অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর নতুন সিরিজ ‘রাখ’ দর্শককে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ১৯৭০-এর দশকের দিল্লিতে। বৃষ্টিভেজা এক সন্ধ্যায় বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা দুই ভাইবোন অপরিচিত দুজনের গাড়িতে ওঠে। এরপর তারা আর বাড়ি ফেরে না। তদন্তের দায়িত্ব পড়ে নবীন পুলিশ কর্মকর্তা জয়প্রকাশের ওপর। কিন্তু দ্রুত একটি নিখোঁজের মামলা ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয় এবং শুরু হয় দেশজুড়ে তল্লাশি অভিযান।
গল্পের পটভূমি ও ঐতিহাসিক ঘটনা
সিরিজটি ১৯৭৮ সালের কুখ্যাত রাঙ্গা-বিল্লা হত্যাকাণ্ডকে অবলম্বন করে নির্মিত। এই আট পর্বের সিরিজটি নিছক একটি ক্রাইম থ্রিলার নয়। এটি একই সঙ্গে অপরাধ, শোক, সামাজিক বৈষম্য এবং একটি নিরাপদ শহরের হারিয়ে যাওয়ার গল্প। সত্তরের দশকের দিল্লি আজকের মতো আতঙ্ক আর সন্দেহে ভরা ছিল না। মানুষ অপরিচিতের গাড়িতে লিফট নিত, শিশুদের একা বাইরে যেতে দিতে ভয় পেত না পরিবার। কিন্তু এক বৃষ্টিভেজা দিনে দুই ভাইবোন সুমন (দিব্যা শর্মা) ও সাহিলের (ভিভিয়ান শর্মা) নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সেই বিশ্বাসের জগৎটাকেই ভেঙে চুরমার করে দেয়।
প্রধান চরিত্র ও অভিনয়
সিরিজের কেন্দ্রীয় চরিত্র সাব-ইন্সপেক্টর জয়প্রকাশ জাটভ (আলী ফজল)। সদ্য চাকরিতে যোগ দেওয়া এই তরুণ পুলিশ কর্মকর্তা একদিকে যেমন ভয়ংকর অপরাধের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেন, অন্যদিকে লড়তে হয় প্রশাসনিক জটিলতা ও জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে। আলী ফজলের অভিনয় সিরিজটির সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি চরিত্রটিকে অতিনাটকীয় করেননি। বরং সংযত, মানবিক এবং দৃঢ় এক পুলিশ কর্মকর্তার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন। তাঁর চোখের ভাষা, নীরবতা এবং ভেতরের অস্থিরতা চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
নিহত কিশোর-কিশোরীর বাবা-মায়ের চরিত্রে আমির বশীর ও সোনালি বেন্দ্রে গভীর বেদনার আবহ তৈরি করেছেন। অপরাধীদের চরিত্রে আকাশ মাখিজা (বাবু) ও রামদীপ যাদব (রাজ্জো) দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। বিশেষ করে বাবু চরিত্রটি ভয়ের কারণ হয় তার নিষ্ঠুরতার জন্য নয়, বরং তার স্বাভাবিকতার জন্য।
সামাজিক বাস্তবতা ও সময় নির্মাণ
সিরিজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর সময় নির্মাণ। সত্তরের দশকের দিল্লিকে যত্নের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। মোবাইল ফোন নেই, সিসিটিভি নেই, ডিজিটাল ডেটাবেজ নেই। তদন্ত এগোয় মানুষের স্মৃতি, সাক্ষ্য, কাগজপত্র, স্কেচ আর নিরলস অনুসন্ধানের ওপর নির্ভর করে। এই প্রেক্ষাপট সিরিজটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। কারণ, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ তদন্তের যুগে দাঁড়িয়ে সেই সময়ের পুলিশি অনুসন্ধান দেখতে ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।
একই সঙ্গে সিরিজটি তুলে আনে তৎকালীন ভারতের সামাজিক বাস্তবতাও। জয়প্রকাশের দলিত পরিচয়, তাঁর বাবার সংগ্রাম, মুসলিম সহকর্মী ও সাংবাদিক বন্ধুদের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে নির্মাতারা সমাজের এক বিস্তৃত ছবি আঁকার চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে জয়প্রকাশ ও তাঁর বাবার সম্পর্ক সিরিজটির আবেগঘন অংশগুলোর একটি। বাবা জীবনের বাস্তবতা মেনে নিয়ে টিকে থাকার পথ বেছে নিয়েছেন, আর ছেলে বিশ্বাস করে যোগ্যতা ও ন্যায়বিচারে। দুই প্রজন্মের এই মানসিক সংঘাত গল্পকে আরও গভীরতা দিয়েছে।
সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা
তবে ‘রাখ’ নিখুঁত নয়। কিছু ক্ষেত্রে সিরিজটি অতিরিক্ত ব্যাখ্যার ফাঁদে পড়েছে। অনেক সময় চরিত্ররা এমন সংলাপ বলে, যা দর্শককে ভাবতে দেওয়ার বদলে সরাসরি অর্থ বুঝিয়ে দেয়। কিছু দৃশ্যে অপরাধের ভয়াবহতা দেখানোর প্রয়াসও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি স্পষ্ট মনে হতে পারে। সিরিজটি অপরাধীদের মানসিক জগৎও দেখানোর চেষ্টা করে। কিন্তু এখানেই কিছু সমস্যা দেখা দেয়। অনেক সময় মনে হয় নির্মাতারা অপরাধীদের নিয়ে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করেছেন। তাদের সহিংসতা ও নৃশংসতার দৃশ্যগুলো কখনো কখনো গল্পের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি শক ভ্যালু তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।
সে কারণেই ‘রাখ’ ভালো হলেও অসাধারণ নয়। কারণ, এটি প্রায় সব ক্ষেত্রেই অন্য বিখ্যাত ক্রাইম সিরিজগুলোর তুলনায় এক ধাপ পিছিয়ে। তদন্তের অংশ ‘দিল্লি ক্রাইম’-এর মতো শক্তিশালী নয়, অপরাধীদের ট্র্যাক ‘পাতাল লোক’-এর মতো গভীর নয়, সাংবাদিকতার অংশ ‘স্কুপ’-এর মতো প্রভাব তৈরি করতে পারে না। একইভাবে শোক ও ট্র্যাজেডির উপস্থাপনাও ‘ট্রায়াল বাই ফায়ার’-এর আবেগে পৌঁছাতে পারে না।
আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো, সিরিজটি অনেক সময় তার ঐতিহাসিক ঘটনার গুরুত্বের ওপর নির্ভর করে এগোয়। ফলে কিছু জায়গায় আবেগ তৈরি হয় ঘটনার শক্তিতে, নির্মাণের শক্তিতে নয়।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
তবু সব মিলিয়ে ‘রাখ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ। কারণ এটি শুধু একটি অপরাধের পুনর্নির্মাণ নয়; এটি সেই অপরাধের সামাজিক প্রভাবের গল্প। সেই সময়ের দিল্লির গল্প, যখন একটি ঘটনা পুরো শহরকে বদলে দিয়েছিল। যখন বাবা-মায়েরা প্রথমবার বুঝেছিলেন, সন্তানদের নিরাপত্তা আর স্বাভাবিক বিষয় নয়।
সিরিজটির প্রতিটি পর্বের রানটাইম ৪০-৫০ মিনিট। এটি স্ট্রিমিং হচ্ছে অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওতে।



