ক্যাকটাস আর চাঁদের গল্প: ফয়সালের একাকীত্বের বাঁক
ক্যাকটাস আর চাঁদের গল্প: ফয়সালের একাকীত্বের বাঁক

চিঠিটা পড়ার পর ছাদে গেলাম। নীরার ক্যাকটাসের টবটা ছাদের এককোনায়। টবটা হাতে নিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম, আকাশের কোথাও আজ চাঁদ নেই।

আজ সোমবার, আকাশটা যেন কিছু বলতে চেয়েও চুপ করে আছে। ঠিক মেঘলা বলা যাবে না, আবার রোদেলাও নয়। একধরনের বিষণ্ন ধূসর রং মেখে ঝুলে আছে শহরের ওপর। হিমু ভাই থাকলে হয়তো বলতেন, আজকের আকাশটা একটা পচা বেগুন রঙের মতো দেখাচ্ছে। কিন্তু আমি হিমু ভাই নই, আমার নাম ফয়সাল। অতি সাধারণ এক মানুষ, যার পকেটে টাকা থাকলে রিকশা আর না থাকলে মানবচক্রযান, অর্থাৎ ঘাম মুছে দুপায়ে ভর করে বাসায় ফেরা।

আমার রুমমেট রঞ্জু সোফায় পা তুলে পেপার পড়ছে। ওর পড়ার ভঙ্গি দেখলে মনে হয়, খবরের কাগজের প্রতিটি অক্ষর গলাধঃকরণ করছে কিংবা মনোযোগ দিয়ে ক্লাসের গুরুত্বপূর্ণ ফিজিকস থিওরি মুখস্থ করছে। রঞ্জু হঠাৎ মাথা তুলে বলল, ‘ফয়সাল, তুই কি কখনো তোর বাঁহাতের কনিষ্ঠ আঙুলের দিকে মন দিয়ে তাকিয়েছিস?’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আমি ল্যাপটপে অফিসের মেইল টাইপ করছিলাম। রঞ্জুর অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে বিরক্তি নিয়ে বললাম, না তো। কেন?—তাকিয়ে দেখ। তোর এই আঙুলটা একটু বাঁকা। এর মানে, তোর ভাগ্য কোনো এক সময় বড় কোনো বাঁক নেবে।

আমার খানিকটা হাসি পেল, কিন্তু হাসতে পারলাম না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।

রঞ্জু ইদানীং খুব বেশি সস্তা জ্যোতিষশাস্ত্র পড়তে শুরু করেছে৷ সেদিন দেখলাম গুলিস্তান থেকে তিরিশ টাকা দিয়ে শাস্ত্রবিদ্যার একটা বই কিনেছে, ‘একনজরে শাস্ত্রনীতি’।

আমি ল্যাপটপ বন্ধ করে বললাম, ‘ভাগ্য বাঁক নেবে কি না জানি না, তবে তুই যদি কালকের মধ্যে মেসের ভাড়ার টাকাটা না দিস, তাহলে আমার মেজাজটা কিঞ্চিৎ বাঁক নেবে।’

রঞ্জু হাসল। বড় মায়াবী হাসি। এই হাসির কারণেই হয়তো ওকে কোনো কিছু নিয়ে কড়া কথা বলা যায় না। একগাল হেসে বলল, ‘টাকা কোনো বড় কথা নয়, ফয়সাল। জীবনটা হলো মুহূর্তের সমষ্টি। এই যে এখন বিকেলটা পার হয়ে সন্ধ্যা হচ্ছে, তুই কি এর গন্ধ পাচ্ছিস?’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আমি কোনো উত্তর দিলাম না। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। চারতলার এ বারান্দা থেকে নিচের গলির মোড়টা পরিষ্কার দেখা যায়। সেখানে একটা চায়ের দোকান। মজিদ মিয়ার দোকান। মজিদ মিয়া বিড়ি ফুঁকছে আর কড়াইতে চা জ্বাল দিচ্ছে। তাঁর চায়ের বিশেষ সুনাম আছে। মহল্লার সবাই মজিদের দোকানেই চায়ের জন্য ভিড় জমায়৷ ঘাড় ঘুরিয়ে পাশের ব্যালকনিতে দেখি, নীল রঙের একটা ওড়না বাতাসে উড়ছে।

ওড়নার মালিকের নাম নীরা। একই ফ্ল্যাটের পাশের ইউনিটে থাকে। নীরা মেয়েটা একটু অদ্ভুত। যখন কথা বলে, মনে হয় পৃথিবীর সব ব্যস্ততা থেমে গেছে। কিন্তু আজ নীরাকে একা দেখছি না। তার হাতে একটা ছোট টব।

নীরা আমাকে বারান্দায় দেখে হাসল।—ফয়সাল সাহেব, কেমন আছেন?—ভালো আছি, মিস নীরা৷ আপনার হাতে ওটা কী?—এটা একটা ক্যাকটাস। নাম রেখেছি হিমালয়।

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘ক্যাকটাসের নাম হিমালয় কেন?’

