পারমাণবিক বিস্ফোরণের মাধ্যমে গ্রহাণুর গতিপথ পরিবর্তন
গ্রহাণুর সরাসরি গায়ে আঘাত না করে যদি তার খুব কাছে, কয়েক শ মিটার এলাকার মধ্যে, পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, তাহলে উৎপন্ন ভয়ংকর তাপশক্তি বস্তুটির পৃষ্ঠের অংশকে গ্যাসে রূপান্তরিত করতে পারে। এই গ্যাসের প্রসারণের ফলে সৃষ্ট ধাক্কায় মূল গ্রহাণুর গতিপথে সামান্য পরিবর্তন আসতে পারে, যা ভরবেগ সংরক্ষণ সূত্রের মাধ্যমে রকেট উড্ডয়নের মতো কাজ করে। যদিও প্রথম দেখায় মনে হতে পারে গতিপথে সামান্য বিচ্যুতি খুব একটা লাভজনক নয়, কিন্তু মহাশূন্যে প্রতিটি ধাক্কা তাৎপর্যপূর্ণ। একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরিত করলে সম্মিলিত ধাক্কা গ্রহাণুটিকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সরিয়ে দিতে পারে, যার ফলে পৃথিবীকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই কৌশল পাথরের স্তূপসদৃশ গ্রহাণুর বিরুদ্ধেও কার্যকর, তবে সফলতার হার আগাম বলা কঠিন।
পারমাণবিক কৌশলের সীমাবদ্ধতা
এই কৌশলের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো সময়। পৃথিবীর দিকে ছুটে আসা গ্রহাণুকে আগেভাগে শনাক্ত করতে না পারলে ব্যর্থতার সম্ভাবনা বাড়ে, কারণ গ্রহাণু যত কাছে থাকবে, গতিপথ পরিবর্তনে তত বেশি ধাক্কার প্রয়োজন। বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞের মতে, ন্যূনতম ১০ বছর হাতে থাকলে ভালো হয়; অতিরিক্ত সাবধানীরা চান দ্বিগুণ সময়। তাত্ত্বিকভাবে এই কৌশল ছোট আকারের গ্রহাণুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভালো কাজ করে, কিন্তু এগুলো অনুজ্জ্বল হওয়ায় আগেভাগে খুঁজে পাওয়া কঠিন। হাতে বাড়তি সময় না থাকলে ভুল করার কোনো অবকাশ থাকে না; তখন পৃথিবীর সঙ্গে সংঘর্ষের আগেই আনুমানিক ২০টি পারমাণবিক বোমা গ্রহাণুর কক্ষপথে পৌঁছাতে হবে, নইলে মানবসভ্যতার আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস দেখা ছাড়া উপায় থাকে না।
কী-হোলের ধারণা ও ৯৯৯৪২ অ্যাপোফিস
এমনকি সবকিছু পরিকল্পনামাফিক ঘটলেও চিরস্থায়ী পরিত্রাণের নিশ্চয়তা নেই, কারণ বিস্ফোরণের ধাক্কায় কক্ষপথে কী পরিবর্তন আসবে তা আগেভাগে হিসাব করা প্রায় অসম্ভব। গ্রহাণুটি নতুন কক্ষপথে স্বল্প বা দীর্ঘ সময় ব্যবধানে পুনরায় পৃথিবীর দিকে ফিরে আসতে পারে। এর উদাহরণ হলো ৯৯৯৪২ অ্যাপোফিস, যা প্রায় ৩৪০ মিটার ব্যাস ও ২০ মিলিয়ন টন ভরের একটি পাথুরে গ্রহাণু। এটি সম্ভাব্য বিপজ্জনক বস্তুর তালিকায় রাখা হয়েছে; পৃথিবীর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রায় ৯০০ মেগাটন শক্তি অবমুক্ত হতে পারে। ২০২৯ সালের ১৩ এপ্রিল এটি মাত্র ১৯ হাজার মাইল দূর দিয়ে উড়ে যাবে, যা খালি চোখে দেখা যাবে। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে এ যাত্রায় সংঘর্ষের কোনো সুযোগ নেই, তবে একসময় আশঙ্কা ছিল যে এটি যদি মহাকাশের বিশেষ অঞ্চল (গ্র্যাভিটেশনাল কী-হোল) দিয়ে পাড়ি দেয়, তাহলে ২০৩৬ সালে সংঘর্ষ বাধতে পারে। প্রতি ৪৫ হাজার চক্রে সর্বোচ্চ ১ বার এই সম্ভাবনা থাকলেও সাবধান থাকা জরুরি।
ডার্ট মিশন: ভারী বস্তুর সংঘর্ষের সাফল্য
পারমাণবিক অস্ত্রের বিকল্প হিসেবে ভারী বস্তু দিয়ে ধাক্কা দেওয়ার কৌশল ইতিমধ্যে বাস্তবে পরীক্ষা করা হয়েছে। নাসার ডিপ ইমপ্যাক্ট মিশনে ২০০৫ সালের ৪ জুলাই একটি স্পেস প্রোবকে ‘টেম্পল ১’ ধূমকেতুর সঙ্গে সংঘর্ষ করানো হয়। ৩৫০ কেজির বেশি ভরের নভোযানটি প্রতি সেকেন্ডে ৬ মাইল বেগে আছড়ে পড়ে ৫ টন টিএনটির সমান শক্তি অবমুক্ত করে, যা ধূমকেতুর অভ্যন্তরীণ গঠন পর্যবেক্ষণের জন্য করা হয়েছিল। এরপর নাসার ডার্ট মিশন ছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসের প্রথম মিশন, যা কোনো গ্রহাণুর কক্ষপথ পরিবর্তনের জন্য নকশা করা হয়। লক্ষ্য ছিল ডাইমরফোস নামে একটি ছোট গ্রহাণু, যা ডিডিমোসকে প্রদক্ষিণ করে। ৬১০ কেজি ভরের মহাকাশযানটি ২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রতি সেকেন্ডে ৪ মাইল গতিতে ডাইমরফোসে আছড়ে পড়ে। সংঘর্ষে ৩ টন টিএনটির সমান শক্তি অবমুক্ত হয়, যা ডিপ ইমপ্যাক্টের তুলনায় ৪০ শতাংশ কম। তবুও গ্রহাণুটির পর্যায়কাল ৩৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ড কমে যায়, কারণ ডাইমরফোস টেম্পল ১-এর তুলনায় ১০ হাজার গুণ হালকা এবং সংঘর্ষে ছিটকে আসা পাথরগুলো ক্ষুদ্র রকেট ইঞ্জিনের মতো কাজ করে। ডার্ট মিশনের সাফল্যে প্রায় হাজার টন পাথর ও ধূলিকণা মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে, যা ৬ হাজার মাইল দীর্ঘ লেজ তৈরি করে। ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির হেরা মিশন ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গ্রহাণুটির নতুন রূপ পর্যবেক্ষণ করবে।
উপসংহার
পারমাণবিক অস্ত্রের আঘাতে গ্রহাণুর আগ্রাসন রুখতে গেলে যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, তার সবগুলোই ভারী বস্তু ব্যবহারের কৌশলেও উপস্থিত। তাই কোনো কৌশলকেই চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। তবে পারমাণবিক বিস্ফোরণের একটি শক্তিশালী বিকল্প খুঁজে পাওয়া নিশ্চয়ই স্বস্তিদায়ক।



