থালাপতি বিজয়ের রাজনৈতিক লড়াই: চলচ্চিত্র থেকে তামিলনাড়ুর ক্ষমতার মঞ্চে
থালাপতি বিজয়ের রাজনৈতিক লড়াই: চলচ্চিত্র থেকে ক্ষমতার মঞ্চে

দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর রাজধানী চেন্নাই থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দক্ষিণে তিরুনেলভেলি। সেখানে এক তপ্ত ও গুমোট বিকেলে সুসজ্জিত এক প্রচার ভ্যানের ওপর দাঁড়িয়ে সি জোসেফ বিজয় তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশে বলছেন, প্রতিপক্ষরা তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী হওয়া থেকে আটকাতে একজোট হয়েছে।

অভিনেতা থেকে রাজনীতিক

অভিনেতা থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া ৫১ বছর বয়সী এই নেতা বিশাল জনসমুদ্রের সামনে বললেন, ‘বাইরে থেকে আমার প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভিন্ন ভিন্ন পক্ষ মনে হতে পারে। কিন্তু তাদের লক্ষ্য একটাই, বিজয় যেন মুখ্যমন্ত্রী হতে না পারে।’ এ সময় সমবেত জনতা একসুরে তাঁর নাম ধরে স্লোগান দিতে শুরু করেন। তামিল ভাষায় ‘বিজয়’ শব্দের অর্থ ‘জয়’।

তামিলনাড়ু ভারতের অন্যতম উন্নত একটি রাজ্য। এখানে চলচ্চিত্র তারকাদের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। অনেক তারকা মারা যাওয়ার বহু বছর পরও সাধারণ মানুষের কাছে দেবতাতুল্য হয়ে আছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ত্রিমুখী লড়াই

গতকাল বৃহস্পতিবার তামিলনাড়ুর ২৩৪ সদস্যের বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিজয়ের এই রাজনৈতিক লড়াই রাজ্যে চলচ্চিত্র তারকাদের রাজনীতিতে আসার সেই ধারাকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে ঐতিহ্যগতভাবে দ্বিমুখী লড়াই এখন ত্রিমুখী লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

‘আশীর্বাদ ও অভিশাপ’

২০২৪ সালে ‘তামিলগা ভেট্টি কাজাগাম’ (টিভিকে) দল গঠনের মাধ্যমে ধুমধাম করে রাজনীতিতে আসেন বিজয়। তিনি ক্ষমতাসীন ডিএমকে এবং প্রধান বিরোধী দল এআইএডিএমকের কয়েক দশকের আধিপত্য শেষ করার অঙ্গীকার করেছেন।

বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন ডিএমকে ও এর ১৪–দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অন্যদিকে বিরোধী নেতা ইদাপ্পাদি কে পালানিস্বামী ১০–দলীয় জোট ‘এনডিএ’-র প্রধান হিসেবে এআইএডিএমকের নেতৃত্বে আছেন, যাঁর সঙ্গী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১৯৬৭ সাল থেকে তামিলনাড়ুর ক্ষমতায় রয়েছে দ্রাবিড়ীয় দলগুলো। এখানে কংগ্রেস বা বিজেপির মতো জাতীয় দলগুলো সব সময় গৌণ ভূমিকায় থেকেছে। এবার বিজেপি এআইএডিএমকের সঙ্গে জোট বেঁধে ২৭টি আসনে এবং কংগ্রেস ডিএমকের সঙ্গে জোট করে ২৮টি আসনে লড়ছে।

বিজয়ের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার

বিজয় তাঁর ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন বাবার পরিচালিত চলচ্চিত্রে শিশু অভিনেতা হিসেবে। ২০০৪ সালের ছবি ‘গিল্লি’ তাঁকে সুপারস্টার খ্যাতি এনে দেয়। ২০১৩ সালের হিট ছবি ‘থালাইভা’(নেতা)-তে তিনি তাঁর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ছবিটির ট্যাগলাইন ছিল—‘নেতৃত্ব দেওয়ার সময় এসেছে’।

