ডালিয়া নওশীনের স্মৃতিতে: এক গানের যুগলবন্দীর গল্প
প্রখ্যাত নজরুল সংগীতশিল্পী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ডালিয়া নওশীনের জন্মদিন ছিল ৩১ মার্চ। এই দিনটিতেই তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে তিনি বোনদের কাছে বলেছেন, "সাদিয়া এত সন–তারিখ মনে রাখে কীভাবে? ও ইতিহাস নিয়ে পড়লে ভালো করত।" ডালিয়া বুর তীব্র রসবোধ ছিল, যা বলাই বাহুল্য।
ছোটবেলার ঢাকা: মুগ্ধতার দিনগুলি
ডালিয়া নওশীন ছিলেন আমার বড় খালার মেয়ে এবং গানের সাথি। ছোট্টবেলা থেকে বেড়ে ওঠার সব ছবি আজ বারবার ভেসে উঠছে। আজকের ঢাকা যেমন ব্যস্ত ও বিরক্তিকর নগর, আমাদের ছোটবেলার ঢাকা ছিল ততটাই মুগ্ধতার। আব্বা অধ্যাপক সৈয়দ মকসুদ আলী তখন ফজলুল হক হলের হাউস টিউটর ছিলেন। কার্জন হল ও ফজলুল হক হল মোগল ও ব্রিটিশ স্থাপত্যকলার অপূর্ব মিশেল। ক্যাম্পাসজুড়ে নানান রঙের ফুলের কেয়ারি শোভা পেত।
অল্প দূরেই ছিল রমনা পার্ক, তার পরেই বেইলি রোড। আজ থেকে ৬০–৬৫ বছর আগের বেইলি রোডে গুল্ফিশান, কাহকেশান ও আশিয়ান নামক তিনটি সরকারি ফ্ল্যাটে আমাদের প্রাণচঞ্চল দিনগুলো কেটেছে। বড় খালা ও খালুজান খ্যাতনামা স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এবং বেবি আপা হোসনে আরা ইসলামের বাসা ছিল আশিয়ানে। ঝকঝকে বাসাটি অতিথিদের আনাগোনায় মুখর থাকত। বড়ুয়া বাবুর্চির হাতের গরম কেক-পেস্ট্রি ও দেশীয় সুস্বাদু খাবারের স্মৃতি আজও জিবে লেগে আছে।
সংগীতের হাতেখড়ি ও যুগলবন্দী
ডালিয়া বু আর আমি প্রায় সমবয়সী, একসঙ্গে বেড়ে উঠেছি। আশিয়ানে একতলার প্রশস্ত বারান্দা পেরিয়ে প্রায়ই আসতেন শিল্পী দম্পতি সুধীন দাস ও নীলিমা দাস। শিশুমনে তাঁদেরকে উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেনের মতো ভাবতাম। মাত্র পাঁচ-ছয় বছর বয়সেই আমরা দুজনেই সংগীতবিশারদ সুধীন দাশের কাছে ধ্রুপদি ও নজরুলসংগীতে তালিম শুরু করি।
১৯৬৮ সালে ছায়ানটে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়। আমার ভর্তির দুই বছর পর ডালিয়া বু আর আমি একসঙ্গে প্রথম বর্ষে গান শেখা শুরু করি। আম্মা ড. নুরুননাহার ফয়জননেসা রেডিওর ‘খেলাঘর’ অনুষ্ঠানের আসর পরিচালনা করতেন। তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যাতায়াতের মধ্য দিয়েই আমরা দুই বোন গণমাধ্যমে যুক্ত হয়ে যাই ধীরে ধীরে।
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও মুক্তিযুদ্ধ
৭০-এর দশকে বাস্তুকলাবিদ পরিবার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ছায়ানটের বসন্ত উৎসব, বৈশাখী অনুষ্ঠান কিংবা গণসংগীতের মহড়া—সবকিছুতেই আমরা দুই বোন সক্রিয় ছিলাম। ১৯৬৯-এর গণ–অভ্যুত্থানের সময় গুরু শেখ লুৎফুর রহমানের শেখানো গানে আসে প্রতিবাদের সুর।
