এবারের অস্কার: বহুমাত্রিক রাতে সাফল্য ও আলোচনার ঝড়
এবারের অস্কার ছিল বহুমাত্রিক এক রাত, যা হলিউডের মর্যাদাপূর্ণ একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের আসরকে নানা দিক থেকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে। ভৌতিক ঘরানার সিনেমার সাফল্য, প্রযুক্তি নিয়ে সমালোচনা, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং বড় স্টুডিওর আধিপত্য—সব মিলিয়ে এবারের অস্কার ছিল সত্যিই বহুমাত্রিক এক রাত। নিচে এবারের আসরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
ওয়ার্নার ব্রাদার্সের আধিপত্য ও বড় সাফল্য
এবারের অস্কারে সবচেয়ে বড় সাফল্য পেয়েছে ওয়ার্নার ব্রাদার্স। স্টুডিওটির দুই বড় ছবি ‘ওয়ান ব্যাটল ব্যাটল আফটার’ ও ‘সিনার্স’ মৌসুমজুড়ে আলোচনায় ছিল। শেষ পর্যন্ত স্টুডিওটি মোট ১১টি অস্কার জিতে নেয়, যা অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি। সেরা চলচ্চিত্রসহ ছয়টি অস্কার জিতেছে ‘ওয়ান ব্যাটল ব্যাটল আফটার’। ছবিটির পরিচালক পল টমাস অ্যান্ডারসন ব্যক্তিগতভাবে তিনটি অস্কার জিতেছেন, যা তাঁর দক্ষতার প্রমাণ দেয়।
কোনান ও’ব্রায়েনের প্রাণবন্ত সঞ্চালনা
এবারও অস্কারের সঞ্চালক ছিলেন কৌতুক অভিনেতা কোনান ও’ব্রায়েন। গত বছরের তুলনায় এ বছর তাঁকে আরও আত্মবিশ্বাসী এবং প্রাণবন্ত দেখা গেছে। অনুষ্ঠানের শুরুতেই নানা চলচ্চিত্রের সেটে অভিনব কমেডি স্কেচে হাজির হয়ে দর্শকদের হাসিয়েছেন তিনি। অনুষ্ঠানের মাঝামাঝি সময়ে সাবেক অস্কার সঞ্চালক জিমি কিমেল মঞ্চে উপস্থিত হলে অনেকেই তুলনা করেন—এখন অস্কারের জন্য ও’ব্রায়েনই যেন বেশি উপযুক্ত।
টিমোথি শ্যালামের ক্লান্তি ও পুরস্কার হাতছাড়া
অস্কারের আগে অনেকেই ভেবেছিলেন, সেরা অভিনেতার পুরস্কার জিততে পারেন টিমোথি শ্যালামে। ‘মার্টি সুপ্রিম’–এ তাঁর অভিনয় বেশ প্রশংসা পেয়েছিল। তবে দীর্ঘ প্রচারণা ও পুরস্কার মৌসুমের ক্লান্তি শেষ পর্যন্ত তাঁর বিপক্ষে কাজ করে। শেষ পর্যন্ত সেরা অভিনেতার অস্কার জিতে নেন মাইকেল বি জার্ডন। তিনবার মনোনয়ন পেয়েও খালি হাতে ফিরতে হলো শ্যালামেকে। একাডেমির ভোটাররা অনেক সময় কম বয়সীদের অস্কার দিতে চান না—৩০ বছর বয়সী শ্যালামের ক্ষেত্রেও সম্ভবত এটা কাজ করেছে।
ভৌতিক সিনেমার বড় জয় ও নতুন ধারা
এবারের অস্কারে ভৌতিক ঘরানার সিনেমা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। ‘সিনার্স’ জিতেছে চারটি পুরস্কার, আর ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ জিতেছে তিনটি। হরর ছবি ‘ওয়েপনস’–এর জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর অস্কার জিতেছেন অ্যামি ম্যাডিগন। অনেক বছর ধরে অস্কারে হরর সিনেমাকে অবহেলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ছিল। এবারের ফলাফল সেই ধারণা কিছুটা বদলে দিয়েছে, যা ভৌতিক সিনেমার জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
রাজনীতি ছিল আলোচনার কেন্দ্রে
এবারের অস্কারে রাজনৈতিক বক্তব্যও ছিল স্পষ্ট। অভিনেতা হাভিয়ের বারদেম মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ বললে দর্শকদের করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে হল। অন্যদিকে সেরা আন্তর্জাতিক সিনেমার পুরস্কার পাওয়া ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’র পরিচালক ইয়েকিম ত্রিয়ের রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনা করেন। আর সেরা চলচ্চিত্রের পরিচালক পল থমাস অ্যান্ডারসন বলেন, ‘আমরা পৃথিবীকে যে বিশৃঙ্খল অবস্থায় রেখে যাচ্ছি, তা নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে যেন একধরনের ক্ষমা চাওয়া (নিজের সিনেমার মাধ্যমে)।’
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে উদ্বেগ
হলিউডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব বাড়তে থাকায় এবারের অস্কারে প্রযুক্তি নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ পেয়েছে। অনুষ্ঠানে অনেকেই মজা করে বলেছেন, হয়তো ভবিষ্যতে মানুষ নয়, এআই-ই অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করবে। অ্যানিমেশন বিভাগে পুরস্কার দিতে গিয়ে অভিনেতা উইল আর্নেট বলেন, ‘অ্যানিমেশন শুধু একটি প্রম্পট নয়, এটি একটি শিল্প—যা আমাদের রক্ষা করতে হবে।’
নারীদের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ও অগ্রগতি
এবারের অস্কারে নারীদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। ‘সিনার্স’-এর জন্য সেরা চিত্রগ্রাহকের পুরস্কার জিতেছেন অটাম ডুরাল্ড আর্কাপ; অস্কারের ইতিহাসে এই প্রথম কোন নারী জিতলেন এই পুরস্কার। এই বিভাগে পুরস্কার পাওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারীও তিনি। অস্কারে ডুরাল্ডের আগে মাত্র তিন নারী চিত্রগ্রাহক মনোনয়ন পেয়েছিলেন। পুরস্কার গ্রহণ করে ডুরাল্ড নির্মাতা রায়ান কুগলারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান, একই সঙ্গে দুনিয়ার নানা প্রান্তের নারীদের সামনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। অন্যদিকে ‘হ্যামনেট’–এ অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রীর অস্কার জিতেছেন জেসি বাকলি।
আন্তর্জাতিক সিনেমার হতাশা ও সীমিত সাফল্য
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক সিনেমা অস্কারে বেশ সাফল্য পেয়েছিল। কিন্তু এবার সেই ধারা কিছুটা কমে গেছে। নরওয়ের ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেলেও অন্য বিভাগে তেমন সাফল্য পায়নি, যা আন্তর্জাতিক সিনেমা প্রেমীদের জন্য কিছুটা হতাশাজনক।
শন পেনের অনুপস্থিতি ও মজার মন্তব্য
সেরা পার্শ্ব অভিনেতার অস্কার জিতেছেন শন পেন। কিন্তু তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। জানা গেছে, তিনি ইউক্রেন সফরে গিয়েছিলেন। মঞ্চে পুরস্কার নিতে গিয়ে অভিনেতা কিরন কালকিন মজা করে বলেন, ‘শন পেন এখানে আসতে পারেননি—অথবা আসতে চাননি।’
এভাবে, এবারের অস্কার ছিল একটি বহুমাত্রিক রাত, যা শুধু সিনেমার সাফল্য নয়, বরং সামাজিক, রাজনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত দিকগুলোকেও আলোচনায় এনেছে।
