নীরবতার ভাষায় গল্প বলা
লস অ্যাঞ্জেলেসে বসন্তের এক নরম দুপুর। জানালার কাচ গলে ঢুকে পড়া রোদ ঘরের ভেতর একটা শান্ত উষ্ণতা তৈরি করেছে। বাইরে শহরের কর্মচাঞ্চল্য, গাড়ির শব্দ; কিন্তু এই ঘরের ভেতর সময় যেন একটু ধীরে চলছে। এ পরিবেশেই কাজী মশহুরুল হুদার সঙ্গে কথা শুরু করি। স্বাধীনতা–পরবর্তী বাংলাদেশের মূকাভিনয় আন্দোলনের এক অন্যতম শিল্পী তিনি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে থাকলেও তাঁর শিল্পচিন্তা, গবেষণা ও অনুশীলনের কেন্দ্র এখনো বাংলাদেশ।
প্রথম মূকাভিনয় দেখা
স্বাধীনতা–পরবর্তী বাংলাদেশে ব্রিটিশ কাউন্সিল অডিটোরিয়াম আর বিটিভিতে মার্কিন মাইমশিল্পী অ্যাডাম দারিউসের একটি পরিবেশনা দেখে প্রথম মূকাভিনয়ের শক্তি অনুভব করেন মশহুরুল। বুঝতে পারেন, শব্দ ছাড়াও গল্প বলা যায়, নীরবতা নিজেই একটি শক্তিশালী ভাষা।
নাট্যচক্রে যুক্ত হওয়া
এরপর নাটকের দল নাট্যচক্রে যুক্ত হন মশহুরুল। এ জায়গাটিই তাঁর শিল্পচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। এখানে তিনি শুধু পারফরম্যান্সই করেননি; বরং মূকাভিনয়কে বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন। কীভাবে শরীর একটি ভাষা হতে পারে, কীভাবে নীরবতা অর্থ তৈরি করতে পারে, কীভাবে একটি ভঙ্গি একটি সম্পূর্ণ গল্প বলতে পারে, এ প্রশ্নগুলো তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে জায়গা করে নেয়। পরে তাঁর কাজ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মঞ্চে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি ব্রিটিশ কাউন্সিল অডিটোরিয়ামে বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশ নেন। সে সময় বিটিভিতে তাঁর পরিবেশনা তাঁকে দেশের বৃহত্তর দর্শকের কাছে নিয়ে যায়।
বর্তমান কার্যক্রম
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ছোট পরিসরের পারফরম্যান্স ও অনলাইন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন মশহুরুল। দূরে থেকেও তাঁর কাজের কেন্দ্র এখনো বাংলাদেশ। তিনি বলেন, ‘শরীর যেখানে থাকে, সংস্কৃতির শিকড় সেখানে থাকে না। স্মৃতি, অভিজ্ঞতা আর ভাষার ভেতরে থাকে শিকড়।’
বাঙলা মূকাভিনয় গবেষণা কেন্দ্র
দীর্ঘ শিল্পযাত্রায় একটা চিন্তা বারবার ফিরে আসে, বাঙলা মূকাভিনয় নামে একটি স্বতন্ত্র দেহভাষা তৈরি করা। মশহুরুলের মতে, পাশ্চাত্যের মাইম একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতরে গড়ে উঠেছে, যেখানে ফর্ম, টেকনিক ও শারীরিক নিয়ন্ত্রণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে ব্যালে ও প্রশিক্ষিত শরীরচর্চার প্রভাব স্পষ্ট। সেই কাঠামোর বাইরে গিয়ে জীবনের ভেতর থেকে উঠে আসে বাঙলা মূকাভিনয়। এটি কোনো অনুকরণ নয়, বরং অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে জন্ম নেওয়া একটি স্বতন্ত্র শিল্পভাষা।
এই চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিতে মশহুরুল প্রতিষ্ঠা করেছেন বাঙলা মূকাভিনয় গবেষণা কেন্দ্র। এখানে তরুণ শিল্পীদের নিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কশপ ও গবেষণামূলক কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘মূকাভিনয়ে গবেষণা মানে শুধু বই লেখা নয়, বরং শরীর দিয়ে চিন্তা করা।’ তাঁর মতে, এই শিল্পে তত্ত্ব ও প্রয়োগ আলাদা কিছু নয়, বরং একে অপরের সঙ্গে জড়িত।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
মশহুরুলের মতে, বিশ্বায়নের এই সময়ে প্রতিটি জাতির নিজের সংস্কৃতি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা প্রয়োজন। আর মূকাভিনয় সেই কাজের জন্য একটি শক্তিশালী মাধ্যম। তিনি বিশ্বাস করেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাঙলা মূকাভিনয়ের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তবে এর জন্য এটিকে একটি স্বতন্ত্র শিল্পধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
তরুণ প্রজন্মের প্রতি বার্তা
তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে মশহুরুল হুদার বার্তা, ‘এই শিল্পে শুধু আগ্রহ থাকলেই হবে না, দরকার নিয়মিত চর্চা, শৃঙ্খলা এবং নিজের সংস্কৃতিকে গভীরভাবে বোঝা।’ কথোপকথনের শেষ মুহূর্তে মশহুরুল আবারও একই কথায় ফিরে যান, ‘মূকাভিনয়ে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো চর্চা।’ কিন্তু সেই কথার ভেতরেও তাঁর শরীর যেন আরও কিছু বলে যায়। মনে হয়, তিনি শুধু একটি শিল্প নিয়ে কথা বলছেন না, বরং একটি নীরব ভাষাকে জীবন্ত করে তুলছেন, যা সীমান্ত মানে না, সময় মানে না।