১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ১৪ বছরের কিশোরী ডালিয়া কণ্ঠকে অস্ত্র করে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কলকাতায় ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’য় যোগ দিয়ে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের উজ্জীবিত করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ছায়ানটের মঞ্চে আমরা অসংখ্য অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছি—সবাই আমাদের বলত ‘মানিকজোড়’।
গানের জগতে উজ্জ্বল উপস্থিতি
পয়লা বৈশাখে রমনার বটমূলে কিংবা শহীদ মিনারে দেশের গান অথবা বলধা গার্ডেনের শরৎ উৎসবে মাথায় শিউলি ফুলের মালা জড়িয়ে এক রঙের শাড়িতে ‘ডালিয়া-সাদিয়া’—এই দুটি নাম প্রায় একসঙ্গেই উচ্চারিত হতো। কৃষ্ণা চ্যাটার্জির গাওয়া দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান, যেমন ‘আয় রে বসন্ত ও তোর কিরণমাখা পাখা তুলে’ অথবা ‘আইল ঋতুরাজ সজনী’ তাঁর গলায় মাদকতা তৈরি করত।
অসংখ্য গানের মাঝেও নজরুলের ঠুমরি অঙ্গের গান, আবার পল্লিগান বা কীর্তন ছিল তার বৈশিষ্ট্য। ছিল মিষ্টি কাজে ভরা আর নজরুলীয় গায়কি। বেতার, টেলিভিশন ও মঞ্চে আমাদের যুগল পরিবেশনা জনপ্রিয়তা পায়। বিটিভির ‘একই বৃন্তে’ অনুষ্ঠানটি আজও অনেকের মুখে মুখে শোনা যায়।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রাণবন্ত
ডালিয়া নওশীন পরে একাধারে একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং নজরুলসংগীতের উজ্জ্বল তারকাশিল্পী হিসেবে পরিচিত হন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত। রান্না করতে ভালোবাসতেন, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতেন, অনুষ্ঠানমুখর থাকতেন। সঙ্গী পেলেই কলকাতা চলে যেতেন গান রেকর্ড করতে। মাঝে মাঝে লাঠি ভর করেই চলে যেতেন গানের আসরে।
‘জেমস অব নজরুল’-এর প্রায় সব আয়োজনেই তাঁর অংশগ্রহণ ছিল আনন্দঘন। জেমস অব নজরুল আয়োজিত তাঁর শেষ নিবেদন নটবেহাগ রাগে ‘রুমঝুম ঝুমঝুম নূপুর বোলে’ বলে দেয় তাঁর দাপুটে গায়কির কথা। সুরের অনুরণন রেখে যেতেন দীর্ঘ সময় ধরে। তাঁর ব্যক্তিত্ব যেন ফুটে উঠত আবেগঘন কণ্ঠে।
শেষ বিদায় ও শান্তির বারিধারা
নিঃসঙ্গতা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন অদম্য, আত্মবিশ্বাসী, প্রচারবিমুখ এবং প্রাণবন্ত। অসুস্থতাকেও বারবার জয় করেছেন, দেশ-বিদেশে সংগীত পরিবেশন করেছেন নিজের শক্তিতে। গত জানুয়ারি থেকে অসুস্থতা বাড়তে থাকে। বারবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও ১ এপ্রিল নিঃসঙ্গ ক্লান্তিহীন এই গানের পাখি তাঁর শেষ কথায় বলেন, ‘আমি ক্লান্ত, ঘুমাতে চাই’।
তাঁর শেষ শয্যা পাতা হয় বনানী কবরস্থানে, যেখানে তাঁর স্বামী মুক্তিযোদ্ধা ও সংগীতশিল্পী আজাদ হাফিজকে ২০১৪ সালে আমরা সমাহিত করেছিলাম। তাঁর দাফনের পর হঠাৎ নেমে আসা একপশলা বৃষ্টি যেন প্রকৃতির অশ্রু—গুমোট ভেঙে শান্তির বারিধারা। মনে হলো, অসংখ্য বন্ধু, আত্মীয় পরিজন রেখে ডালিয়া বু এখন শান্তির দেশে পাড়ি দিয়েছেন। সেখানে হয়তো এই গানপাগল দম্পতির যুগলবন্দী শুরু হবে ওপারের শিল্পী সমারোহে।



