খুলনার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু হয়েছিল চলচ্চিত্র ‘দেলুপি’র যাত্রা। পরিকল্পনা ছিল, যাদের জীবন ও অভিজ্ঞতা থেকে গল্পটি নির্মিত, তাদের সামনেই হবে প্রথম প্রদর্শনী। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নও হয়েছে। এরই মধ্যে ছবিটি আমন্ত্রণ পায় ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল রটারড্যামে।
সিনেমা আড্ডায় নির্মাতারা
চলচ্চিত্রটি নির্মাণের পর দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়া, আন্তর্জাতিক উৎসবে আমন্ত্রণ পাওয়া এবং সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন নির্মাতা মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম ও নির্বাহী প্রযোজক অমিত রুদ্র। গত শনিবার বিকেলে রাজশাহী নগরের চৌদ্দপায় এলাকায় ম্যাজিক লণ্ঠন স্কুল প্রাঙ্গণে আয়োজিত ‘দেশের প্রেক্ষাগৃহ থেকে রটারড্যামে দেলুপি’ শীর্ষক সিনেমা আড্ডায় তাঁরা এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে রাজশাহীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও সিনেমাপ্রেমীরা অংশ নেন। প্রশ্নোত্তর পর্বসহ বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে আড্ডা। শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন স্কুলের কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি কাজী মামুন হায়দার।
আন্তর্জাতিক উৎসবে যাত্রা
নির্মাতারা জানান, শুরুতে ছবিটি কোনো আন্তর্জাতিক উৎসবে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল না। কাজও তখন পুরোপুরি শেষ হয়নি। এমন সময় এক বিদেশি কিউরেটরের আগ্রহে ছবিটি দেখানো হয়। পরে রটারড্যাম উৎসব কর্তৃপক্ষ ছবিটি নির্বাচনের আগ্রহ জানায়।
তবে বিশ্ব প্রিমিয়ার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধায় পড়েন নির্মাতারা। কারণ, তাঁদের আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিল, এর প্রথম প্রদর্শনী হবে শুটিং লোকেশনের গ্রামেই। পরে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হয়। ছবিটি আন্তর্জাতিক প্রিমিয়ার হিসেবে রটারড্যামে অংশ নেয়, আর স্থানীয়ভাবে প্রথম প্রদর্শনী হয় সেই গ্রামেই।
নির্মাতা তাওকীর ইসলাম বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম, যাদের গল্প নিয়ে ছবি, তারা যেন সবার আগে এটি দেখেন।” তিনি আরও বলেন, “পথটা সহজ ছিল না। তবে নিজের গল্প নিজের জায়গা থেকে বলার সাহস থাকলে সেটি বিশ্ব–দর্শকের কাছেও পৌঁছাতে পারে।”
মুক্তির জটিলতা
আড্ডায় সিনেমা মুক্তির জটিলতা নিয়েও কথা বলেন নির্বাহী প্রযোজক অমিত রুদ্র। তাঁর ভাষ্য, “সিনেমা বানানোর চেয়ে মুক্তি দেওয়া কঠিন।” তিনি জটিলতা নিয়ে বলেন, “আইনি কাঠামো থাকলেও নানা ধাপ, তথ্যের ঘাটতি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে নতুন নির্মাতাদের জন্য প্রক্রিয়াটি কঠিন হয়ে ওঠে। একটি সিনেমা মুক্তির আগে কপিরাইট নেওয়া, প্রযোজক ও পরিচালক সমিতির সদস্যপদ অর্জন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি) থেকে ছাড়পত্র নেওয়াসহ একাধিক ধাপ পেরোতে হয়। এরপর সেন্সর বোর্ডে জমা দিতে হয়। প্রতিটি ধাপেই সময় ও ব্যয়ের চাপ থাকে।”
অমিত রুদ্র বলেন, “পুরো প্রক্রিয়ায় দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগে। অনেক ক্ষেত্রে আগাম ধারণা না থাকায় নির্মাতারা সমস্যায় পড়েন। বিভিন্ন সমিতির সদস্য হতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা অনেক সময় প্রচারণার বাজেটকে প্রভাবিত করে।” সেন্সর সনদ পাওয়ার পরও ট্রেলার ও পোস্টারের জন্য আলাদা অনুমোদন নিতে হয়। এরপর পরিবেশক ও হলমালিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে মুক্তির তারিখ নির্ধারণ করতে হয়। এ পর্যায়ে তারিখসংকট ও অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের মতো সমস্যার কথাও তুলে ধরেন অমিত রুদ্র।
ইতিবাচক অভিজ্ঞতা
তবে নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা জানান নির্মাতা ও প্রযোজক দুজনই। তাঁরা জানালেন, শিল্পে সহযোগিতাপ্রবণ মানুষ রয়েছেন। তাঁদের সাহায্য আর দর্শকের সাড়া পেলে পরিস্থিতিও দ্রুত বদলে যায়। তারা এটা পেয়েছেন।
এর আগে ২০২৪ সালে খুলনার একটি ইউনিয়নের মানুষের জীবন, ৫ আগস্ট পরবর্তী অস্থিরতার ঘটনার প্রেক্ষাপট নিয়ে ‘দেলুপি’ নির্মাণ করা হয়। গত বছর নভেম্বরে সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়া হয়। এরই মধ্যে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সিনেমাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রদর্শিত হচ্ছে। চলতি বছর জানুয়ারিতে রটারড্যাম উৎসবের ‘ব্রাইট ফিউচার’ বিভাগে প্রদর্শিত হয় ‘দেলুপি’। আমন্ত্রণ পেয়ে সেখানে নির্মাতা ও প্রযোজক গিয়েছিলেন।



