প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী মাহবুবা রহমানের জীবনাবসান, কালজয়ী গানের স্রষ্টার বিদায়
বাংলাদেশের সংগীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী মাহবুবা রহমান পরলোকগমন করেছেন। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতায় তিনি দীর্ঘ দিন ধরে অসুস্থ ছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত তার জীবনাবসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সংগীত জীবনের উজ্জ্বল সূচনা ও বিকাশ
মাহবুবা রহমানের সংগীত জীবনের সূচনা হয় ১৯৪৭ সালে তৎকালীন ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’র ঢাকা কেন্দ্র থেকে। পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশকের রেডিও এবং চলচ্চিত্রে তার গাওয়া অসংখ্য গান কালজয়ী হয়ে আছে, যা আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। বিশেষ করে পল্লিগীতি ও আধুনিক গানে তার দক্ষতা ছিল প্রবাদপ্রতিম, যা তাকে সংগীত জগতে অনন্য মর্যাদা এনে দিয়েছে।
চলচ্চিত্র সংগীতে অবিস্মরণীয় অবদান
এ দেশের চলচ্চিত্র সংগীতের ইতিহাসে তার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর মাধ্যমে। সমর দাসের সুরে এই ছবিতে তার গাওয়া ‘মনের বনে দোলা লাগে’ গানটি আজও শ্রোতাদের মুখে মুখে ফেরে, যা তার শিল্পীসত্তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এরপর জহির রায়হানের ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রে খান আতাউর রহমানের সুরে ‘নিরালা রাতের প্রথম প্রহরে’ এবং ‘তোমাকে ভালোবেসে অবশেষে কী পেলাম’ গানগুলো তাকে পৌঁছে দেয় জনপ্রিয়তার শীর্ষে, যেখানে তিনি অসাধারণ কণ্ঠের মাধ্যমে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য সাফল্য
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি ‘জাগো হুয়া সাভেরা’, ‘আসিয়া’, ‘এ দেশ তোমার আমার’, ‘সোনার কাজল’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ও ‘সাত ভাই চম্পা’র মতো অসংখ্য কালজয়ী চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠ দিয়েছেন, যা বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব রেখেছে। সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে, যা তার কর্মের প্রতি জাতির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক বন্ধন
ব্যক্তিজীবনে ১৯৫০ সালে তিনি আবুল হাসনাতের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেও সেই সংসার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার ও সংগীতজ্ঞ খান আতাউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়, যা একটি শৈল্পিক মিলন হিসেবে পরিচিতি পায়। তাদের সংসারে এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে, যাদের মধ্যে রুমানা ইসলাম দেশের একজন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যা মাহবুবা রহমানের শিল্পীসত্তার উত্তরাধিকার বহন করে।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোক
এই গুণী শিল্পীর মৃত্যুতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে, যেখানে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার গানগুলো কেবল শোনার বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। মাহবুবা রহমানের জীবন ও কর্ম আমাদের শিখিয়ে যায় কিভাবে শিল্পের মাধ্যমে জাতির হৃদয়ে স্থায়ী আসন পাওয়া যায়।



