যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তাবোধ ভেঙে দিয়েছে, তাদের জ্বালানি-নির্ভর অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে এবং প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এই যুদ্ধ তাদের মাটিতে থাকা আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলোকে হাজার হাজার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।
নিরাপত্তার ভ্রম ভাঙল
উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মানুষ গত কয়েক দশক ধরে যুদ্ধকে দেখেছেন টেলিভিশনের পর্দায়—ইয়েমেন, সিরিয়া, ফিলিস্তিনের গাজায়। কিন্তু নিজেদের দেশে নয়। পশ্চিমা দেশগুলোর নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিতে তারা নিশ্চিন্ত ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ সেই নিরাপত্তার ভ্রম ভেঙে দিয়েছে।
গত কয়েক মাসে দুবাই ও দোহার মতো শহরে বড় বড় বিস্ফোরণ, বিলাসবহুল অট্টালিকা জ্বলতে দেখা গেছে—এ দৃশ্য আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে অকল্পনীয় ছিল। মিসাইল হামলার সতর্কবার্তা মোবাইলে বেজে উঠলে বাবা-মায়েরা সন্তানদের নিয়ে বাড়ির করিডরে আশ্রয় নিতেন। আমিরাতে কয়েক সপ্তাহ স্কুল বন্ধ ছিল এবং অনেক ধনী বিদেশি বাসিন্দা দেশ ছেড়ে চলে যান।
অর্থনীতিতে প্রভাব
এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি-নির্ভর অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো ইরানের কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। ভবিষ্যতে ইরান আবারও এটি বন্ধ করতে পারে—এই আশঙ্কা পুরো অঞ্চলের ওপর ভর করছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে কীভাবে তেল, খাদ্য এবং অন্যান্য পণ্য তাদের দেশে আনা-নেওয়া হবে।
আমিরাত সরকার এখন ‘হরমুজ নির্ভরতা শূন্য’ নীতি গ্রহণ করেছে। তারা প্রণালির বাইরে নতুন বন্দর গড়ে তুলছে এবং তেল পাইপলাইন ও রেলপথ নির্মাণ করছে। অন্যদিকে ওমান, যার আরব সাগরের তীরে হরমুজ প্রণালির অনেক বাইরে বন্দর রয়েছে, এখন প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
প্রতিরক্ষা কৌশলে পরিবর্তন
নিজেদের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠায় উপসাগরীয় দেশগুলো এখন সামরিক শক্তি বাড়াতে ও প্রতিরক্ষায় আরও বেশি বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। গত এক দশকের বড় বড় উন্নয়নমূলক ও আশাবাদী প্রকল্পের জায়গায় এখন নতুন এক সতর্ক মানসিকতা দেখা যাচ্ছে। কাতারের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা খালিদ আল-জাবের বলেন, 'এই যুদ্ধ এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এই ক্ষত সারাতে অনেক সময় লাগবে।'
উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও ৩০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন।
মার্কিন আশ্বাস ও উপসাগরীয় হতাশা
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি অঞ্চলের একাধিক আরব নেতার সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন। কুয়েতে সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করে এমন কিছু করবে না। তবে পর্দার আড়ালে উপসাগরীয় দেশগুলোর বহু কর্তা তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র—নিয়ে এক ধরনের হতাশা ও অসন্তোষ অনুভব করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রাথমিক চুক্তিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর মূল উদ্বেগের বিষয়গুলো—যেমন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভান্ডার বা আঞ্চলিক মিলিশিয়াদের প্রতি তার সমর্থন—প্রায় উল্লেখই করা হয়নি। এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর তেলের নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে, যা ইরানের অর্থনীতির জন্য বড় সুবিধা হয়ে উঠতে পারে।
বিভাজন ও নতুন জোট
এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোকে একত্রিত করার বদলে তাদের মধ্যে বিভাজন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের জোট আরও শক্তিশালী করেছে। কাতার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়েছে। সৌদি আরব নিজেদের বিকল্প খোলা রাখার চেষ্টা করছে—একদিকে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে চায়, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রাখছে।
অন্যদিকে ওমান হরমুজ প্রণালিতে পরিষেবা ফি আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করায় ট্রাম্পের অসন্তোষের কারণ হয়েছে।
ভবিষ্যৎ উদ্বেগ
বাহরাইনের গবেষক মাহদি ঘুলুমের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা কিছুটা কমে গেছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হুমকি হয়তো আগের মতো কার্যকর নাও হতে পারে। যদিও বোমা হামলায় ইরান ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছিল, তবুও তাদের সরকার টিকে গেছে এবং তারা বুঝে নিয়েছে যে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ পথ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা শক্তিশালী হাতিয়ার ব্যবহার করতে পারে।
কাতারের গবেষক আল-জাবের বলেন, 'অনেকের মনে হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন উপসাগরীয় দেশগুলোকে এটিএম মেশিন হিসেবে দেখছে। এটি আরবদের অনেকের কাছেই বিরক্তিকর।'
ঘুলুমের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর উচিত ইরানের সঙ্গে নিজেদের উদ্যোগে আলাদা করে আলোচনা শুরু করা, এমনকি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তির পথও খোঁজা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, 'এই যুদ্ধের মধ্যে কিছু ইতিবাচক দিকও থাকতে পারে। এই সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোকে আরও শক্তিশালী ও অভিযোজনক্ষম করে তুলেছে। আমরা নিজেদের প্রমাণ করতে পেরেছি যে আমরা ভাবতাম তার চেয়েও অনেক বেশি সহনশীল ও দৃঢ়।'



