অলংকরণ: মাসুক হেলাল। রবীন্দ্রনাথ বড় হয়েছেন রাজকীয় পরিবেশে। বলা চলে, শব্দসাধনার অনুকূল যে পরিবেশ, সেটা তিনি ছোটবেলা থেকেই পেয়েছেন। বিশেষ করে গানের কথা যদি বলতে হয়, তাহলে ওই সময়ের অভিজাত পরিবারগুলোয় উচ্চাঙ্গসংগীতের বিশেষ সমাদর ছিল। ঠাকুরবাড়িও এর বাইরে ছিল না। পরিবারের ছেলেমেয়েদের শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম দিতে একজন গৃহশিক্ষক নিযুক্ত থাকতেন। এই শিক্ষকদের, অর্থাৎ ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েদের যাঁরা গান শিখিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বিষ্ণু চক্রবর্তী অন্যতম। বাল্যকালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাছে গান শিখেছেন।
ঠাকুরবাড়ির সংগীতচর্চা ও দেবেন্দ্রনাথের ভূমিকা
তা ছাড়া রবীন্দ্রনাথের দাদা সত্যেন্দ্রনাথ, হেমেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও সোমেন্দ্রনাথও উচ্চাঙ্গসংগীতে বিশেষজ্ঞ ছিলেন এবং সবাই হিন্দি গান ভেঙে বাংলায় ব্রহ্মসংগীত রচনা করেছেন। এই যে বাড়ির ছেলেরা গানের অনুরাগী হলো, এর পেছনে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের প্রেরণা ছিল অশেষ। তিনি নিজে যেমন উচ্চাঙ্গসংগীতের ভক্ত ছিলেন, তেমন ছিলেন পৃষ্ঠপোষকও। কিছু কিছু নিজে গাইতেনও।
দেবেন্দ্রনাথের সংগীতশিক্ষা ও পুরস্কারপ্রদান
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ঘরোয়া’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘একবার তাঁরও গান শেখবার শখ হয়েছিল। বিডন স্ট্রীটের একটা বাড়ি ভাড়া করে ওস্তাদ রেখে কালোয়াতি গান শিখতেন, গলা সাধতেন।’ তা ছাড়া পিয়ানো বাজাতে পারতেন দেবেন্দ্রনাথ। এ তো গেল মহর্ষির নিজের কথা। কিন্তু ওই যে বললাম তাঁর প্রেরণাতেই ছেলেরা শিল্পের, গানের অনুরাগী হয়েছিল, তার দৃষ্টান্ত?
দেবেন্দ্রনাথ বরাবরই চেয়েছেন বাড়ির ছেলেমেয়েরা শিল্পের জীবনে আলোকিত হোক। তাই ছেলেরা ভালো করলে বিভিন্ন উপহার দিতেন। পুত্র জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে বিশুদ্ধ সংগীত সাধনার জন্য একবার এক হাজার টাকা পুরস্কার দিয়েছিলেন। বাবার কাছ থেকে পুরস্কার পেতে রবীন্দ্রনাথও বাদ পড়েননি।
রবীন্দ্রনাথের গান ও পিতার পুরস্কার
‘মাঘোৎসব উপলক্ষে রবি কী লিখলে?’ বাবার প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ সবিস্ময়ে গানের খাতা এগিয়ে দিলেন। ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে। হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে, হৃদয়ে রয়েছ গোপনে। বাসনার বশে মন অবিরত ধায় দশ দিশে পাগলের মতো, স্থির-আঁখি তুমি মরমে সতত জাগিছ শয়নে স্বপনে॥... সবাই ছেড়েছে, নাই যার কেহ, তুমি আছ তার আছে তব স্নেহ— নিরাশ্রয় জন, পথ যার গেহ, সেও আছে তব ভবনে।... তুমি ছাড়া কেহ সাথি নাই আর, সমুখে অনন্ত জীবনবিস্তার— কালপারাবার করিতেছ পার কেহ নাহি জানে কেমনে।... জানি শুধু তুমি আছ তাই আছি, তুমি প্রাণময় তাই আমি বাঁচি, যত পাই তোমায় আরো তত যাচি— যত জানি তত জানি নে। জানি আমি তোমায় পাব নিরন্তর লোক–লোকান্তরে যুগযুগান্তর— তুমি আর আমি মাঝে কেহ নাই, কোনো বাধা নাই ভুবনে।’
দেবেন্দ্রনাথের প্রতিক্রিয়া ও পুরস্কার
পড়ে মুগ্ধ হলেন মহর্ষি। ৫০০ টাকার চেক লিখে উপহার দিলেন রবিকে (১২৯৩)। উপহার দেওয়ার সময় কিছু কি বলেননি? ‘জীবন স্মৃতি’ থেকে উদ্ধৃত করছি, ছেলের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে দেবেন্দ্রনাথ সেদিন বলেছিলেন, ‘দেশের রাজা যদি দেশের ভাষা জানিত, তবে কবিকে তো তাহারা পুরস্কার দিত। রাজার দিক হইতে যখন তাহার কোন সম্ভাবনা নাই, তখন আমাকে সেই কাজ করিতে হইবে।’



