শত্রুতা ভুলে যেভাবে এক হয়েছিলেন সৌরভ-ডোনা
শত্রুতা ভুলে যেভাবে এক হয়েছিলেন সৌরভ-ডোনা

ভারতীয় ক্রিকেটের সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি ক্রিকেট পিচে তার ‘দাদাগিরি’র জন্য বিশ্বখ্যাত। অফসাইডের ঈশ্বর হোক কিংবা লর্ডসের ব্যালকনিতে জার্সি ওড়ানো— সৌরভ মানেই এক অদ্ভুত আগ্রাসন। কিন্তু এই লড়াকু মানুষটিই যখন নিজের ব্যক্তিগত জীবনের প্রেমকাহিনির পিচে ব্যাট করতে নেমেছিলেন, ঠিক তখন গল্পটা কোনো ব্লকবাস্টার বলিউড স্ক্রিপ্টের চেয়ে কম ছিল না।

প্রতিবেশী থেকে প্রেমিক

সৌরভ গাঙ্গুলি ও ডোনার প্রেমের শুরুটা মোটেও কুসুমকোমল ছিল না। বেহালার বীরেন রায় রোডে দুজনের বাড়ি ছিল পাশাপাশি, মাঝে ছিল কেবল প্রাচীর। ওদের ঠাকুরদাদারা একসময় ব্যবসায়িক পার্টনার ছিলেন। কিন্তু কোনো এক কারণে সেই ব্যবসায় ভাঙন ধরে এবং দুই পরিবারের মধ্যে এমন এক দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতার সৃষ্টি হয় যে, দুই বাড়ির বড়দের মধ্যে মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়।

পারিবারিক শত্রুতা থাকলেও মন তো আর পাঁচিল মানে না! ডোনা যখন স্কুলপড়ুয়া কিশোরী আর সৌরভ কলেজে, ঠিক তখনই শুরু হয় অলিখিত সেই চাউনি। এক টকশোতে অনুরাগ বসুর মুখোমুখি হয়ে সৌরভ গাঙ্গুলি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছিলেন— ‘ফুটবল খেলার সময় বা কোথাও যাওয়ার সময় আমি ডোনাকে দেখতাম, হয়তো একটু বেশিই দেখতাম! এমনকি বন্ধুদের নিয়ে ডোনার স্কুলের আশপাশেও চক্কর কাটতেন।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অন্যদিকে ডোনার ক্যারিয়ারের শুরুটা ব্যাডমিন্টন খেলার কোট দিয়ে। ডোনা এক পুরোনো সাক্ষাৎকারে হেসে জানিয়েছিলেন, সৌরভ যখন বাড়ির পাশে ব্যাডমিন্টন খেলতেন, ওর শাটলককটি ‘ভুল করে’ প্রায়শই রায় পরিবারের সীমানার ভেতরে এসে পড়ত। আর সেই শাটলকক ফেরত দেওয়ার অজুহাতেই চলত দুজনের মিষ্টি চোখের ইশারা। ঠিক কখন যে এই চেনা প্রতিবেশী মন দেওয়া-নেওয়ার খেলায় মেতে উঠলেন, তা তারা নিজেরাও মনে করতে পারেন না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রথম ডেট ও গোপন বিয়ে

দুই তারকা যখন ওদের প্রথম ডেটের স্মৃতি হাতড়ান, ঠিক তখন উঠে আসে ঢাকুরিয়া লেকের কাছের এক চেনা রেস্তোরাঁ ‘ম্যান্ডারিন’-এর কথা। নৃত্যশিল্পী ডোনা তখন মাত্র ১৭ বছরের কিশোরী এবং সৌরভ ২৩। প্রথম ডেটে গিয়ে সৌরভের খাওয়ার বহর দেখে মনে মনে বেশ অবাকই হয়েছিলেন ডোনা! দুই প্লেট ফ্রাইড রাইস, চাউমিন আর চিলি চিকেনের বেশিরভাগটাই সাবাড় করেছিলেন ভোজনরসিক মহারাজ!

সময়টা ১৯৯৬ সাল। লর্ডসের ঐতিহাসিক ডেবিউ টেস্টে শতরান করে সৌরভ তখন ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন যুবরাজ, গোটা দেশের নয়নের মণি। কিন্তু কলকাতায় পা দিয়েই তিনি বুঝতে পারলেন, ওর জীবনের আসল সেঞ্চুরিটা ডোনাকে ছাড়া সম্পূর্ণ হবে না। এদিকে দুই পরিবার তখনো বিয়ের জন্য একেবারেই রাজি ছিল না। পাপারাজ্জি ও পরিবারের চোখ এড়িয়ে ১৯৯৬ সালের আগস্ট মাসে এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে গোপনে আইনি বিয়ে বা রেজিস্ট্রি সারেন সৌরভ ও ডোনা। বিয়ের পর যে যার নিজের বাড়িতে ফিরে যান এবং খবরটি সম্পূর্ণ গোপন রাখেন। কিন্তু ‘মহারাজ’-এর গোপন বিয়ের খবর কি আর গোপন থাকে? কিছু দিন পরেই দুই পরিবারে এ খবর চাউর হতেই চরম অশান্তির সৃষ্টি হয়।

পরিবারের মেনে নেওয়া ও আনুষ্ঠানিক বিয়ে

সেই সময় টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনা জানিয়েছিলেন, বিয়ের খবর জানাজানি হতে দুই পরিবার পাগল হয়ে উঠেছিল। আমি ব্রাহ্মণ ছিলাম না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা সবাই মেনে নিয়েছিল। অবশেষে ১৯৯৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়েটা সারি।

হ্যাঁ, সিনেমার গল্পের মতোই, রাগ-অভিমান শেষে দুই পরিবারই বুঝতে পেরেছিল যে এই দুই তরুণ-তরুণীর প্রেমকে আলাদা করা অসম্ভব। সব পুরোনো বৈরিতা ও শত্রুতা ভুলে অবশেষে রাজসিকভাবে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৯৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথাগত বাঙালি আচার মেনে আনুষ্ঠানিকভাবে চার হাত এক হয় সৌরভ ও ডোনার। আজ এত বছর পার করেও ওদের সেই ‘নেক্সট ডোর’ প্রেম এবং বোঝাপড়া একই রকম অটুট।

ডোনা বলেন, ‘আমি কোনো ক্রিকেটারকে ভালোবেসে বিয়ে করিনি। আমি ভালোবেসেছিলাম আমার পাশের বাড়ির সেই চেনা মানুষটিকে।’ আর এই সততাই বোধহয় রায় ও গাঙ্গুলি পরিবারের সেই কঠিন পাঁচিল ভেঙে তৈরি করেছিল এক নতুন ইতিহাস।