বব ডিলানের জীবনের অজানা অধ্যায়: দুর্ঘটনা থেকে নোবেল পর্যন্ত
বব ডিলানের জীবনের অজানা অধ্যায়: দুর্ঘটনা থেকে নোবেল

কিংবদন্তি মার্কিন সংগীতশিল্পী বব ডিলানের জীবন নানা ঘটনায় ভরপুর। ১৯৬৬ সালটি ছিল তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি বিশ্ব ভ্রমণে বেরিয়ে বিভিন্ন দেশে কনসার্ট করেন। কিন্তু ২৯ জুলাই শুক্রবার বিকেলে ব্যক্তিগত সহকারীর মোটরসাইকেলে চড়ে দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। শুরুতে ঘটনাটি গোপন রাখা হলেও পরে তা জানাজানি হয়। দুর্ঘটনার কারণে তিনি বেশ কয়েকটি কনসার্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে দেন এবং ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত আর কোনো কনসার্টে অংশ নেননি।

নোবেল পুরস্কার ও বিতর্ক

২০১৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারজয়ী হিসেবে নাম ঘোষণার পর থেকে বব ডিলান পুরোপুরি নীরব থাকায় সমালোচনার মুখে পড়েন। সুইডিশ একাডেমির সদস্য ও লেখক পার ওয়াস্টবার্গ তাঁর এই আচরণকে ‘শিষ্টাচারহীনতা ও ঔদ্ধত্য’ বলে অভিহিত করেন। সুইডেনের এসভিটি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওয়াস্টবার্গ বলেন, ‘এটা অশিষ্ট ও ঔদ্ধত্য আচরণ।’

সংগীত ক্যারিয়ার ও মূল্যায়ন

ছয় দশকের ক্যারিয়ারে ডিলান ছয় শতাধিক গান রচনা ও পরিবেশন করেছেন। ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’, ‘লাইক আ রোলিং স্টোন’, ‘মার্ডার মোস্ট ফাউল’-এর মতো কালজয়ী গান তাঁর সৃষ্টি। ‘বিটলস’-এর পর সংগীত জগতে সবচেয়ে মূল্যবান শিল্পী হিসেবে বিবেচিত হন তিনি। টাইম ম্যাগাজিনের ২০ শতকের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০০৪ সালে রোলিং স্টোন ম্যাগাজিনের সর্বকালের সেরা ১০০ গায়কের তালিকায় তিনি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গানের ক্যাটালগ বিক্রি

কয়েক বছর আগে বব ডিলান তাঁর গানের সমগ্র ক্যাটালগের স্বত্ব ইউনিভার্সাল মিউজিক গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দেন। ভবিষ্যতে তাঁর গান থেকে যা আয় হবে, তার সবই পাবে ইউনিভার্সাল মিউজিক। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী জোডি গার্সন বলেন, ‘সংস্কৃতিতে তাঁর অবদানের কথা বলা বাহুল্য। তাঁর মতো শিল্পীর সংগীতকর্মের দায়িত্ব পাওয়া আমাদের জন্য পরম সৌভাগ্যের বিষয়।’ চুক্তির অঙ্ক প্রকাশ না করা হলেও সূত্র জানিয়েছে, তা ৩০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি।

ব্যক্তিগত জীবন

১৯৬৫ সালের ২২ নভেম্বর বব ডিলান সারা লাউন্ডসকে বিয়ে করেন। ১৯৭৭ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। তাঁদের চার সন্তান: জেসে বায়রন ডিলান, আন্না লিও, স্যামুয়েল আইজাক আব্রাম ও জ্যাকব ডিলান। ডিলানের পালিত সন্তান মারিয়া লাউন্ডস মারিয়া ডিলান নামে পরিচিত।

কলকাতায় বিয়ের নিমন্ত্রণ

১৯৯০ সালে ভারতের কলকাতায় বন্ধু পূর্ণদাস বাউলের ছেলের বিয়েতে যোগ দিতে যান বব ডিলান। দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়ায় তিনি মাত্র এক ঘণ্টা অবস্থান করেন। পূর্ণদাস বাউলের ছেলে দিব্যেন্দু স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘বব ডিলান ঢাকুরিয়াতে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। সেখান থেকে আমার সঙ্গেই গিয়েছিলেন বালিগঞ্জ। অনুষ্ঠানে মাত্র এক ঘণ্টাই ছিলেন। মিডিয়ার হুল্লোড়ে তিনি আর সময় কাটাননি।’

