তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর: কূটনৈতিক ভারসাম্যের নতুন বার্তা
তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর: কূটনৈতিক ভারসাম্যের বার্তা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র চার মাসের মধ্যে তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীন বেছে নিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তটি নিছক একটি কূটনৈতিক সফরের বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নতুন অভিমুখের স্পষ্ট ঘোষণা। ঐতিহ্যগতভাবে নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রীরা প্রথম সফরে দিল্লি যেতেন। এবার সেই রীতি ভাঙা হয়েছে। ভারত প্রথমে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী সেই আমন্ত্রণ স্বীকারও করেছেন— কিন্তু বাস্তবে প্রথম গন্তব্য হলো কুয়ালালামপুর, তারপর বেইজিং। এই একটি সিদ্ধান্তের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের জটিলতা, সুযোগ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি— সব কিছু একসাথে উন্মোচিত হয়েছে।

ভারত-চীন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও চীনের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা নতুন নয়। শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ, পাকিস্তান— প্রতিটি দেশ এই দ্বন্দ্বের মধ্যে নিজের অবস্থান খুঁজে পেতে বিভিন্নভাবে সংঘাত ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে গেছে। বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে একটু আলাদা—ভারত দ্বারা তিনদিক থেকে পরিবেষ্টিত এই দেশটি ভৌগোলিকভাবে নয়াদিল্লির সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে আবদ্ধ। অথচ অর্থনৈতিক সম্পর্কের দিক থেকে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের প্রধান উৎস। এই দ্বৈত নির্ভরতা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে একটি স্থায়ী কূটনৈতিক টানাটানির মধ্যে রেখেছে।

শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল, কিন্তু একই সাথে চীনের সাথে বিশাল বিনিয়োগ চুক্তি করেছিল। পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র— এই প্রকল্পগুলোতে চীনের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। ঢাকা তখন এই নীতিকে বলতো ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। বাস্তবে তা ছিল অনেকটা দুই প্রতিবেশীর মধ্যে দক্ষতার সাথে সম্পর্কের খেলা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মালয়েশিয়া সফর: কৌশলী শুরু

তারেক রহমানের এই সফর অনেক বার্তা বহন করছে। প্রথমত, মালয়েশিয়াকে প্রথম সফরের গন্তব্য করে তিনি একটি চতুর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছেন। মালয়েশিয়া ভারতও নয়, চীনও নয়— এই নিরপেক্ষ ভূমি বেছে নিয়ে তিনি দুইপক্ষকেই আপাতত শান্ত রেখেছেন। মালয়েশিয়ায় প্রায় আট লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছেন যারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস— সেখানে কর্মসংস্থান ও অভিবাসন বিষয়ক আলোচনা ছিল সফরের প্রধান এজেন্ডা।

তারপরেও মালয়েশিয়া সফরের পরপরই চীন সফর— এটি এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। বেইজিং সফরে ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্বারক স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনা অর্থায়নের বিষয়টি আলোচনার অগ্রভাগে রয়েছে—যে প্রকল্পটি ভারত দীর্ঘদিন ধরে তার নিজের প্রভাব বলয়ের অংশ বলে মনে করে। তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে ভারত- বাংলাদেশ বিরোধ দশকের পুরোনো। এখন সেই প্রকল্পে যদি চীনা অর্থায়ন আসে, তাহলে ভারতের দৃষ্টিতে এটি স্পর্শকাতর অঞ্চলে বেইজিংয়ের সরাসরি পদচিহ্ন।

ভারতের প্রতিক্রিয়া ও দিল্লির পদক্ষেপ

ভারতীয় গণমাধ্যমে ইতোমধ্যে এই সফরকে নানা আলোয় ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য হিন্দু—একাধিক প্রভাবশালী পত্রিকা লিখেছে যে তারেক রহমান ভারতকে পাশ কাটিয়ে প্রথম সফরে চীনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নয়াদিল্লির কৌশলগত চিন্তাবিদদের একটি অংশ এটিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নতুন অভিমুখ হিসেবে দেখছেন এবং উদ্বিগ্নও হচ্ছেন। ভারত স্বাভাবিকভাবেই চায় না যে তার পূর্ব সীমান্তে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাক।

