গত ২৯ মে নিজের ফেসবুক আইডিতে ‘জীবনে একা চলতে শেখা দরকার…’ লিখেছিল কিশোর জুনায়েদ ইসলাম ওরফে সিফাত (১৬)। এক মাসের ব্যবধানে সে কথাই যেন নির্মম বাস্তবতা হয়ে সামনে এল সিফাতের জীবনে। গত বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সিফাতের মা ও তিন বোনকে। পরিবারটিতে কেবল বেঁচে রয়েছে কিশোর সিফাত।
ঘটনার বিবরণ
গত বৃহস্পতিবার রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার নদীর পাড়ের একটি ভাড়া বাসায় মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনাটি ঘটে। এতে নিহত হন শাহিনুর বেগম (৪০) এবং তাঁর তিন মেয়ে সাইমা আক্তার (২১), নাফিসা আক্তার ইকরা (১৭) ও ফাতেমা আক্তার সিপা (১০)। সিফাতের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলার লটিয়া গ্রামে। গত শুক্রবার রাতে গ্রামটির সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয় সিফাতের মা ও তিন বোনকে। দাফন শেষে গ্রামের বাড়িতেই অবস্থান করছে সিফাত। আজ রোববার লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ফিরে আসার কথা রয়েছে তার।
সিফাতের বক্তব্য
গতকাল শনিবার রাত ১১টার দিকে মুঠোফোনে কথা হয় সিফাতের সঙ্গে। ফেসবুকে দেওয়া নিজের সেই স্ট্যাটাসের প্রসঙ্গে তুলে সিফাত বলে, ‘কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই কথাগুলো লিখেছিলাম। তখনো ভাবিনি, একদিন আমার জীবনের সঙ্গে এটি কাকতালীয়ভাবে মিলে যাবে। এখন মনে হচ্ছে, সত্যিই আমি একা হয়ে গেছি।’
মা ও তিন বোনের লাশ উদ্ধারের ঘটনা ভুলতে পারছেন না জানিয়ে সিফাত বলে, ‘আমি যে দোকানে চাকরি করি, সেখান থেকে ছুটে এসে ঘরে ঢুকতেই দেখি আমার মা রান্নাঘরে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। পাশের কক্ষে তিন বোনের রক্তাক্ত দেহ। পুরো ঘর রক্তে ভেসে গিয়েছিল। সেই দৃশ্য আমি কোনোভাবেই ভুলতে পারছি না।’
অন্তর মজুমদারের বিষয়ে জানতে চাইলে সিফাত বলে, ‘অন্তর একসময় আমাদের ভবনের ওপরের তলায় ভাড়া থাকত। সে কারণে দু-একবার কথা হয়েছে। এর বাইরে তার সঙ্গে আমাদের কোনো ঘনিষ্ঠতা বা বিরোধ ছিল না। মা ও তিন বোনকে হত্যার ঘটনায় অন্তরের নাম শুনে আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি। কেন সে এমন ঘটনা ঘটাবে, তা এখনো বুঝতে পারছি না।’
অভিযুক্তের মৃত্যু
খুনের ঘটনার পর পালানোর সময় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকে স্থানীয় লোকজন আটক করে গণপিটুনি দেন। পরে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। অন্তরের বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায়। তাঁর বাবার নাম কার্তিক মজুমদার।
পুলিশ তদন্ত
ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ একটি ধারালো ছেনি (ধারালো অস্ত্র) আলামত হিসেবে জব্দ করেছে। সিফাতের দাবি, ওই ধারালো অস্ত্র তাদের বাসার নয়। সে বলে, ‘আমাদের বাসায় কোনো ছেনি ছিল না। আমার ধারণা, অন্তর হত্যার উদ্দেশ্যেই এটি তার সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল।’
রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, ‘মা ও তিন মেয়েকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে পুলিশ। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে সম্ভাব্য সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
সিফাতের পারিবারিক প্রেক্ষাপট
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জীবিকার সন্ধানে কুমিল্লা থেকে পরিবার নিয়ে রায়পুরে এসেছিলেন সিফাতের বাবা কামাল হোসেন। ২০১৯ সালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান কামাল। সেই থেকে শাহিনুর বেগমই সংসারের খরচ চালিয়ে আসছিলেন। কিছুদিন আগে সিফাত একটি রড-সিমেন্ট বিক্রির দোকানে চাকরি নেয়।
সিফাত আরও বলে, ‘প্রতিদিন সকালে আমি কাজে বের হওয়ার সময় ছোট বোন সিপাও আমার সঙ্গে বের হতো। আমি তাকে স্কুলের পথে নামিয়ে দিতাম। সেদিনও সকাল আটটার দিকে বের হওয়ার সময় তাকে ডাকি। কিন্তু ও তখন ঘুমিয়ে ছিল। তাই আর না ডেকে বাসায় রেখেই চলে আসি। কে জানত, এটাই ওকে শেষবারের মতো দেখা হবে।’
সংসদ সদস্যের সহায়তা
গতকাল সিফাতের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেন কুমিল্লা-২ আসনের (হোমনা-তিতাস) সংসদ সদস্য সেলিম ভূঁইয়া। এ সময় সিফাতকে কুমিল্লায় ফিরিয়ে নিয়ে এসে তার লেখাপড়াসহ সার্বিক খরচের দায়িত্ব নিতে চান বলে জানান এই সংসদ সদস্য। সেলিম ভূঁইয়া বলেন, ‘মা ও তিন বোন নিহত হওয়ার পর লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে বসবাস সিফাতের জন্য নিরাপদ নয়।’
সিফাতকে পৈতৃক সম্পত্তি দ্রুত বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য তার চাচা ও গ্রামবাসীকে অনুরোধ জানান সংসদ সদস্য সেলিম ভূঁইয়া। লক্ষ্মীপুরের জেলা পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলে হত্যাকারীদের দ্রুত খুঁজে বের করার তাগিদও দেন তিনি। সিফাতের হাতে সহায়তার কিছু নগদ অর্থও তুলে দেন সংসদ সদস্য সেলিম ভূঁইয়া। এ সময় তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন হোমনা উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. মহিউদ্দিন, কুমিল্লা উত্তর জেলার স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব মো. ওয়াহিদুজ্জামান মোল্লা, হোমনা পৌর বিএনপির সভাপতি মো. সানাউল্লাহ সরকার, সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম প্রমুখ।