বব ডিলানের আসল নাম

বব ডিলান তাঁর আসল নাম রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান পরিবর্তন করে বব ডিলান নাম গ্রহণ করেন। ১৯৫৯ সালে মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ডিনকিটাউন এলাকায় সলো পারফর্মার হিসেবে মঞ্চে ওঠেন। অনেকের ধারণা, কবি ডিলান টমাসের নাম থেকে তিনি এই নাম পছন্দ করেন।

বব ডিলান ও জোয়ান বায়েজ

৬০ দশকের শুরুতে জোয়ান বায়েজের সঙ্গে বব ডিলানের পরিচয় হয়। তখন ডিলানের তারকাখ্যাতি ছিল না। জোয়ান ‘লোকসংগীতের সম্রাজ্ঞী’ নামে পরিচিত। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত দুজন একসঙ্গে বেশ কিছু সংগীতসফরে অংশ নেন এবং তরুণদের মনে ঝড় তোলেন। তবে তাঁরা কখনো প্রকাশ্যে সম্পর্ক স্বীকার করেননি। ডিলান জোয়ানকে গানকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করতে অনুপ্রাণিত করেন।

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

জর্জ হ্যারিসন ও রবিশঙ্করের আহ্বানে কনসার্ট ফর বাংলাদেশে অংশ নেন বব ডিলান। তিনি পাঁচটি গান পরিবেশন করেন: ‘আ হার্ড রেইনস আ-গনা ফল’, ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’, ‘ইট টেকস আ লট টু লাফ’, ‘লাভ মাইনাস জিরো’ এবং ‘জাস্ট লাইক আ ওম্যান’। ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’ সারা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষকে প্রতিবাদী করে তোলে।

প্রথম পেশাদার রেকর্ডিং

বব ডিলানের প্রথম পেশাদার রেকর্ডিং হয় ১৯৬০ সালে। হ্যারি বেলাফন্টির অ্যালবামে তিনি হারমোনিকা বাদক হিসেবে কাজ করেন এবং প্রথম কাজের জন্য পান ৫০ ডলার।

সেরা পাঁচ গান

সংগীতবিষয়ক সংবাদমাধ্যম সিঙ্গারসরুম বব ডিলানের সর্বকালের সেরা পাঁচ গানের তালিকা প্রকাশ করে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে ‘লাইক আ রোলিং স্টোন’। দ্বিতীয় স্থানে ‘ব্লোইন ইন দ্য উইন্ড’। তৃতীয় স্থানে ‘টাইমস দে আর-আ-চেঞ্জিং’। চতুর্থ স্থানে ‘ট্যাংগেলড আপ ইন ব্লু’। পঞ্চম স্থানে ‘মিস্টার ট্যাম্বোরিন ম্যান’।

‘লাইক আ রোলিং স্টোন’

১৯৬৫ সালের ২০ জুলাই মুক্তি পাওয়া এই গানটি বব ডিলানের পছন্দের একটি গান। রেকর্ড করার পর তিনি বলেন, ‘আমি এটি লিখেছি। আমি ব্যর্থ হইনি। এটা একদমই সোজা কথায় লেখা।’ তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর।

‘ব্লোইন ইন দ্য উইন্ড’

১৯৬৩ সালে প্রকাশিত এই গানটি ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সিভিল রাইটস আন্দোলনে জাতীয় সংগীতে পরিণত হয়। কবীর সুমন এই গান অবলম্বনে ‘কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়?’ লিখেছেন।

‘টাইমস দে আর-আ-চেঞ্জিং’

১৯৬৪ সালে প্রকাশিত এই গানটিও সিভিল রাইটস আন্দোলনে জাতীয় সংগীতে পরিণত হয়। এটি ‘টাইমস দে আর-আ-চেঞ্জিং’ অ্যালবামের শিরোনাম সংগীত।

‘ট্যাংগেলড আপ ইন ব্লু’

১৯৭৫ সালে প্রকাশিত ‘ব্লাড অন দ্য ট্র্যাকস’ অ্যালবামের এই গান তালিকার চতুর্থ স্থানে রয়েছে।

‘মিস্টার ট্যাম্বোরিন ম্যান’

১৯৬৫ সালে রেকর্ড ও প্রকাশিত এই গানটি ১৯৬৪ সালের মার্চ মাসে নিউ জার্সির এক বাসায় টাইপ রাইটারে খসড়া করেছিলেন ২২ বছর বয়সী ডিলান।