ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ও বিএনপির সাবেক নেত্রী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনী করে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি যদি প্রশ্ন রাখি, যে রাষ্ট্র ছয় বছরের শিশুকে ধর্ষণ আর বলাৎকার থেকে রক্ষা করতে পারে না, যে রাষ্ট্র সত্তর বছরের বৃদ্ধকে ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না, প্রতিদিন মানুষ খুন হয়, যে রাষ্ট্র দুর্নীতি-দুঃশাসন, টাকা পাচার, ব্যাংক লুট– কোনোরকম কোনও অন্যায় বন্ধ করতে পারেনি, সেই রাষ্ট্র কেন সিনেমা বন্ধের মদত দেয়?’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধের প্রতিবাদে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সোমবার বিকাল ৪টায় শাহবাজপুর ইউনিয়নের প্রথম গেইট এলাকায় এ কর্মসূচি পালন করা হয়।
এ সময় রাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে ব্যারিস্টার রুমিন বলেন, ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতির রাজধানী বলা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে। এই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২০২১ সালে সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি সিনেমাহল নেই। কোনও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে দাঁড়াতে দেওয়া হচ্ছে না। এই কালো নকশা কারা করছে? যারা বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চায়। যারা বাংলাদেশকে অন্ধকারে নিয়ে যেতে চায়। যারা বাংলাদেশকে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করতে চায়। তারাই বাংলাদেশের এই সাংস্কৃতিক রাজধানী ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে একটি সিনেমা– যেটি পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেখার মতো, বনলতা এক্সপ্রেস, তার প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়েছে। এই সিনেমাটি কেন বন্ধ করে দেওয়া হলো?’
‘কারণ আমরা গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, একটার পর একটা মাজার ভাঙা হয়েছে, কবর থেকে তুলে নিয়ে লাশ পোড়ানো হয়েছে। আমরা দেখেছি, দক্ষিণ পন্থা, ডানপন্থা উগ্রবাদের উত্থান। কিন্তু আমার দেশের মাটি তো এমন ছিল না। এ দেশের মাটিতে আজানের ধ্বনি যেমন সুমধুর আমরা শুনেছি, আমরা বাউল গানও শুনেছি। এ দেশের মাটিতে সকালবেলা যেমন কোরআন তেলাওয়াত শুনেছি, আবার ছোট ছোট বাচ্চারা হারমোনিয়াম নিয়ে সংগীত চর্চা করেছে সেটাও আমরা দেখেছি। কারা এই বাংলাদেশের মাটিকে মৌলবাদের ভূমি বানাতে চায়? এই প্রশ্ন আমি আপনাদের মাধ্যমে রেখে যাচ্ছি। এটা রাষ্ট্রের কাছে আমার দাবি থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘যে রাষ্ট্র কোনও অপরাধ বন্ধ করতে পারেনি, যে রাষ্ট্র ছোট ছোট শিশুদের বলাৎকার আর ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি– যেখানে সবরকম সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ধর্মের পাশাপাশি চলেছে, সে রাষ্ট্র কী করে আজকে সেটাকে বন্ধ করে বাংলাদেশকে, নতুন প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাওয়ার মদত দিচ্ছে। আমি বলে রাখি, তোমাকে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে। যাদের আপনারা আজকের পরিচয় দিচ্ছেন, আপনাদের মদতে যারা আজকে গান-বাজনা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সবকিছুর উপরে শক্ত করে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সাহস পাচ্ছে, একদিন তাদের হাতে আপনারাও কিন্তু পরাজিত হবেন। আমি আশা রাখবো, শুভ বুদ্ধির উদয় হবে। সামনের প্রজন্মকে আমরা যেন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে না রাখি। এরকম রাষ্ট্র আশা করি না, যে রাষ্ট্র মানুষকে পেছনের দিকে নিয়ে যাবে, যে রাষ্ট্র একটা অসাম্প্রদায়িক সবার বাংলাদেশকে কোনও বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করবে।’
মানববন্ধনে এমপি রুমিন ফারহানা আরও বলেন, ‘আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ যেমন কোনও বিশেষ মহল এবং দলের নয়, বাংলাদেশের আপামর মানুষের জনযুদ্ধ ছিল; একইভাবে ২৪ সালের গণ-আন্দোলনে বাংলাদেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল। কেউ যদি বাংলাদেশের গণ-আন্দোলনকে কুক্ষীগত করতে চায়, তার পরিণতি অতীতে যেমন ভালো হয়নি, ভবিষ্যতেও ভালো হবে না।’
মানববন্ধনে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন– জেলা উদীচীর সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস রহমান, সরাইল উদীচীর সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক সরকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ইফতেখার জাবেদ, ‘সোনালী সকাল’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মুনতাসির এবং সংস্কৃতি অঙ্গনের নেতাকর্মীরা।
মানববন্ধনকে কেন্দ্র করে বিকাল ৩টার পর থেকে শাহবাজপুর প্রথম গেট এলাকায় পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। যেকোনও ধরনের অপতৎপরতা রোধে নিয়োগ করা হয় জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটকে।



