চট্টগ্রামের হাজারিখিল বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যে সেগুনগাছে ধূসর বুলবুলির দেখা মিলেছে। প্রায় ১৩ বছর আগে লালমাথা ট্রোগনের ছবি তোলার সময় প্রথমবারের মতো এই পাখিটি দেখেছিলেন বন্য প্রাণী আলোকচিত্রী তানিয়া খান। তবে তখন পাখিটির বয়স কম থাকায় পালকের রং ফ্যাকাশে ছিল। মাত্র দুটি ক্লিক করতেই পাখিটি উড়ে যায়।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর পুনরায় দেখা
প্রায় পৌনে ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও পাখিটির আর দেখা মেলেনি। অবশেষে ২০২৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর আদমপুর বিটে আবারও দেখা মেলে ধূসর বুলবুলির। এবার পাখিটি বয়স্ক ছিল, সোনালি ডানা ও ধূসর পিঠের পালকের রং চমৎকার ছিল। তবে মাত্র ২-৩ সেকেন্ডের জন্য দেখা দেওয়ায় ভালো ছবি তোলা সম্ভব হয়নি।
হাজারিখিলে নতুন সাক্ষাৎ
ঠিক ১৩ মাস পর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির হাজারিখিল বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যে আবার দেখা মেলে পাখিটির। তবে অতি লাজুক স্বভাবের কারণে সেগুনগাছের পাতার নিচে অন্ধকারে থাকায় ঝকঝকে ছবি তোলা যায়নি। চলতি বছরের ২৭ মার্চ দুপুরে হাজারিখিলের ছড়ার গহিনে এক বাঁশঝাড়ে আরেকটি সাক্ষাৎ ঘটে। বার্ডিংবিডি ট্যুরসের জাবের আনসারি পাখিটির রেকর্ড করা ডাক বাজালে বাঁশঝাড়ে লাফালাফি শুরু হয়, কিন্তু অন্ধকার ও ডালপালার কারণে ছবি তোলা কষ্টকর ছিল।
ধূসর বুলবুলির পরিচিতি
ধূসর বুলবুলি বাংলাদেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি। ইংরেজি নাম এশি বুলবুল। পিকনোনটিডি গোত্রের এই পাখির বৈজ্ঞানিক নাম Hemixos flavala। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এদের দেখা মেলে।
শারীরিক বৈশিষ্ট্য
প্রাপ্তবয়স্ক ধূসর বুলবুলির দৈর্ঘ্য ২০ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৩৩ গ্রাম। মাথার ঝুঁটি উষ্কখুষ্ক। মাথা ও মুখ কালচে-ধূসর। চোখের নিচ থেকে ঠোঁট পর্যন্ত একটি তিনকোনা কালো পট্টি থাকে। কানঢাকনি ফ্যাকাশে তামাটে-বাদামি। দেহের ওপরটা কালচে-ধূসর। ডানার মধ্যপালক-ঢাকনিজুড়ে জলপাই-সোনালি চওড়া পট্টি দেখা যায়। গাল-গলা সাদা। বুক, পেট ও দেহের নিচটা ধূসরাভ-সাদা। লেজ গাঢ় বাদামি-ধূসরাভ। ঠোঁট কালো। চোখ কিছুটা লালচে-বাদামি। পা ও পায়ের পাতা কালচে-বাদামি। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির ঝুঁটি ছোট এবং পিঠে বাদামি ভাব বেশি থাকে।
আবাসস্থল ও আচরণ
এরা সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনের বাসিন্দা। দিবাচর ও বৃক্ষচারী পাখিগুলো সচরাচর জোড়ায় বা ছোট দলে থাকে। ঝুলন্ত লতাপাতা ও গাছের পত্রগুচ্ছে খাবার খোঁজে। পাকা ফল, ফুলের নির্যাস ও পোকামাকড় খায়। মাঝেমধ্যে পানি পানের জন্য ছড়ার পাথরের ওপর নামে। ডাক বৈচিত্র্যময়; কখনো সংক্ষিপ্ত, কখনো সুরেলা খচখচে স্বরে ভরা।
প্রজনন ও জীবনচক্র
মে থেকে জুলাই প্রজননকাল। এ সময় মাটি থেকে ২-১২ মিটার উচ্চতায় ঝোপঝাড়ে বা ঝুলন্ত লতাপাতার মধ্যে মরা পাতা, ঘাসের ডাঁটা ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে ছোট্ট চ্যাপটা বাটির মতো বাসা বানায়। স্ত্রী পাখি দুই থেকে পাঁচটি ঘন লালচে-বেগুনি ছিটছোপে ভরা হালকা গোলাপি ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে তা দেয় ও ছানাদের লালনপালন করে। ডিম ফোটে ১২-১৪ দিনে। আয়ুষ্কাল ৫-৮ বছর।
আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ এবং অধ্যাপক, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।



