ছায়ানটের বসন্ত উৎসবে সন্জীদা খাতুনের স্মরণ ও সাংস্কৃতিক সম্মেলন
বসন্তের বিদায়ের প্রাক্কালে দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট একটি মনোরম উৎসবের আয়োজন করেছিল। শনিবার ধানমন্ডির ছায়ানট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই বসন্ত উৎসবটি গান, কথোপকথন ও গীতিনাট্যাভিনয়ের মাধ্যমে সাজানো হয়েছিল। বিশেষভাবে, এই আয়োজনটি নিবেদিত ছিল ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, প্রয়াত সংগীতজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ সন্জীদা খাতুনের স্মৃতির প্রতি, যাঁর ৯৩তম জন্মবার্ষিকী পালিত হচ্ছিল।
সম্মেলক নৃত্য ও উপস্থিতির ভিড়
অনুষ্ঠানটি শুরু হয়েছিল 'আমার বনে বনে ধরল মুকুল' গানের সঙ্গে সমবেত নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে, যা দর্শকদের মাঝে উৎসাহের সৃষ্টি করেছিল। অনুষ্ঠান শুরুর আগেই মিলনায়তন পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, যেখানে অনেক দর্শক ভেতরে স্থান না পেয়ে বাইরের বারান্দায় বড় পর্দার সামনে বসে এই সাংস্কৃতিক আয়োজন উপভোগ করেছিলেন। এই দৃশ্য উৎসবের জনপ্রিয়তা ও সাংস্কৃতিক আগ্রহের প্রমাণ বহন করে।
সন্জীদা খাতুনের জীবন ও অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা
সন্জীদা খাতুনের জন্ম ১৯৩৩ সালের ৪ এপ্রিল, এবং তাঁর স্মৃতিকে স্মরণ করে ছায়ানটের সভাপতি ডা. সারওয়ার আলী একটি প্রাণবন্ত বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, 'সন্জীদা খাতুনের প্রয়াণের পর এটি তাঁর দ্বিতীয় জন্মবার্ষিকী, এবং আমরা এখানে সমবেত হয়েছি এই কর্মবীর মানুষটির জীবনকে উদযাপন করার জন্য।' তিনি আরও যোগ করেন যে সন্জীদা খাতুন তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে সংগীতের মাধ্যমে বাঙালি জাতিসত্তা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার জন্য নিরলস কাজ করে গেছেন।
ডা. সারওয়ার আলী বলেন, 'তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা ধর্মবিশ্বাসকে অক্ষুণ্ন রেখে একটি উদার সংঘাতহীন সমাজ গড়ার জন্য সংগীতকে বড় অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করেছেন। লালন থেকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল হয়ে শাহ আবদুল করিম পর্যন্ত সকলেই এমন সমাজ গড়ার প্রেরণা দিয়েছেন।' তিনি সন্জীদা খাতুনকে উচ্চমানের গবেষক ও সংগঠক হিসেবে বর্ণনা করেন, যিনি ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত এলে প্রতিবাদী হয়েছেন এবং ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।
গীতিনাট্য ও সঙ্গীত পরিবেশনা
বক্তব্যের পর অনুষ্ঠানে সমবেত কণ্ঠের গান 'দোলা লাগিল বাঁশরি বাজিল/ ছায়ানটে বনে বনে' পরিবেশিত হয়, যা দর্শকদের মাঝে আবেগের সঞ্চার করেছিল। এরপর 'বসন্ত এলো এলো এলো রে/ পঞ্চম সুরে কোকিল কুহরে' গানটি পরিবেশন করা হয়। শিল্পী ইফফাত আরা 'নয়ন মেলে দেখি আমায় বাঁধন বেঁধেছে' গানটি পরিবেশন করে অনুষ্ঠানে একটি মিষ্টি সুর যোগ করেছিলেন।
অনুষ্ঠানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতিনাট্য সুন্দর, যেখানে বাচিক অভিনয় করেছেন ত্রপা মজুমদার ও স্নাতা শাহরিন। এই গীতিনাট্যে গানগুলোর মধ্যে ছিল 'কুসুমে কুসুমে চরণচিহ্ন', 'ও কি এল', 'না, যেয়ো না', 'লহো লহো তুলে লহো নীরব বীণাখানি'। শেষে জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে এই বসন্তের সুর-ছন্দের আয়োজন সমাপ্ত হয়, যা দর্শকদের জন্য একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে রইল।
এই উৎসবটি কেবল বসন্তের বিদায়কেই চিহ্নিত করেনি, বরং সন্জীদা খাতুনের মতো সংস্কৃতি কর্মীর অবদানকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। ছায়ানটের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা ও প্রচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



