একটি গোষ্ঠীর চাপে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধের ঘটনা উদ্বেগজনক। এ ধরনের ঘটনা নাগরিকের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ বলে আমরা মনে করি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মব–সহিংসতার মাধ্যমে নাটক, চলচ্চিত্র, বাউলগানসহ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর যে বাধা তৈরি করা হয়েছিল, এটি তারই ধারাবাহিকতা। দুঃখজনক হলেও সত্যি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ক্ষেত্রেও সংবিধান প্রদত্ত নাগরিকের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার অধিকার রক্ষায় সরকার ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা দেখা গেল।
ঘটনার বিবরণ
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, শিক্ষার্থীদের সংগঠন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে তানিম নূর পরিচালিত 'বনলতা এক্সপ্রেস' চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। কিন্তু চলচ্চিত্রটির প্রদর্শন না করার বিষয়ে কওমি ঐক্য পরিষদ নামের একটি সংগঠন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার শুরু করে। গত শুক্রবার সংগঠনটির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত একটি সভায় চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনী প্রতিহতের ঘোষণা দেওয়া হয়। এ বাস্তবতায় আয়োজকেরা চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনী স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেন।
তাঁরা চেষ্টা করেও প্রশাসন থেকে কোনো ধরনের সহায়তা বা সাড়া পাননি বলে আয়োজকেরা যে অভিযোগ করেছেন, সেটা অগ্রহণযোগ্য। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, জেলার কসবা উপজেলায় একটি স্কুলের মাঠে ব্যক্তিগত উদ্যোগে চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনীর আয়োজন করতে গেলে পুলিশ ও প্রশাসন গিয়ে সেটি বন্ধ করে দেয়।
আইন ও নীতির পরিপন্থী
'বনলতা এক্সপ্রেস' সরকারের চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের সনদপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র। সরকারের আইন মেনেই চলচ্চিত্রটি দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহ ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করা পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে যেকোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠীরই যেকোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন, সাংস্কৃতিক চর্চার ব্যাপারে ভিন্নমত থাকতে পারে। সেটা শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে জানাতে হবে। কিন্তু তাই বলে অন্য নাগরিকের সাংস্কৃতিক চর্চায় বাধা দেওয়া কিংবা হুমকি সৃষ্টির অধিকার কারও নেই।
সাম্প্রতিক ঘটনার ধারা
শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নয়, মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, সম্প্রতি নেত্রকোনার মদন উপজেলায় একটি বাউলগানের আয়োজনও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এপ্রিল মাসে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে একজন পীরের দরবারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও পীরকে হত্যা করা হয়। মে মাসে ঢাকায় শাহ আলীর মাজারেও হামলা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মাজার, দরগাহ ও বাউলদের ওপর আক্রমণ নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে মঞ্চনাটক, চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মতো সাংস্কৃতিক আয়োজন মব–সহিংসতা সৃষ্টির মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছিল। সরকার ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় সমাজের কোনো কোনো গোষ্ঠী নিজেদের অতি ক্ষমতায়িত মনে করতে শুরু করায় এ ধরনের সহিংসতা বন্ধ করা যায়নি। এটি নাগরিক উদ্বেগ ও ক্ষোভের বড় কারণ হয়ে উঠেছিল।
প্রতিক্রিয়া ও দাবি
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনার ক্ষেত্রে জনপরিসরে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সরকারকে অবশ্যই আইনের শাসনহীনতার এই চক্র থেকে বের হয়ে আসতে হবে। গোষ্ঠী চাপে চলচ্চিত্র কিংবা বাউলগানের আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া হলে আমাদের সমাজের বহু শতাব্দীর যে সহনশীল, গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক বুনট, সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ধরনের ঘটনা বাইরের বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাও তৈরি করে।
সরকারকে নাগরিকের সাংস্কৃতিক চর্চার অধিকার সুরক্ষায় সক্রিয় ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সব মত, পথের নাগরিকেরা যত ভয়হীন ও বাধাহীন পরিবেশে নিজেদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও চর্চা করতে পারেন, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।



