নৃত্য দিবস উদযাপন এবং আত্মসমালোচনার দিন—এমনটাই মনে করেন বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী লায়লা হাসান। তাঁর মতে, এই দিনটি শিল্পীদের একত্রিত হওয়ার এবং নিজেদের কাজের মূল্যায়নের সুযোগ করে দেয়।
বাংলাদেশে নৃত্য দিবসের সূচনা
বাংলাদেশে ১৯৯২ সালে প্রথম নৃত্য দিবস পালন শুরু হয়। লায়লা হাসান জানান, আন্তর্জাতিক থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) ডান্স কমিটির উদ্যোগে এই আয়োজন শুরু হয়। ধীরে ধীরে এটি একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, যেখানে দেশি-বিদেশি শিল্পীরা অংশ নেন।
নাচ: শিল্প ও আত্মপ্রকাশের মাধ্যম
লায়লা হাসানের মতে, নাচ শুধু একটি শিল্প নয়, এটি আত্মপ্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম। শরীরের ভাষার মাধ্যমে মনের কথা, জীবনের অভিজ্ঞতা ও অবস্থান প্রকাশ করা যায়। নাচের আসল শক্তি হলো অনুভূতিকে শরীরের ভঙ্গির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা।
শিক্ষার পদ্ধতিতে পরিবর্তন
ষাটের দশকে নাচ শেখা ছিল মূলত গুরু-শিষ্য পরম্পরাভিত্তিক। তখন সরাসরি গুরুর কাছেই শিখতে হতো এবং শেখাটা ছিল নিবিড়। বর্তমানে শেখার সুযোগ অনেক বেশি। দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষক, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ইউটিউব ও অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে নাচ শিখতে পারছে। তবে লায়লা হাসান মনে করেন, আগের সময়ের শেখা ছিল সীমিত কিন্তু গভীর, আর এখন শেখা বিস্তৃত ও বহুমুখী।
গুরু-শিষ্য পরম্পরার গুরুত্ব
প্রযুক্তির যুগেও গুরু-শিষ্য পরম্পরার গুরুত্ব কমেনি বলে মনে করেন লায়লা হাসান। নাচের ভাব, ব্যাকরণ, শুদ্ধতা ও অভ্যন্তরীণ উপলব্ধি শেখার জন্য সরাসরি গুরু প্রয়োজন। ভিডিও দেখে শিখলে বাহ্যিক অঙ্গভঙ্গি আয়ত্ত করা গেলেও শিল্পের গভীরতা ও শুদ্ধতা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।
সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল নাচ
সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল নাচকে লায়লা হাসান মিশ্রভাবে দেখেন। ইতিবাচক দিক হলো, এটি নাচের প্রতি আগ্রহ তৈরি করে এবং নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করে। তবে নেতিবাচক দিক হলো, ভাইরাল নাচ শিল্পের গভীরতা, ঐতিহ্য ও শাস্ত্রীয় ভিত্তি উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়। তিনি মনে করেন, ভাইরাল নাচ শিল্পের মূল চালিকা শক্তি নয়, তবে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে সীমিত উপকার হতে পারে।
বাংলাদেশের নাচের বৈশ্বিক অবস্থান
বৈশ্বিক প্রভাবের মধ্যে বাংলাদেশের নাচ একটি পরিবর্তনশীল কিন্তু শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। লায়লা হাসান বলেন, বিশ্বায়নের ফলে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাচের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয়েছে। অনেক শিল্পী নিজস্ব ঐতিহ্য ধরে রেখে কাজ করছেন, আবার কেউ কেউ ফিউশন বা এক্সপেরিমেন্টাল কাজ করছেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশের নাচ নিজস্ব পরিচয় ও ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
মঞ্চ বনাম ভিডিও পারফরম্যান্স
মঞ্চভিত্তিক নাচকে বেশি চ্যালেঞ্জিং ও স্থায়ী মূল্যবোধসম্পন্ন মনে করেন লায়লা হাসান। মঞ্চে একজন শিল্পীকে দীর্ঘদিনের অনুশীলন ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে তৈরি হতে হয়। সেখানে কোনো রিটেক নেই, একবারেই নিজের দক্ষতা প্রমাণ করতে হয়। অন্যদিকে ভিডিও বা রিলস তুলনামূলকভাবে সহজ, যেখানে এডিটিং ও বারবার চেষ্টার সুযোগ থাকে। তবে মঞ্চের গভীরতা ও স্থায়িত্ব অনেক বেশি।
পেশা হিসেবে নাচের বাস্তবতা
লায়লা হাসান স্বীকার করেন, বাংলাদেশে নৃত্যশিল্পকে পেশা হিসেবে নেওয়া এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়। দক্ষ শিল্পী ও শিক্ষকের অভাব নেই, কিন্তু পর্যাপ্ত প্ল্যাটফর্ম ও স্থায়ী আয়ের সুযোগ সীমিত। অধিকাংশ নৃত্যশিল্পীকে অন্য পেশায় যুক্ত থাকতে হয় এবং নাচ চালিয়ে যেতে হয় ভালোবাসা থেকে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও তুলনামূলকভাবে কম। তবে ভবিষ্যতে সঠিক পরিকল্পনা ও পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে নাচের পেশাগত সুযোগ বাড়তে পারে বলে আশা করেন তিনি।
নারী নৃত্যশিল্পীদের অবস্থান
নারী নৃত্যশিল্পীদের জন্য পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন লায়লা হাসান। এখন নারীরা আগের চেয়ে বেশি স্বাধীনভাবে প্রশিক্ষণ নিতে পারছেন, দলগতভাবে কাজ করতে পারছেন এবং আয় করছেন। তাঁরা নিজেদের যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজ অর্জন করছেন এবং আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠছেন। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, নারীরা এখন নিজেদের মূল্য বুঝতে শিখেছেন এবং আত্মপ্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।
নতুন প্রজন্মের জন্য বার্তা
নতুন প্রজন্মের নৃত্যশিল্পীদের উদ্দেশে লায়লা হাসানের পরামর্শ হলো, প্রথমেই শিল্পটিকে গভীরভাবে শেখার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। নাচের ইতিহাস, ব্যাকরণ ও ঐতিহ্য বুঝতে হবে। দীর্ঘদিনের সাধনা, নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমেই একজন প্রকৃত শিল্পী তৈরি হয়। ফাঁকি দিয়ে বা অল্প জ্ঞান নিয়ে বেশি দিন এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই তিনি বলেন, নিষ্ঠাবান হও, নিয়মিত চর্চা করো এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজেকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাও, যেখানে তুমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দেশ-বিদেশে নিজের শিল্প উপস্থাপন করতে পারো।



