ঈশ্বরকোল: মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসিকায় নীরব ট্রমার গভীর প্রতিফলন
ঈশ্বরকোল: নীরব ট্রমার গভীর প্রতিফলন

সাদিয়া সুলতানার ‘ঈশ্বরকোল’ (২০২১) সমকালীন বাংলা সাহিত্যের একটি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসিকা, যেখানে গল্পের দৃশ্যমান প্রবাহের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মানুষের ভেতরের অদৃশ্য জগৎ। এটি যেন গল্পের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আরেক গল্প—নীরব, অপ্রকাশিত অথচ গভীরভাবে স্পর্শকাতর।

গল্পের জটিল গাঁথুনি ও পাঠকের অভিজ্ঞতা

সচরাচর মনস্তাত্ত্বিক কাহিনিগুলো পড়তে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলি, বুঝতে কিছুটা সময় লাগে—এ বইও তার ব্যতিক্রম নয়। পড়া শুরুর দিকে ভীষণ খাপছাড়া তথা এলোমেলো লাগলেও পরে গল্পের গাঁথুনি কিছুটা এগিয়ে নিয়ে যায় এবং সবশেষে খুলে যায় সমস্ত জট। লেখক তাঁর স্বতন্ত্র শৈলীতে ‘গল্পহীন গল্প’-এর নেপথ্যে জীবনের জটিল অনুভূতিগুলোকে তুলে ধরেছেন। সাধারণ জীবনের ভেতর অসাধারণ মানসিক টানাপোড়েন, সামাজিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম জটিলতা এবং ব্যক্তিগত ট্রমার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব—সবকিছুই এখানে নিঃশব্দ অথচ শক্তিশালীভাবে উপস্থিত।

কেন্দ্রীয় চরিত্র দীপা ও তার ট্রমা

উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র দীপা—ভাঙা শৈশবের ভার বহন করে চলা একজন নারী। ছোটবেলায় পরিবারের খুব নিকটতম একজন সদস্যের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া দীপার জীবনে রেখে যায় গভীর মানসিক ক্ষত, যা তার পরবর্তী জীবনকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। এই ট্রমা এতটাই গভীর যে মাতৃত্বের মতো স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রেও সে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। গল্পটি শুরু হয় দাদির মৃত্যুসংবাদ দিয়ে। দাদির হাতে বোনা নকশিকাঁথা, কার্তিকের হিমেল বাতাস—এসব স্মৃতি শব্দের বুননে একধরনের নস্টালজিক আবহ তৈরি করে, যা ধীরে ধীরে দীপার অন্তর্জগতের অন্ধকারে প্রবেশের পথ তৈরি করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অসম প্রেম ও তিতাসের ভূমিকা

অসম প্রেমকে পূর্ণতা দিতে দীপা বিয়ে করে অন্য ধর্মের এক তরুণ তিতাসকে। নতুন সংসার যেন তার কাছে মুক্তির একটি সম্ভাবনা, একটি আলাদা পৃথিবী, যেখানে পুরোনো ভয়ংকর স্মৃতিগুলো থেকে দূরে থাকা যায়। তিতাস একজন সংবেদনশীল ও সহানুভূতিশীল মানুষ; সে দীপার মানসিক অবস্থাকে সম্মান করে, এমনকি নিজের বাবা হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকেও পাশে সরিয়ে রেখে স্ত্রীর ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়। তবু দীপার ভেতরের অস্থিরতা থামে না—অতীতের ক্ষত তাকে বারবার গ্রাস করে।

পারিবারিক জটিলতা ও মুক্তির ইঙ্গিত

দীপার মৃত বোন মিনার অদৃশ্য উপস্থিতি আরও জোরালো করে পরিস্থিতি। ভয়ংকর সব স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায় ঘটনাজুড়ে। তিতাসের সংস্কারী মায়ের উপস্থিতি, একা ছেলেকে বড় করার যুদ্ধ এবং তিতাসের শৈশবের ঘটনাও উঠে আসে ঘটনাচক্রে। উপন্যাসের শেষভাগে দীর্ঘদিনের নির্যাতনের প্রতীক দীপার জন্মদাতা মুনির হোসেনের প্রস্থানের মাধ্যমে যেন একধরনের মুক্তির ইঙ্গিত আসে। দীপা এবং তার মা নাহার প্রথমবারের মতো স্বস্তির নিশ্বাস নিতে পারে। সমস্ত মানসিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে শেষে দীপা যখন তিতাসকে বলে—‘আমার একটা বাচ্চা চাই তিতাস, আমার কোলে একটা বাচ্চা চাই’—তখন সেটি শুধু মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং জীবনের প্রতি নতুন করে আস্থা ফিরে পাওয়ার এক গভীর ঘোষণা।

উপসংহার: নীরবতার ভাষা

‘ঈশ্বরকোল’ মূলত তাদের জন্য, যারা সাহিত্যে কেবল গল্প নয়, মানুষের মনের গভীরতম স্তরের প্রতিফলন খুঁজে পান। এটি একটি ধীর, ভাবনাময় এবং মনস্তাত্ত্বিক ভ্রমণ, যেখানে শব্দের চেয়ে নীরবতাই বেশি কথা বলে।

বই: ঈশ্বরকোল (উপন্যাসিকা)
লেখক: সাদিয়া সুলতানা
প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২১
প্রকাশক: জলধি
প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত
মুদ্রিত মূল্য: ২০০ টাকা
পৃষ্ঠা: ৭৮