ব্যক্তিগত ক্যারিশমার জোরে বিজয় তাঁর জনসভায় লাখ লাখ সমর্থক টানছেন। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিজয়ের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন সিনেমার চিত্রনাট্যের মতো সহজ হবে না। কারণ, তাঁকে লড়তে হচ্ছে কয়েক দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ঝানু রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আর কান্নান বিজয়কে দুই দ্রাবিড় জোটের জন্য ‘আশীর্বাদ ও অভিশাপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তামিলনাড়ুর তারকাপ্রেমের ইতিহাস

বিজয় মূলত তাঁর দুই পূর্বসূরি এম জি রামচন্দ্রন (এমজিআর) এবং জয়ললিতার পথ অনুসরণ করতে চাইছেন। এই দুজন তামিল সিনেমার পর্দার সবচেয়ে প্রিয় জুটি ছিলেন।

এমজিআর ১৯৭২ সালে এআইএডিএমকে গঠন করেন এবং ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর উত্তরসূরি জয়ললিতা ছয়বার মুখ্যমন্ত্রী হন। ২০১৬ সালে স্বপদে থাকাকালেই তাঁর মৃত্যু হয়।

ডিএমকের ইতিহাসেও চলচ্চিত্রজগতের বড় ভূমিকা রয়েছে। দলের প্রতিষ্ঠাতা সি এন আন্নাদুরাই ছিলেন একজন খ্যাতিমান চিত্রনাট্যকার। তাঁর পর মুথুভেল করুণানিধি ডিএমকের হাল ধরেন। করুণানিধি রেকর্ড ১৩ বার বিধানসভা নির্বাচনে জিতে পাঁচ মেয়াদে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ২০১৮ সালে তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে স্ট্যালিন দলের দায়িত্ব নেন।

বিশ্লেষক কান্নান বলেন, ‘এমজিআর বা জয়ললিতার মতো সফল নেতারা আত্মপরিচয়ের রাজনীতিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বিপরীতে শিবাজি গণেশানের মতো বড় অভিনেতা চেষ্টা করেও রাজনীতিতে তেমন ছাপ ফেলতে পারেননি।’

তরুণ ও নারী ভোটারদের টানার চেষ্টা

বিজয় মূলত রাজ্যের ২ কোটি ৩০ লাখ তরুণ ভোটার এবং নারী ভোটারদের ওপর বড় ভরসা করছেন। ৫ কোটি ৭০ লাখ মোট ভোটারের মধ্যে অর্ধেকের বেশিই নারী।

তরুণ ও নারীদের উপস্থিতিতে ঠাসা জনসভায় বিজয় অভিযোগ করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিনের প্রকৃত মিত্র হলো ‘ঘুষ ও দুর্নীতি’। তিনি এই নির্বাচনকে নিজের সঙ্গে স্ট্যালিনের ব্যক্তিগত লড়াই হিসেবে দেখাচ্ছেন। তবে স্ট্যালিন এসব আক্রমণকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

আদর্শিক পার্থক্য থাকলেও সব দলই এখন জনকল্যাণমূলক নানা প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তামিলনাড়ু নির্বাচনে বিনা মূল্যে বিভিন্ন পণ্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি খুব সাধারণ বিষয়।

ডিএমকে নারীদের মাসিক ভাতা দুই হাজার রুপি করার কথা বলছে। এআইএডিএমকে গরিবদের ফ্রিজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে বিজয়ের টিভিকে বছরে ছয়টি এলপিজি সিলিন্ডার বিনা মূল্যে দেওয়ার পাশাপাশি বেকার স্নাতকদের চার হাজার রুপি ভাতা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।

এরপরেও কান্নান মনে করেন, বিজয় এই নির্বাচনে বড়জোর একজন ‘বিঘ্ন সৃষ্টিকারী’ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারেন। তিনি বলেন, ‘বিজয় ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দিয়ে শেষ দিকে প্রচার জমিয়ে তুলেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো নেই।’