তবে ভারত সম্পূর্ণ হাত গুটিয়ে বসে নেই। দিল্লি সম্প্রতি ঢাকায় তাদের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে সাবেক মন্ত্রী দিনেশ ত্রিবেদীকে নিযুক্ত করেছে—১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এই প্রথম ভারত একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে এই পদে নিয়োগ দিলো। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি দেশ যখন কোনও সম্পর্ককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়, তখনই সে রাজনৈতিক প্রতিনিধি পাঠায়। অর্থাৎ ভারত বার্তা দিচ্ছে—বাংলাদেশ তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া দুইভাবে আসতে পারে। একটি হলো কূটনৈতিক চাপ— সীমান্ত সমস্যা, বাণিজ্য বাধা, পানি ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনায় কঠোরতা দেখানো। অন্যটি হলো বিকল্পভাবে বাংলাদেশকে কাছে টানার চেষ্টা— আর্থিক সহায়তা, কানেক্টিভিটি প্রকল্প বা শেখ হাসিনার প্রশ্নে নমনীয়তা দেখানো। দ্বিতীয় পথটি বাংলাদেশের জন্য বেশি অনুকূল হবে, কিন্তু প্রথম পথের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ: ভারসাম্যের কূটনীতি

বাংলাদেশ যদি সত্যিকারের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চায়, তাহলে এই মুহূর্তটি একটি বড় সুযোগ। ভারত-চীনের পারস্পরিক প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে ঢাকা উভয়পক্ষ থেকে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামো সহায়তা আদায় করতে পারে। তবে এই ভারসাম্যের কৌশল একটি দ্বিমুখী তলোয়ারের মত। অতিরিক্ত চীনমুখিতা ভারতকে বিরক্ত করবে, আর ভারতনির্ভরতা বেইজিংকে দূরে ঠেলে দেবে।

বাংলাদেশের সত্যিকারের শক্তি হলো তার ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এবং দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশ কোনও পক্ষকে উপেক্ষা করার বিলাসিতা করতে পারে না। কিন্তু প্রতিটি পক্ষকে এটিও বোঝাতে পারে যে তাদের সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন, এবং সেই প্রয়োজনকে বাংলাদেশ নিজের শর্তে পূরণ করতে চায়।

তারেক রহমানের এই সফর সেই বার্তাটিই দেওয়ার চেষ্টা করছে। প্রশ্ন হলো, সরকার এই কৌশলকে দীর্ঘমেয়াদে কতটা দক্ষতার সাথে বজায় রাখতে পারবে। ভারসাম্যের কূটনীতি কেবল তখনই কার্যকর হয়, যখন তার পেছনে থাকে মজবুত অর্থনীতি, স্বচ্ছ নীতি এবং অভ্যন্তরীণস্থিতিশীলতা। বাংলাদেশকে তাই কেবল দুই পরাশক্তির মধ্যে দরকষাকষি নয়, নিজের ঘরের ভিত্তিও মজবুত করতে হবে। বাংলাদেশ কোনও শিবিরের অনুগত সদস্য নয়—এটাই আজকের পররাষ্ট্রনীতির মূল সুর। কিন্তু স্বাধীনতার দাবিদার হতে হলে কেবল শব্দই যথেষ্ট নয়, চাই কৌশলী মেধা এবং রাজনৈতিক সাহস। ভিয়েতনাম বা মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো আমাদের সামনে একটি পথ দেখিয়েছে। তারা পরাশক্তির দ্বন্দ্বে নিজেদের বিকিয়ে দেয়নি, বরং সেই প্রতিযোগিতাকে নিজেদের উন্নয়নের হাতিয়ার করেছে। বাংলাদেশও সেই পথে হাঁটতে পারে— যদি পররাষ্ট্রনীতি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে একটি জাতীয় কৌশলে পরিণত হয়।

কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা আছে। কূটনৈতিক স্বাধীনতা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘোষণা নয়, এটি অর্জন করতে হয় অভ্যন্তরীণ শক্তির মাধ্যমে। দুর্বল অর্থনীতি, অস্থির রাজনীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দরকষাকষি করা কঠিন। ভারত বা চীন—কেউই দুর্বল অংশীদারকে সমান মর্যাদায় দেখে না। তাই পররাষ্ট্রনীতির সংস্কারের পাশাপাশি দেশের ভেতরে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে মজবুত করা অপরিহার্য। তারেক রহমানের এই প্রথম সফর একটি সূচনা মাত্র। ইতিহাস বিচার করবে—এই সূচনা একটি দীর্ঘমেয়াদি, সুচিন্তিত কৌশলের প্রথম পদক্ষেপ ছিল, নাকি কেবল একটি রাজনৈতিক বার্তা ছিল। সময়ের সাথে সাথে এই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক-প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর