সংগীতের রানী আশা ভোসলে আর নেই, ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন কিংবদন্তি
আশা ভোসলে আর নেই, ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন

সংগীতের রানী আশা ভোসলে আর নেই, ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন কিংবদন্তি

আশা ভোসলের জীবন ছিল গানের জন্য উৎসর্গীকৃত, আর তাঁর কাছে জীবন মানেই ছিল গানের যাত্রা। শেষ বয়সেও মঞ্চকাঁপানো সেই কণ্ঠের মানুষ আশা ভোসলের জীবন যেন নিজেরই বলা কথার প্রতিফলন—‘আমি গাইতে গাইতেই মরতে চাই।’ আজ রোববার দুপুরে তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই থমকে গেছে ভারতের সংগীতজগৎ। গতকাল শনিবার রাতে অসুস্থতার খবর ছড়িয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ফেরানো গেল না এই কিংবদন্তিকে। বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

দীর্ঘ কর্মজীবন ও অসংখ্য সম্মাননা

দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অসংখ্য চলচ্চিত্র ও অ্যালবামের জন্য গান গেয়েছেন, পেয়েছেন দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, পদ্মভূষণসহ বহু সম্মাননা; ১৯৯৭ সালে গ্র্যামি মনোনয়নও পেয়েছিলেন। কিছুদিন আগে ‘কাপল অব থিংস’ পডকাস্টে এসে স্বামী আর ডি বর্মনকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আশার কণ্ঠে ধরা পড়ে এক অন্য রকম ভালোবাসা। তিনি বলেছিলেন, এত বড় সংগীত পরিচালক হয়েও আর ডি বর্মনের কোনো অহংকার ছিল না। তাঁর কাছে গানই ছিল সবচেয়ে মূল্যবান—‘তাঁকে যদি হিরে দিতাম, বলতেন—এটা কী! বরং একটা ভালো গান রেকর্ড করো।’ এই কথার ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে আশার নিজের দর্শনও—সংগীত তাঁর কাছে পেশা নয়, সাধনা।

সময়ের একাকিত্ব ও স্মৃতিচারণ

২০২৩ সালে ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দুবাইয়ে ‘আশা@নাইনটি’ কনসার্টের আগে এক আলাপচারিতায় আশার কণ্ঠে ধরা পড়েছিল সময়ের একাকিত্ব—‘আমি এই ইন্ডাস্ট্রির শেষ মোগল। আমার সামনে সবাই এক এক করে চলে গেছেন, আমি একা রয়ে গেছি।’ তাঁর এই স্বীকারোক্তিতে বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের স্মৃতিও ফিরে আসে বারবার; ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে গান গাওয়া সেই দিনগুলোর কথা তিনি গভীর আবেগে স্মরণ করেছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মঞ্চের ভয় ও অনুভূতিশীলতা

এত বড় শিল্পী—তবু মঞ্চে ওঠার আগে ভয় কাজ করত তাঁর ভেতরে। তিনি বলেছিলেন, স্টুডিওতে সবকিছু সহজ লাগে, কিন্তু মঞ্চে আবেগ পুরোটা দখল করে নেয়—গলা কাঁপে, স্মৃতি ভেসে ওঠে, শ্রোতাদের সঙ্গেও তৈরি হয় এক অদ্ভুত সংযোগ। এই স্বীকারোক্তি দেখায়, কিংবদন্তির আড়ালেও তিনি ছিলেন গভীরভাবে অনুভবশীল একজন মানুষ।

জীবনের দর্শন ও পরিবর্তন মেনে নেওয়া

তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত উচ্চারণগুলোর একটি—‘আমার একমাত্র ইচ্ছা, আমি যেন গান গাইতে গাইতেই মারা যাই।’ শৈশব থেকে শাস্ত্রীয় সংগীত শেখা, আট দশকের বেশি প্লেব্যাক—সব মিলিয়ে তাঁর কাছে জীবন মানেই ছিল গানের যাত্রা। পরিবর্তিত সময়ের সংগীত নিয়েও তিনি ছিলেন খোলামেলা। ‘রকি অউর রানি কি প্রেমকাহানি’ ছবিতে তাঁর গাওয়া ‘ঝুমকা গিরা রে’-এর রিমিক্স প্রসঙ্গে বলেছিলেন, এখন গান বদলে গেছে—পুরোনো সুরে নতুন সংযোজন হচ্ছে, যা সব সময় ভালো লাগে না; তবু সময়ের এই পরিবর্তন মেনে নিতে হয়।

