বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী সংগ্রামী মানুষ সত্যেন সেনের ১১৯তম জন্মদিন উপলক্ষে নানা আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যায় ছায়ানট মিলনায়তনে সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর আয়োজনে বিশিষ্ট নজরুলসংগীতশিল্পী ও মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠযোদ্ধা শাহীন সামাদকে সত্যেন সেন সম্মাননা পদক প্রদান করা হয়। নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ তাঁর হাতে এই সম্মাননা স্মারক তুলে দেন এবং বাংলাদেশের প্রথম মানচিত্রের ছাপ অঙ্কিত উত্তরীয় পরিয়ে দেন।
আলোচনা ও সংগীতের মধ্য দিয়ে জন্মদিন উদযাপন
অনুষ্ঠান শুরু হয় সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত ও সত্যেন সেনের লেখা গান ‘হাতুড়িতে পেটাও লোহা/ মাকুতে দাও টান রে মজুর’ পরিবেশনার মাধ্যমে। আলোচনা পর্বে মামুনুর রশীদ বলেন, ‘সত্যেন সেন কেবল বাংলাদেশেই নন, ভারতসহ বিশ্বের সব প্রান্তে বসবাসকারী সচেতন বাঙালির কাছেই পরিচিত। সাংস্কৃতিক জাগরণকে তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন।’ তিনি শাহীন সামাদকে এই সম্মাননা পাওয়ার জন্য অভিনন্দন জানান।
শাহীন সামাদের প্রতিক্রিয়া
পুরস্কারের প্রতিক্রিয়ায় শাহীন সামাদ বলেন, ‘সত্যেন সেনের মতো ব্যক্তিত্বের নামাঙ্কিত এই সম্মাননা পেয়ে আমি আনন্দিত। বিশেষ করে প্রথম দিকের জাতীয় পতাকার ছাপযুক্ত উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়ায় আমি খুবই অভিভূত। যেন ৫৫ বছর আগের সেই মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর স্মৃতি আমার মনে ফিরে এসেছে।’
উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর বিশেষ আয়োজন
এদিকে, ‘মুক্তির সেনানীরা ছুটে আয়, মৃত্যু ও জীবনের মোহনায়’ স্লোগান নিয়ে সত্যেন সেনের ১১৯তম জন্মদিনের অনুষ্ঠান করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। শনিবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এই অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল সম্মিলিত কণ্ঠে সত্যেন সেনের গান ‘মানুষেরে ভালোবাসি’ গানটি দিয়ে। উদীচী (একাংশ) কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিমের সভাপতিত্বে এ পর্বে বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি প্রবীর সরদার, সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে, প্রদীপ ঘোষ, মুরশিকুল ইসলামসহ অনেকে।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনা
উদীচীর আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সমবেত সংগীত পরিবেশন করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংগীত বিভাগের শিল্পীরা। এ ছাড়া একক সংগীত পরিবেশন করেন অরুণিমা আহমেদ ও অনপুম হালদার। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন শিখা সেন গুপ্তা ও সৈয়দা রত্না। এই পর্ব সঞ্চালনা করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য সৈয়দা অনন্যা রহমান।
বিভিন্ন সংগঠনের অংশগ্রহণ
ছায়ানট মিলনায়তনের অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর সহসভাপতি নিগার চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য দেন ও সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী। পরে সত্যেন সেনের কবিতা ‘মানুষের কাছে পেয়েছি যে বাণী তাই দিয়ে রচি গান’ আবৃত্তি ও গানের যুগলবন্দী পরিবেশন করেন নায়লা তারান্নুম ও নবনীতা জাহিদ।
বিশেষ পরিবেশনা
সত্যেন সেনের গান ‘আজব কাণ্ড ঘটেছে রে ভাই’ পরিবেশন করেন সুরাইয়া পারভীন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পীদের দলীয় সংগীত, নৃত্য ও বিশিষ্ট শিল্পীদের একক সংগীত পরিবেশন করা হয়। দলীয় সংগীতের মধ্যে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী পরিবেশন করে ‘মানুষের মাঝে বসবাস করি’, ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীর পরিবেশনা ছিল ‘নতুন দিনের নতুন ভোরে ডাক দিয়ে যায়’, বহ্নিশিখার শিল্পীরা গেয়েছেন ‘আজ যত যুদ্ধবাজ’। গেন্ডারিয়া কিশলয় কচিকাঁচার মেলার শিশুরা পরিবেশন করে ‘ও আমার দেশের মাটি’। অণিক বসুর পরিচালনায় ‘আজি এ বসন্তে’ গানের সঙ্গে সমবেত নৃত্য পরিবেশন করেন স্পন্দনের শিল্পীরা।
উদীচীর উঠানের উদ্বোধন
সত্যেন সেনের জন্মদিনে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী উদ্বোধন করে গান, আড্ডা, গল্পের ধারাবাহিক আয়োজন ‘উদীচীর উঠান’। উদ্বোধনী দিনে উদীচীর উঠানে গান পরিবেশন করেন আমন্ত্রিত শিল্পী সায়ান। শিল্পী সায়ানের গানের মাঝে মাঝে শ্রোতারা তাঁদের আবেগ–অনুভূতির কথা বলেন। অনুষ্ঠানে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী দলীয় সংগীত পরিবেশন করেন। একক সংগীত পরিবেশন করেন মায়েশা সুলতানা ও মীর সাখাওয়াত হোসেন। কবিতা আবৃত্তি করেন সজীব তানভীর ও আবদুল্লাহ আল নিশাত।
সত্যেন সেন ছিলেন একাধারে সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিল্পী ও বাম রাজনৈতিক নেতা। তিনি উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত। তাঁর জন্মদিনে এই নানা আয়োজন সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার প্রতি তাঁর অবদানকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।



