স্বাধীনতা পুরস্কারে দ্বিতীয়বার মনোনয়নে জাফরুল্লাহ চৌধুরী: নতুন তালিকায় আলোচনার সূত্রপাত
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার-এর জন্য ঘোষিত নতুন তালিকায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ তিনি ইতিমধ্যে ১৯৭৭ সালে এই পুরস্কার পেয়েছিলেন, যা একই ব্যক্তির দ্বিতীয়বার মনোনয়নের বিরল ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। সরকার সম্প্রতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ মোট ১৫ জন ব্যক্তি এবং পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছে, যার মধ্যে সাতজনকে মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পুরস্কারের ইতিহাস ও বর্তমান তালিকার দ্বন্দ্ব
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকা অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালে এই পুরস্কার প্রবর্তনের প্রথম বছরেই ১০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছিল। সেই তালিকায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সমাজসেবা ও জনসেবায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এবার তাকে আবারও স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে।
স্বাধীনতা পুরস্কার বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মাননা হিসেবে ১৯৭৭ সাল থেকে প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ে গৌরবময় ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করা হয়। সাধারণত একজন ব্যক্তি একবারই এই সম্মাননা পান এবং একই ব্যক্তিকে দুইবার দেওয়ার কোনো নজির নেই বলে প্রচলিত নিয়মে বিবেচিত হয়। গত বছর মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানীকে পুনরায় স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়ার আলোচনা ওঠার পর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, এর আগে কোনো বাংলাদেশি দুইবার দেশের সর্বোচ্চ এই পুরস্কার পাননি। ১৯৮৫ সালে ওসমানী স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ায় তাকে পুনরায় দেওয়ার আলোচনা পরে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
এবারের মনোনীতদের তালিকা ও বিশেষ উল্লেখ
এবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও প্রয়াত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও নারী শিক্ষা সহ দেশ গঠনে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য মেজর মোহাম্মদ আবদুল জলিল, সাহিত্যে আশরাফ সিদ্দিকী, সমাজসেবায় জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও মাহেরীন চৌধুরী, সংস্কৃতিতে বশির আহমেদ এবং জনপ্রশাসনে কাজী ফজলুর রহমানকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে।
অন্যদের মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অধ্যাপক ড. জহুরুল করিম, সংস্কৃতিতে এ কে এম হানিফ (হানিফ সংকেত), ক্রীড়ায় জোবেরা রহমান (লিনু), সমাজসেবায় সাইদুল হক, গবেষণা ও প্রশিক্ষণে মোহাম্মদ আবদুল বাকী, এম এ রহিম ও সুকোমল বড়ুয়া এবং পরিবেশ সংরক্ষণে আবদুল মুকিত মজুমদার মনোনীত হয়েছেন। এ বছর পাঁচটি প্রতিষ্ঠানও স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:
- ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ
- ঢাকা মেডিকেল কলেজ
- পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)
- এসওএস শিশু পল্লী
- গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র
আলোচনা ও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যার অপেক্ষা
১৯৭৭ সালে পুরস্কার পাওয়া একজন ব্যক্তির নাম আবারও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে এটি নতুন কোনো সিদ্ধান্ত, নাকি তথ্যগত অসঙ্গতি—সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। মন্ত্রিপরিষদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষরকারী অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবির বলেন, কাগজপত্র না দেখে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, এটি আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয় নয়; সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনে দ্বিতীয়বারও পুরস্কার দেওয়া সম্ভব। তবে প্রচলিত নিয়মে সাধারণত একজন ব্যক্তি একবারই এই সম্মাননা পান বলে উল্লেখ করেন।
প্রথা অনুযায়ী স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে মনোনীত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে স্বাধীনতা পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। এবারের তালিকা নিয়ে চলমান আলোচনা ও সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা ব্যবস্থাপনার দিকে নতুন দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
