বগুড়ায় জমকালো 'টিএমএসএস চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫', আজীবন সম্মাননা পেলেন কনকচাঁপা
সোয়েল রানাবগুড়া শহরের আকাশে সন্ধ্যায় নেমেছিল এক আলোকিত উৎসবের ছোঁয়া। গানের মূর্ছনা, ঝলমলে আলো আর তারকাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছিল পুরো শহর। 'মমো ইন'-এর উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে বসেছিল ২০তম 'টিএমএসএস চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫'—যেখানে দেশের সংগীতজগতের বহু প্রজন্মের নক্ষত্ররা একত্রিত হয়েছিলেন। খুরশীদ আলম, রফিকুল আলম, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন থেকে শুরু করে এ প্রজন্মের শিল্পী মাহতিম শাকিব ও এনজেল নূরের উপস্থিতিতে আয়োজনটি হয়ে উঠেছিল স্মরণীয়। স্বীকৃতির এই অনুষ্ঠানটি পরিণত হয়েছিল এক উৎসবে, যা দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল।
দুই দশকের যাত্রা, এবার উত্তরবঙ্গে বড় আয়োজন
২০০৪ সালে শুরু হওয়া এই আয়োজনটি দুই দশক পেরিয়ে এবার আরও বৃহত্তর পরিসরে হাজির হয়েছিল উত্তরবঙ্গের বগুড়া শহরে। ঢাকার বাইরে এমন একটি বড় সাংস্কৃতিক আয়োজন ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। সকাল থেকেই বগুড়া শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল উৎসবের আমেজ—ব্যান্ড পার্টির বাজনা, রঙিন ব্যানার-ফেস্টুন আর তারকাদের আনাগোনায় মুখর হয়ে উঠেছিল চারপাশ। বিকেল গড়াতেই ভেন্যুতে ভিড় বাড়তে শুরু করে, আর সন্ধ্যা নামতেই সবুজ মাঠের আলোকিত মঞ্চে শুরু হয় জমকালো আয়োজন, যা দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল।
আজীবন সম্মাননা পেলেন কনকচাঁপা
মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে সমবেত সংগীতের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠে অনুষ্ঠানের। প্রবীণ ও নবীন শিল্পীদের কণ্ঠে পরিবেশিত 'ধনধান্য পুষ্পে ভরা' ও 'প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ' গান দুটি শুরুতে তৈরি করেছিল আবেগঘন পরিবেশ। এরপর মঞ্চে উঠে বক্তব্য দেন তথ্যমন্ত্রী জহিরউদ্দীন স্বপন, ফরিদুর রেজা সাগর, এবং হোসনে আরা বেগম, টিএমএসএস-এর প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক হোসনে আরা বেগম প্রমুখ। বক্তারা এই আয়োজনের ধারাবাহিকতা ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। আরও উপস্থিত ছিলেন টিএমএসএস-এর উপদেষ্টা ডাক্তার মওদুদ হোসেন, অন্য প্রকাশের মাজহারুল ইসলাম, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সানাউল আরেফিন, ইমপ্রেস গ্রুপের পরিচালক জহির উদ্দিন মাহমুদ, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান স্বাধীনতা পদক প্রাপ্ত মুকিত মজুমদার প্রমুখ।
আজীবন সম্মাননার জন্য জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কনকচাঁপার নাম ঘোষণা করেন আফসানা মিমি। তুমুল করতালির মধ্যে কনকচাঁপাকে উত্তরীয় পরিয়ে সম্মাননা স্মারক ও চেক তুলে দেন আয়োজক ও অতিথিরা। তাঁর শংসাপত্র পাঠ করেন শাইখ সিরাজ। সম্মাননা গ্রহণের পর আবেগাপ্লুত কনকচাঁপা তাঁর স্বামী সুরকার ও সংগীত পরিচালক মইনুল ইসলাম খানকে মঞ্চে ডাকেন। তিনি বলেন, 'আমার আজকের অবস্থানে আসার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান তাঁর। এই সম্মান আসলে তাঁরই প্রাপ্য।'
বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার প্রদান
