ঈদে মুক্তি পাওয়া পাঁচ সিনেমার পোস্টার ও দৃশ্য। কোলাজ
ঈদের সিনেমা এবার জমেনি—এই হলো সারকথা। বড় তারকা ছিল, ‘জাতীয় মেশিন গান’ হাতে নায়ক ছিল, মুক্তির আগের দু–একটি সিনেমা গান আর টিজারে আশা জাগিয়েছে কিন্তু মুক্তির পর কোনোটিই সেভাবে সাড়া ফেলতে পারেনি। গত কয়েক বছরের মধ্যে এবারই প্রথম কোনো একক সিনেমা প্রভাব তৈরি করতে পারেনি। ফলে যেকোনো দিন দর্শক ‘চাহিবামাত্র’ই টিকিট পেয়েছেন। কয়েকটি সিনেমার ব্যবসার অবস্থা ছিল নাজুক। গত সপ্তাহেই এই প্রতিবেদক ঢাকার এক মাল্টিপ্লেক্সে মাত্র পাঁচজন দর্শকসহ ঈদে মুক্তি পাওয়া একটি সিনেমা দেখেছেন!
প্রচারের ঘাটতি ও দর্শকের দায়
দেশি সিনেমা এখনো সেভাবে প্রচারে এগোতে পারেনি। এবারের ঈদের সিনেমার ক্ষেত্রেও সেটার ব্যতিক্রম ছিল না। ‘রকস্টার’ আর ‘রইদ’ ছাড়া কোনো সিনেমার প্রচারই গোছানো ছিল না। অনেক সিনেমা তো প্রচার শুরুই করেছে মুক্তির পর! এতে দুই ধরনের সমস্যা হয়েছে, অনেক দর্শক ঈদে পরিবার নিয়ে হলে গেছেন সিনেমাগুলো সম্পর্কে না জেনেই। দর্শকদেরও দায় আছে, তাঁরা কেবল যাওয়ার জন্য না গিয়ে কোন সিনেমা দেখতে চান, সেটা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে গেলেই ভালো করতেন। ‘বনলতা সেন’ ও ‘রইদ’ দুই সিনেমাই ঈদের মৌসুমের জন্য ‘ভারী’। অনেক দর্শক দুই সিনেমার ট্রেলার, টিজার না দেখে বা বিষয়বস্তু সম্পর্কে না জেনেই গিয়েছেন। এই প্রতিবেদকের সামনেই হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেক দর্শক। সিনেমা নিয়ে খোঁজ নিয়ে কেন আসেননি—এমন পাল্টা প্রশ্নে অবশ্য কিছু বলতে পারেননি তাঁরা।
নতুন শাকিব কিন্তু
আজমান রুশোর প্রথম সিনেমা ‘রকস্টার’ নিয়ে প্রত্যাশার কমতি ছিল না। অনেক দিন পর ‘জাতীয় মেশিনগান’ ছেড়ে গিটার হাতে শাকিব; মুক্তির আগে টিজার আর গানগুলোও ছিল আশাজাগানিয়া। কিন্তু মুক্তির পর সেভাবে প্রভাব তৈরি করতে পারেনি ঢালিউডের সবচেয়ে বড় তারকার ছবি। শাকিব অভিনয় খারাপ করেননি, রকস্টার হিসেবে তাঁর পারফরম্যান্সও মন্দ ছিল না। কিন্তু দুর্বল চিত্রনাট্য আর পরিচালনার কারণে সিনেমায় সেই আবেগ তৈরি হয়নি। পবিত্র ঈদুল ফিতরে মুক্তি পাওয়া আবু হায়াত মাহমুদের ‘প্রিন্স: ওয়ানস আপন আ টাইম ইন ঢাকা’র ক্ষেত্রেও সেটা হয়েছে। আগের দুই বছরে ব্যবসায়িক সাফল্য পাওয়ার পর এবারের দুই ঈদেই শাকিব খানের সিনেমা সেভাবে সাড়া ফেলতে পারল না। দর্শক এখন আর কেবল বড় তারকার নাম দেখে সিনেমা দেখেন না—এটা কি তারই ইঙ্গিত?
