাবে অনুসরণের অনুরোধ জানিয়েছে। একটি হচ্ছে— নতুন কর্মস্থলে যোগদানের আগে অবশ্যই বর্তমান কোম্পানি বা চ্যানেল থেকে অনাপত্তিপত্র অথবা ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হবে। অপরটি হচ্ছে— অনাপত্তিপত্র ছাড়া অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানে চাকরি গ্রহণ করলে বা যোগ দিলে উক্ত কর্মচারী প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ভঙ্গ করেছেন বলে গণ্য হবে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাংবাদিকদের তীব্র প্রতিক্রিয়া

টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে এমন নির্দেশনা প্রকাশিত হওয়ার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাংবাদিকরা। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশা ফেসবুকে এক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, “অ্যাটকো থেকে একটি ‘জরুরি বিজ্ঞপ্তি’ দেখলাম। ফেবু জুড়ে তোলপাড় চলছে এটা নিয়ে। বিজ্ঞপ্তিটির মূল কথা হচ্ছে— কেউ এক টিভি চ্যানেল ছেড়ে আরেক টিভি চ্যানেলে না কয়ে (বলে) গেলে তা অপরাধের সামিল। এজন্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এই ধরনের বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে অ্যাটকো যদি বলতো— সর্বনিম্ন ৪০ হাজার টাকার নিচে কোন টিভি চ্যানেলে সাংবাদিকদের বেতন হতে পারবে না। যেসব প্রতিষ্ঠান এই নিয়ম মানবেনা, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেখানে অনেক টিভি চ্যানেল ১৫ হাজার টাকা বেতন দিয়ে সাংবাদিকের হাতে বুম ধরিয়ে দিচ্ছে, সেখানে অ্যাটকোর এই ধরনের বিজ্ঞপ্তিকে সাংবাদিক মহল মনে করে— ‘ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই, কিল দেওয়ার গোসাই’।”

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, কোনও কারণ ছাড়াই যখন একজন সংবাদকর্মীকে ছাটাই করা হয় তখন এই অ্যাটকো কোথায় থাকে? সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের লিখেছেন, “অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স (অ্যাটকো) ঠিক কোন ক্ষমতাবলে এই বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে? এই চিঠি সরাসরি বাংলাদেশের শ্রম আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং মালিক পক্ষের দাসত্ব মনোবৃত্তি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। একজন কর্মীর তার চাকরি পরিবর্তনের সম্পূর্ণ আইনি অধিকার আছে। তিনি চাইলে নোটিশ পিরিয়ড পূর্ণ করে পদত্যাগ করতে পারেন এবং পরবর্তীতে তার পছন্দমতো যেকোনও প্রতিষ্ঠানে যোগদান করতে পারবেন। নতুন চাকরিতে যোগদান করার জন্য পূর্বের কর্মস্থল হতে কোনও নো অবজেকশন সার্টিফিকেট বা এনওসি’র প্রশ্নই আসে না। আশা করছি অ্যাটকো সংশ্লিষ্টরা দ্রুত এই ধরনের শোষণ প্রবণতা থেকে সরে আসবেন, এবং এই চিঠি উইথড্র করবেন।”

