শিল্পী মতলুব আলীর ৮০তম জন্মদিনে স্মৃতিচারণ ও প্রদর্শনী
শিল্পী মতলুব আলীর ৮০তম জন্মদিনে স্মৃতিচারণ

শিল্পী অধ্যাপক মতলুব আলীর ৮০তম জন্মদিন উদ্‌যাপিত হলো তাঁর সৃষ্টি সম্ভারের মধ্য দিয়ে। শিল্পকর্মের প্রদর্শনী, লেখা ও সুর করা গান, নৃত্য আর তাঁকে নিয়ে আলোচনায় আজ রোববার বৃষ্টিভেজা বৈশাখী সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানানো হলো তাঁর স্মৃতির প্রতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ও শিল্পী মতলুব আলী প্রতিষ্ঠিত ‘মানব শিল্প সাহিত্য সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী’ যৌথভাবে জন্মদিন উদ্‌যাপনের এই অনুষ্ঠান আয়োজন করে।

জীবন ও কর্ম

মতলুব আলী ছিলেন চারুকলা অনুষদের সাবেক ডিন। ১৯৪৬ সালের ১৭ এপ্রিল রংপুরে তাঁর জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে দীর্ঘ শিক্ষকতার জীবনে তিনি অঙ্কন ও চিত্রণ বিভাগের অধ্যাপক, শিল্পকলার ইতিহাস এবং ভাস্কর্য বিভাগে ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত বছর ৪ নভেম্বর তিনি পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে যান।

আলোচনা পর্ব

জন্মদিনের অনুষ্ঠানটি ছিল চারুকলা অনুষদের ওসমান জামিল মিলনায়তনে। প্রবল বৃষ্টি সত্ত্বেও মিলনায়তন পূর্ণ ছিল মতলুব আলীর অনুরাগী, সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে। অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল মানব শিল্প সাহিত্য সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর শিল্পীদের দলীয় সংগীত ‘এসো বন্ধু এসো তোমার সকল বৈভবে’র সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনা দিয়ে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আলোচনা পর্বে ইমেরিটাস অধ্যাপক শিল্পী হাশেম খান স্মৃতিচারণা করে বলেন, মতলুব আলী ছিলেন তাঁর ছাত্র ও পরে সহকর্মী। ছাত্রকালেই তিনি ষাটের দশকের প্রগতিশীল রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে প্রথমবার যে নবান্ন উৎসব আয়োজন করা হয়েছিল চারুকলার শিক্ষক ও ছাত্রদের উদ্যোগে, মতলুব আলী তাঁর উদ্যোক্তাদের অন্যতম ছিলেন। তিনি দেশের সাংস্কৃতিক অধিকার ও স্বাধীনভাবে শিল্পসাহিত্য চর্চার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সব সময় সোচ্চার ছিলেন। রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অধ্যাপক বুলবন ওসমান স্মৃতিচারণা করে বলেন, মতলুব আলী ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। শিল্পকলার পাশাপাশি তিনি সংগীত রচনা ও সুর করেছেন। বিশেষ করে গণসংগীতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এ ছাড়া শিল্পকলার সমালোচক হিসেবে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিল্পকলা নিয়ে তিনি গভীর বিশ্লেণমূলক মৌলিক গ্রন্থ রচনা করছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ ও নাটক রচনা করেছেন। সাংস্কৃতিক সংগঠন পরিচালনা করেছেন। অনেক রকমের সৃজনশীল কাজের ভেতরে তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।

শিল্পী শহীদ কবির বলেন, মতলুব আলী ছিলেন তাঁর সহপাঠী। ছাত্র হিসেবে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। শ্রেণির পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করতেন। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সাংগঠনিক দক্ষতাও ছিল। সহপাঠীদের নিয়ে ‘কারিকা’ নামে একটি আর্ট গ্রুপ করেছিলেন। এই কারিকার উদ্যোগেই ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর তৎকালীন শাহবাগ হোটেলে তিনি চারুকলা প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন।

সংগীতশিল্পী রফিকুল আলম বলেন, তিনি অনেক সৃজনশীল ধারায় কাজ করেছেন। ফলে চিত্রকলার চর্চায় হয়তো সময় ও মনোনিবেশ কম দিয়েছেন। তবে অবসর গ্রহণের পরে তিনি চারুকলা চর্চায় আরও মনোনিবেশ করেছিলেন। একটা বড় প্রদর্শনী করার পরিকল্পনা ছিল।

আলোচনায় আরও অংশ নেন চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক এ এ এম কাওসার হাসান ও অধ্যাপক দুলাল চন্দ্র গাইন ও তাঁর মেয়ে আলী পুষ্পিতা মউরী।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

পরে ছিল অধ্যাপক মতলুব আলীর লেখা ও সুর করা গান নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই পর্ব শুরু হয় তাঁর স্ত্রী বিশিষ্ট ইলেকট্রিক হাওয়াইয়ান গিটার শিল্পী রেহেনা মতলুবের বাদন পরিবেশনা দিয়ে। তিনি রবীন্দ্রসংগীত ‘তুমি রবে নীরবে’র সুর পরিবেশন করেন। এরপর ছায়ানটের শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন ‘মুক্তির মন্ত্র দীক্ষিত আমরা’। আলী পুষ্পিতা মউরী গেয়ে শোনান আধুনিক গান ‘এক পশলা বৃষ্টি হলে কৃষ্ণচূড়া মন’। পরে আরও বেশ কয়েকটি সংগীত পরিবেশন করেন মানব শিল্প সাহিত্য সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর শিল্পীরা।

প্রদর্শনী

‘বর্ণিল অন্বেষা’ নামে শিল্পী অধ্যাপক মতলুব আলীর একাদশ একক চিত্রকলা প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়েছে চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারি ১ ও ২ জুড়ে। এতে বিভিন্ন মাধ্যমে আঁকা শিল্পীর ১০২টি শিল্পকর্ম রয়েছে। আলী পুষ্পিতা মউরী জানান, তাঁর বাবার শেষ একক প্রদর্শনী হয়েছিল নিউইয়র্কে ২০১৬ সালে। তিনি ৮০তম জন্মদিনে একটি বড় প্রদর্শনী করার আশা করেছিলেন। সেই প্রদর্শনী করতে পারলেন না। চারুকলা অনুষদের সহায়তায় তাঁর বিভিন্ন সময়ের শিল্পকর্ম থেকে বাছাই করে ১০২টি চিত্রকর্ম নিয়ে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এটি অনেকটা তাঁর আনুপূর্বিক কাজের প্রদর্শনী। দর্শকেরা এখানে শিল্পীর প্রথম দিকের কাজ থেকে সাম্প্রতিককালে করা অনেক শিল্পকর্ম দেখতে পাবেন। প্রদর্শনী আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।