অনুষ্ঠানে ফরিদুর রেজা সাগর বলেন, 'আমরা সব সময় শিল্পীদের চ্যানেল আই পরিবারের অংশ মনে করি। প্রয়াত আজম খানের 'উচ্চারণ' ব্যান্ডটি প্রায় হারিয়ে যাচ্ছিল, আমরা তাদের আবার ফিরিয়ে এনেছি। এই আয়োজনের মধ্য দিয়েই তারা নতুনভাবে পথচলা শুরু করবে।' এরপর একে একে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার প্রদান করা হয়। আধুনিক গান, চলচ্চিত্রের গান, লোকসংগীত, ব্যান্ড, সুরকার, গীতিকার থেকে শুরু করে মিউজিক ভিডিও—বিভিন্ন শাখায় স্বীকৃতি পান শিল্পীরা।
পারফরম্যান্সেও ছিল বৈচিত্র্য। মঞ্চে গান পরিবেশন করেন রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, খুরশীদ আলম ও রফিকুল আলম। পাশাপাশি সমকালীন শিল্পীদের পরিবেশনাও মাতিয়ে তোলে দর্শকদের। কোনাল, ইমরান মাহমুদুল, সিঁথি সাহা, ঝিলিক, লিজা ও লুইপার পরিবেশনায় মঞ্চ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। নাচ ও বিশেষ পরিবেশনাও ছিল বাড়তি আকর্ষণ; অপু বিশ্বাস ও আদর আজাদের উপস্থিতি বাড়তি উচ্ছ্বাস তৈরি করে।
পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকা
- আধুনিক গানে শ্রেষ্ঠ শিল্পী: লিজা ('খুব প্রিয় আমার')
- শ্রেষ্ঠ মিউজিক ভিডিও নির্মাতা: তানভীর তারেক ('পাখি আমার নীড়ের পাখি')
- শ্রেষ্ঠ দ্বৈত সংগীত শিল্পী: ইমরান ও সিঁথি সাহা ('প্রেম বুঝি')
- ইউটিউব থেকে কমপক্ষে একলক্ষবার ভিউ এবং ১৫০০ লাইক প্রাপ্ত আধুনিক গান: এঞ্জেল নূর ('যদি আবার')
- আধুনিক গানে শ্রেষ্ঠ সুরকার: বাপ্পা মজুমদার ('অবশেষে')
- আধুনিক গানের শ্রেষ্ঠ গীতিকার: তারেক আনন্দ ('প্রেমবতী') ও শাহনাজ কাজী ('মা')
- শ্রেষ্ঠ ব্যান্ড: মেট্রিক্যাল ('গণতন্ত্রের ঘুড়ি')
- শ্রেষ্ঠ সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার: সেতু চৌধুরী ('গণতন্ত্রের ঘুড়ি')
- শ্রেষ্ঠ লোকসংগীত শিল্পী: বিউটি ('চার চাঁদে দিচ্ছে ঝলক')
- ইউটিউবে ১ লক্ষবার ভিউ এবং ১৫০০ লাইক প্রাপ্ত লোকসংগীত লটারির মাধ্যমে বিজয়ী: শরিফ উদ্দিন দেওয়ান সাগর ('মা লো মা')
- শ্রেষ্ঠ ছায়াছবির গান: আতিয়া আনিসা ('ছোট্ট সোনা')
- ইউটিউবে কমপক্ষে একলক্ষবার ভিউ এবং ১৫০০ লাইক প্রাপ্ত ছায়াছবির গান: দিলশাদ নাহার কনা ('দুষ্টু কোকিল')
- ছায়াছবির গানে শ্রেষ্ঠ সুরকার: শওকত আলী ইমন ('ছোট্ট সোনা')
- ছায়াছবির গানে শ্রেষ্ঠ গীতিকার: রোহিত সাধুখাঁ ('বেঁচে যাওয়া ভালোবাসা')
- শ্রেষ্ঠ নজরুল সংগীত শিল্পী: শহিদ কবির পলাশ ('সৃজন ছন্দে')
- শ্রেষ্ঠ উচ্চাঙ্গসংগীত শিল্পী: নাশিদ কামাল ('সব সখিয়া চলো')
- শ্রেষ্ঠ নবাগত শিল্পী: সভ্যতা ('অধিকার')
- শ্রেষ্ঠ অডিও কোম্পানি: বেঙ্গল মিউজিক (পুরস্কার গ্রহণ করেন লুভা নাহিদ চৌধুরী)
- বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত: লোকসংগীতশিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়া
আয়োজনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
আয়োজনের প্রকল্প পরিচালক রাজু আলীম বলেন, 'এই আয়োজনকে আমরা শুধু পুরস্কার প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখিনি, এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ সংগীত উৎসবে রূপ দিতে চেয়েছি। এখানে ৩০০ জনের বেশি শিল্পী অংশ নিয়েছেন, সব প্রজন্মের শিল্পীদের এক মঞ্চে আনার চেষ্টা করেছি।' তিনি আরও বলেন, 'ঢাকার বাইরে আন্তর্জাতিক মানের আয়োজন সম্ভব—বগুড়ায় এই আয়োজনের মাধ্যমে সেটিই দেখাতে চেয়েছি।' অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন নীল হুরেজাহান ও অপু মাহফুজ।
এই আয়োজনটি শুধুমাত্র একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক মিলনমেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা দেশের সংগীত জগতকে সমৃদ্ধ করছে এবং নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করছে।