ডিআরইউ সভাপতির বক্তব্য

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “যেকোনও গণমাধ্যমে কোনও যোগ্য রিপোর্টারের চাকরিতে আগের হাউসের ছাড়পত্র প্রয়োজন নেই। ওয়েজ বোর্ডের নিয়ম মেনেই সাংবাদিকরা চাকরি ছাড়তে পারেন। অথবা কোনও হাউস থেকে চাকরি চলে গেলেও অন্য হাউসে চাকরি হতে কোনও ছাড়পত্রের দরকার নেই। সরকারি চাকরি তো নয় যে অন্য হাউসে চাকরি নিতে ছাড়পত্রের প্রয়োজন হবে। ওয়েজ বোর্ডে তা বলা নেই।” কোনও সাংবাদিক যদি বরখাস্ত হয় সেক্ষেত্রে কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “লিখতে না পারার জন্য কারও চাকরি যায় না। মালিকপক্ষের অনৈতিক কাজ করতে না পারলে চাকরি যায়। এক্ষেত্রে চাকরি যাওয়াটাই একটা যোগ্যতা। সৎ যোগ্য সাংবাদিকদের চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে ছাড়পত্র কেন প্রয়োজন হবে? আর দ্বিতীয় বিষয়টা হচ্ছে— আমাদের শত্রু হলাম আমরাই। আমাদের লোকাল যে ম্যানেজমেন্ট থাকে মালিকপক্ষে সেই লোকাল ম্যানেজমেন্টে কারা থাকে? আমার মতো আপনার মতো সাংবাদিকরাই থাকে। দেখা যায় এদেরকে তোয়াজ করতে হয়, তোষামদ করতে হয়, না হলে আপনি ভালো না। আপনি যত ভালো রিপোর্টারই হোন যদি আপনার লোকাল ম্যানেজমেন্ট যারা আছে তাদের যদি তেল মারতে না পারেন তাহলে দেখা যাবে যে আপনি ভালো না। আপনি কী লেখেন, আপনার কোনও লেখা হয় না, আপনার নিউজ হাইড করে দেয়। আমাদের শত্রু তো আমরাই, বাইরের মানুষ না।” তিনি আরও বলেন, “যখন দেখবেন যে আপনার সিনিয়র তার চেয়ে আপনি যোগ্যতাসম্পন্ন— তখন দেখা যাবে সে আপনার ল্যাং মারার জন্য সবসময় বসে আছে। কেননা ওই অযোগ্য লোকটা তো সবসময় চিন্তা করে যেকোনও সময় সে আমার চেয়ারটা দখল করে নিয়ে যায়। সেটাই বুঝছেন যোগ্য মানুষ কখনোই তার অধীনস্থদের হয়রানি করে না, অনাস্থা আনে না, অধিকার ক্ষুণ্ণ করে না। যোগ্য মানুষ কখনোই এই চেষ্টা করবে না। যখন অযোগ্যরা মাথার ওপর বসে তখন তারা হীনমন্যতায় ভুগবে— হীনমন্যতা থেকে যোগ্য মানুষগুলোকে হেয় করবে, অপদস্থ করবে।”

ইআরএফ সেক্রেটারির প্রতিক্রিয়া

ইকোনমিক রিপোর্টাস ফোরাম (ইআরএফ)-এর সেক্রেটারি আবুল কাশেম বলেন, “অ্যাটকোর এই ধরনের অপেশাদারসুলভ বিজ্ঞপ্তির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।” তিনি বলেন, “যদি কোনও টিভি মালিক কোনও সাংবাদিককে বেতনও না দেয়, ছাড়পত্রও না দেয়— তখন কী হবে? সাংবাদিক কী না খেয়ে মরবে? বছরের পর বছর ধরে কাজ করলেও বেশিরভাগ টিভি চ্যানেল সাংবাদিকদের নিয়মিত ইনক্রিমেন্টই দেয় না। অন্য কোথাও একটু বেশি বেতন, পদোন্নতি পেলে সেখানেও যেতে দেবেন না?” তিনি বলেন, “অ্যাটকোকে বলবো, সাংবাদিকদের কলুর বলদের মতো ব্যবহার করার অভ্যাস ছাড়ুন। শ্রম আইন অনুযায়ী সাংবাদিকদের সব সুবিধা নিশ্চিত করুন। সাংবাদিকরা নিয়মানুযায়ী পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে অন্য যেকোনও অফিসে কাজে যোগ দিতে পারবেন। এখানে বাধা সৃষ্টির নামে মাফিয়ার আচরণ করতে আসলে সাংবাদিক সমাজ তা প্রতিরোধ করবে।”

ডিআরইউ সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, “এটা অযৌক্তিক। হ্যাঁ, সিস্টেম অনুযায়ী যেটা চলে আসছে, যে আগে জানানো হয়। এটা তো নিয়ম আছে। আমরা আগে থেকে জানাই এক মাস আগে বা প্রত্যেক হাউসের একটা নিয়ম-নীতি মেনে আমরা চাকরি করি। আমি নিয়ম মেনে চাকরি করি— এখান থেকে ছেড়ে চলে গেলাম, এখন অন্য হাউস আমার কাছে বললো যে ছাড়পত্র লাগবে, এরকম কোনও নিয়ম নাই। তার মানে এটা অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য। এই ধরনের নীতি, এই ধরনের চিন্তা এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য এবং অনৈতিকও। যার যোগ্যতা আছে তার যোগ্যতার ভিত্তিতে তাকে চাকরি দিতে হবে।”

বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহারের দাবি

রাজনীতি ডট কমের সম্পাদক শরিফুজ্জামান পিন্টু বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “এই নির্দেশ মানি না, মানবো না।” এই সিদ্ধান্তকে তিনি টেলিভিশন সাংবাদিকদের পায়ে নতুন শেকল পরানোর কৌশল বলে মনে করছেন।