‘রকস্টার’–এ শাকিব খানের সঙ্গে দেখা গেছে তানজিয়া মিথিলা ও সাবিলা নূরকে। কোলাজ
শৈল্পিক ঘরানার দুই সিনেমা
মেজবাউর রহমান সুমন আর মাসুদ হাসান উজ্জ্বল দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় পড়েছেন। এবারের ঈদে এসেছে তাঁদের দুই সিনেমা ‘রইদ’ ও ‘বনলতা সেন’। দুটি সিনেমাই নিয়েই সামাজিক মাধ্যমে কমবেশি আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে রইদ নিয়ে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণ করেছেন অনেক দর্শক। আপাতদৃষ্টিতে সহজ একটি গল্পের ভেতর সুপ্ত থাকা বহু রূপক, ধর্মীয় ও লোকজ পুরাকথা আর দুর্দান্ত ভিজ্যুয়াল মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’কে আর দশটা দেশি সিনেমার চেয়ে আলাদা করে রেখেছে। অন্যদিকে জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতাকে কেন্দ্র করে প্রায় আড়াই ঘণ্টার চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন মাসুদ হাসান উজ্জ্বল। এমন বহুল চর্চিত কবিতাকে কেন্দ্র করে সিনেমা নির্মাণ করা যেমন সাহসের কাজ, তেমনি ঝুঁকিরও। সিনেমাটিও মন্দ হয়নি।
‘রইদ’–এ মোস্তাফিজুর নূর ইমরান ও নাজিফা তুষিছবি: নির্মাতার সৌজন্যে
পয়সা উসুল সিনেমার খোঁজে
ঈদের মৌসুমে অনেক সাধারণ দর্শক খোঁজেন অ্যাকশন, কমেডি, নাচ–গাননির্ভর বিনোদনমূলক সিনেমা। এবারের ঈদে তেমন দুই সিনেমা হতে পারত ‘মালিক’ আর ‘মাসুদ রানা’। কিন্তু দুর্বল চিত্রনাট্য আর পরিচালনার কারণে কোনোটিই সেভাবে দর্শক টানতে পারেনি। ‘মালিক’ সিনেমার নির্মাণে তাড়াহুড়া ছিল স্পষ্ট, ঈদের সপ্তাহ দুয়েক আগেও নির্মাতা বলতে পারেননি ছবিটি আসবে কি না। দুই সিনেমাতেই দারুণ কিছু অ্যাকশন কোরিওগ্রাফি, আইটেম গান, ভীতিজাগানিয়া খলনায়ক ছিল কিন্তু গাঁথুনির দুর্বলতার কারণে পয়সা উসুল সিনেমা হয়ে উঠতে পারেনি। ‘মালিক’–এর নির্মাণে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার ছাপ স্পষ্ট। শুরুর দিকে আরিফিন শুভর নায়কোচিত উপস্থিতি, স্লো মোশন অ্যাকশন দৃশ্যগুলো ভালোই জমেছিল। কিন্তু সিনেমা যত এগোতে থাকে, ততই যেন খেই হারিয়ে ফেলেন নির্মাতা। ‘মাসুদ রানা’তেও ভিএফএক্স আর এআইয়ের ব্যবহার ছিল দুর্বল, নির্মাণেও দুর্বলতা ছিল স্পষ্ট।
‘বনলতা সেন’ সিনেমার পোস্টার। নির্মাতার ফেসবুক থেকে
নতুন উচ্চতায় তুষি–ইমরান
এবারের ঈদের সিনেমায় অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে ম্যান অব দ্য ম্যাচ নাজিফা তুষি আর মোস্তাফিজুর নূর ইমরান। ‘রইদ’ সিনেমা পাগলি (সাদুর বউ) আর সাদু চরিত্রে মনে রাখার মতো অভিনয় করেছেন দুজনই। তুষির তো বলা যায় সেরা সময় কাটছে। আগের ঈদে ‘প্রেশার কুকার’–এ তাঁর অভিনয় দেখে মনে হচ্ছিল ‘ক্যারিয়ার সেরা’ কিন্তু ‘রইদ’ দেখার পর সেই সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়েছে। তবে ‘রইদ’ তাঁকে আলাদা একটি স্থান করে দিয়েছে। পাগলির রহস্যময়তাকে আশ্চর্য বিশ্বাসযোগ্যতায় রূপ দিয়েছেন তিনি। দুর্দান্ত অভিনয় করলেও নূর ইমরান একটা আড়ালেই থেকে যান কিন্তু চরিত্রে মিশে গিয়ে অভিনয় করার দক্ষতা এ সিনেমায় আবারও প্রমাণ করেছেন তিনি। আশা করা যায়, এবার দেশি নির্মাতারা তাঁকে নিয়ে নতুন করে ভাববেন।
আরও পড়ুন
অ্যাডাম-ইভের আদিম প্রেমের গল্প, কেমন হলো ‘রইদ’
০৩ জুন ২০২৬