শেষ জীবনেও থেমে থাকেননি

তবু নিজের সাধনায় কোনো ছেদ পড়েনি শেষ জীবনেও। শেষ বয়সেও থেমে থাকেননি। নতুন সংগীতচর্চা, এমনকি অভিনয়ে হাতেখড়ি—সবকিছুতেই সমান উৎসাহ ছিল। নিয়মিত অনুশীলন ছিল তাঁর জীবনের অংশ—ভোরে, সকালে, এমনকি মধ্যরাতেও তানপুরা হাতে বসে যেতেন, শুধু এই ভেবে যে কারও ঘুম যেন না ভাঙে। চড়াই-উতরাইয়ের জীবনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আশা একবার বলেছিলেন, ‘জিন্দেগি ক্যায়সি হ্যায় প্যাহেলি হায়…কখনো হাসায়, কখনো কাঁদায়।’ সেই জীবনেই ছিল সংগ্রাম, সাফল্য, পরিবার, ভালোবাসা—আর সবকিছুর ওপরে ছিল তাঁর গান।

প্রাথমিক জীবন ও কর্মজীবনের সূচনা

১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাংলিতে জন্ম তাঁর। বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন বিশিষ্ট শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী। অল্প বয়সেই বাবাকে হারাতে হয় তাঁকে। মাত্র ৯ বছর বয়সে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে গান ও অভিনয়ের জগতে পা রাখেন দিদি লতা মঙ্গেশকর-এর সঙ্গে। মারাঠি ছবির গান দিয়ে শুরু, এরপর ধীরে ধীরে হিন্দি ছবিতে প্রতিষ্ঠা। ‘মাঝা বল’ ও ‘চুনরিয়া’ ছবিতে তাঁর প্রাথমিক কাজ ভবিষ্যতের এক বিশাল যাত্রার ভিত গড়ে দেয়। সেই শুরু, তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি।

বিশ্ব রেকর্ড ও বৈচিত্র্যময় গান

২০১১ সালে তাঁর নাম ওঠে বিশ্ব রেকর্ডের খাতায়। সংগীতের ইতিহাসে সর্বাধিক গান রেকর্ড করার কৃতিত্ব পান তিনি। ২০টির বেশি ভাষায় ১১ হাজারের বেশি গান—সংখ্যার নিরিখে যেমন বিস্ময়কর, তেমনই বৈচিত্র্যের দিক থেকেও অনন্য। গজল, শাস্ত্রীয়, আধুনিক কিংবা ক্যাবারে—সব ঘরানাতেই ছিলেন সমান সাবলীল। হিন্দি ছবির জগতে ওপি নায়ার থেকে আর ডি বর্মন—বহু সুরকারের সঙ্গে তাঁর কাজ কিংবদন্তি হয়ে আছে। আর ডি বর্মনের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কও গড়ে ওঠে, পরবর্তী সময়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দম মারো দম’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’—এমন অসংখ্য গান আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে অমলিন।

পুরস্কার ও সম্মাননা

‘উমরাও জান’ ও ‘ইজাজত’ ছবির গানে তাঁর অনবদ্য কণ্ঠস্বর এনে দেয় জাতীয় পুরস্কার। পাশাপাশি দাদাসাহেব ফালকে সম্মান, পদ্মশ্রী ও পদ্মবিভূষণ—একাধিক সম্মানে ভূষিত হন তিনি। সবকিছু ছেড়ে তিনি চলে গেলেন। আগামীকাল সোমবার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মুম্বাইয়ে সম্পন্ন হবে তাঁর শেষকৃত্য। তবু গানেই বেঁচে থাকবেন আশা ভোসলে—গানে, স্মৃতিতে, আর অসংখ্য শ্রোতার হৃদয়ে।