বনলতা সেনের জটিল চরিত্রকে ধারণ করতে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন মাসুমা রহমান নাবিলা। জীবনানন্দ দাশের চরিত্রে খায়রুল বাসারও ভালো করেছেন। তবে এই সিনেমার সবচেয়ে বড় চমক সোহেল মন্ডল। গত ঈদে পুরোপুরি বাণিজ্যিক ধারার সিনেমা ‘রাক্ষস’-এ খলচরিত্রে চমকে দিয়েছিলেন, ‘বনলতা’য় মহীন চরিত্রেও ভালো করেছেন। ঈদের অন্যান্য সিনেমায় পার্শ্বচরিত্রে আজিজুল হাকিম, রূপন্তী আকিদ, গাজী রাকায়েত ভালো ছিলেন। ‘রকস্টার’–এ তানজিয়া জামান মিথিলা উপস্থিতি অল্প ছিল কিন্তু তাতেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন গ্ল্যামারাস চরিত্রে তিনি ভালো করবেন।
‘মালিক’ সিনেমার গানের দৃশ্যে মিম ও শুভছবি: ফেসবুক থেকে
নায়কদের মধ্যে ‘মালিক’ সিনেমায় অ্যাকশন তারকা হিসেবে আরিফিন শুভ মন্দ নন। মাসুদ রানা চরিত্রে নবাগত রাসেল রানা মোটামুটি। অ্যাকশন দৃশ্যে ভালো হলেও আবেগের দৃশ্যগুলোতে তাঁর ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। নায়িকাদের মধ্যে ‘রকস্টার’–এ সাবিলা নূর বেশ ভালো করেছেন। ‘মাসুদ রানা’য় পূজা চেরীও মন্দ নন, তবে ‘মালিক’–এ বিদ্যা সিনহা মিমের কাছে প্রত্যাশা ছিল আরও বেশি। গানগুলোতে তাঁর উপস্থিতি বেশ ভালো কিন্তু সিনেমায় তাঁর চরিত্রটি ঠিকভাবে লেখাই হয়নি। চার বছর পর বড় পর্দায় তাঁর প্রত্যাবর্তন সেভাবে মনে রাখার মতো হলো কই।
অভিনয়শিল্পীদের বাইরে আলাদা করে বলতে হবে দুই চিত্রগ্রাহক আবদুল মামুন (‘রকস্টার’) ও জোয়াহের মুসাভভির জ্যোতির (‘রইদ’) কথা। দুজনই চমকে দেওয়া ভিজ্যুয়াল উপহার দিয়েছেন।
আরও পড়ুন
মেশিনগান ছেড়ে গিটার হাতে শাকিব, কেমন হলো ‘রকস্টার’
০৫ জুন ২০২৬
একক হিট গান নেই
ঈদের আলোচিত পাঁচ সিনেমার সব কটিই কমবেশি ভালো গান আছে কিন্তু কোনোটিই এককভাবে ক্লিক করেনি। ‘রকস্টার’ সংগীতনির্ভর সিনেমা; গান আছে ১০টি। ‘পিরিতি’, ‘আমাকে উড়িয়ে দাও’, ‘আমি যাব হারিয়ে’ আর ‘বেশ কিছুদিন’ গানগুলো কমবেশি আলোচিত হয়েছে। ‘রইদ’ সিনেমার গানও ভালো কিন্তু কোনোটিই নির্মাতার আগের সিনেমা ‘হাওয়া’র মতো মুখে মুখে ফেরেনি। ‘বনলতা সেন’–এ বাপ্পা মজুমদারের কণ্ঠে ‘এখানে কেউ নেই’ শুনতে ভালো লেগেছে। আইটেম গান ‘গুলগুলি পিঠা’সহ ‘মালিক’–এর গানগুলোও মন্দ নয় কিন্তু সিনেমাটি সেভাবে আলোচিত না হওয়ায় গানগুলোও ততটা প্রচার পায়নি।
‘মাসুদ রানা’ সিনেমার পোস্টার থেকে। প্রযোজনা সংস্থার ফেসবুক থেকে
সেই পুরোনো কথা
দেশি সিনেমা এখনো সেভাবে প্রচারে এগোতে পারেনি। এবারের ঈদের সিনেমার ক্ষেত্রেও সেটার ব্যতিক্রম ছিল না। ‘রকস্টার’ আর ‘রইদ’ ছাড়া কোনো সিনেমার প্রচারই গোছানো ছিল না। অনেক সিনেমা তো প্রচার শুরুই করেছে মুক্তির পর! এতে দুই ধরনের সমস্যা হয়েছে, অনেক দর্শক ঈদে পরিবার নিয়ে হলে গেছেন সিনেমাগুলো সম্পর্কে না জেনেই। দর্শকদেরও দায় আছে, তাঁরা কেবল যাওয়ার জন্য না গিয়ে কোন সিনেমা দেখতে চান, সেটা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে গেলেই ভালো করতেন। ‘বনলতা সেন’ ও ‘রইদ’ দুই সিনেমাই ঈদের মৌসুমের জন্য ‘ভারী’। অনেক দর্শক দুই সিনেমার ট্রেলার, টিজার না দেখে বা বিষয়বস্তু সম্পর্কে না জেনেই গিয়েছেন। এই প্রতিবেদকের সামনেই হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেক দর্শক। সিনেমা নিয়ে খোঁজ নিয়ে কেন আসেননি—এমন পাল্টা প্রশ্নে অবশ্য কিছু বলতে পারেননি তাঁরা।
প্রথম আলোর খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
ঢালিউড থেকে আরও পড়ুন
চলচ্চিত্র আলোচনা
বিদ্যা সিনহা মীম
সাবিলা নূর
চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ
পূজা চেরী রায়
শাকিল খান
আরিফিন শুভ
ঈদের ছবি