সে কিছুটা গম্ভীর হয়ে বলল, ‘হিমালয় যেমন নিঃসঙ্গ, এই ক্যাকটাসটাও তেমন। ও একা থাকতে ভালোবাসে। আচ্ছা, আপনি কি আজ রাতে একটু ছাদে আসবেন? একটা জিনিস দেখাব।’

আমি কিছু বলার আগেই নীরা ভেতরে চলে গেল।

সে মায়ের একমাত্র মেয়ে। মা আর মেয়ে মিলে সংসার। বাবা অনেক আগে মারা গেছেন। শুনেছি, রাতে অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে মারা যান। কাস্টমস কর্মকর্তা এই ভদ্রলোক নাকি খুবই ভালো ছিলেন। মেয়েটাও হয়েছে বাবার মতো। চোখ বন্ধ করে যাকে ভালো মেয়ে বলা যায়। নীরা একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। কিন্তু ওর মধ্যে করপোরেট দুনিয়ার কোনো কাঠিন্য নেই।

আরও পড়ুনটুপি–বিভ্রাট২৮ মে ২০২৬রাত দশটা। রঞ্জু অঘোরে ঘুমাচ্ছে। আমি নিঃশব্দে ছাদে গেলাম। ঢাকা শহরের ছাদগুলোয় ইদানীং খুব একটা যাওয়া হয় না। চারদিকে বড় বড় দালান আকাশটাকে খণ্ডবিখণ্ড করে রেখেছে।

নীরা ছাদের এককোণে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে গুনগুন করে গান গাইছে, ‘আমার রাত পোহাল... শারদ প্রাতে...বাঁশি, তোমায় দিয়ে যাব কাহার হাতে…’

আমি নীরার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।—কই, কী দেখাবেন বলেছিলেন?

নীরা আঙুল উঁচিয়ে আকাশটা দেখিয়ে বলল, ‘ওই যে চাঁদটা দেখছেন? আজ কিন্তু পূর্ণিমা নয়, অথচ কী সুন্দর জ্যোৎস্না দেখেছেন?’

আমি তাকিয়ে দেখলাম। আসলেই চাঁদের আলোটা আজ খুব স্নিগ্ধ। না পূর্ণিমা, না অমাবস্যা। নীরা একটু ঢোঁক গিলে বলল, ‘আমার বাবা বলতেন, মানুষ যখন খুব একা হয়, তখন চাঁদের সঙ্গে কথা বলে। আপনি কি কখনো চাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন?’

—না। আমি যুক্তি দিয়ে চলা মানুষ। নির্জীব জিনিসের সঙ্গে কথা বলা আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়।

—হুম, যুক্তিসঙ্গত। আপনাদের পুরুষদের সমস্যাই এটা। সবকিছুতে যুক্তি খোঁজেন। আচ্ছা এতকাল যুক্তি খুঁজে মুক্তি পেয়েছেন? বলুন তো, জীবন আসলে কী?

দুজনে অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। মাঝেমধ্যে নীরবতাও অনেক কথা বলে। হঠাৎ নীরা বলল, ‘ফয়সাল সাহেব, আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। আগামী মাসের তিন তারিখ।’

আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটু কেঁপে উঠল। খুব হালকা, যেন স্থির জলে একটা ছোট পাথর পড়েছে। স্বাভাবিক গলায় বললাম, ‘খুব ভালো খবর। ছেলে কী করে?’

—আমেরিকায় থাকে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। মায়ের পছন্দ। আমি ‘না’ বলতে পারিনি।

—না বলার তো কোনো কারণও নেই। আমেরিকায় যাওয়া তো অনেকের স্বপ্ন।

নীরা আমার দিকে তাকাল। ওর বড় বড় চোখ দুটোতে চাঁদের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। ও বলল, স্বপ্ন কি সব সময় গন্তব্য হয়?

আমি কোনো উত্তর দিলাম না। কেন জানি মনে হলো, এই মুহূর্তে নীরাকে বলা উচিত, তুমি যেয়ো না। কিন্তু তা বলতে পারছি না। আমি মধ্যবিত্ত বাঙালির সেই বাস্তববাদী সংস্করণ, যে জানে, আবেগ দিয়ে বাড়ি ভাড়া নেওয়া যায় না।

বিয়ের তোড়জোড় শুরু হলো। নীরাদের ফ্ল্যাটে মানুষের আনাগোনা বাড়ল। নিজেকে খানিকটা গুটিয়ে নিলাম। অফিস থেকে ফিরে সোজা ঘরে ঢুকে পড়ি। রঞ্জুও ইদানীং খুব গম্ভীর। একদিন বলল, ‘ফয়সাল, তুই কি জানিস তোর হার্টবিট ইদানীং একটু অনিয়মিত?’

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘তুই কি এখন স্টেথোস্কোপ ছাড়াই ডাক্তার হয়ে গেলি?’

কথাটা শুনে রঞ্জুর হাসার কথা, কিন্তু সে হাসল না। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, ‘মানুষের মন খারাপ হলে শরীরের ছন্দ বিগড়ে যায়। তোর নীরা মেয়েটাকে পছন্দ ছিল, তা–ই না?’

—পছন্দ ছিল না। আমার প্রতিবেশীমাত্র।

—মিথ্যা বলছিস। তুই ওকে ভালোবাসিস। কিন্তু তোর ভেতরের ওই ‘যুক্তি’ তোকে বলতে দিচ্ছে না। তুই ভাবছিস, তোর বেতন কম, তোর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এই ভেবে তুই পিছিয়ে আছিস।

রঞ্জুর কথার উত্তর না দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, শহরটা আজ বড্ড বেশি সংকীর্ণ। কেন জানি দম আটকে আসছে।

বিয়ের আগের দিন রাতে নীরা আমার দরজায় নক করল। ওর হাতে একটা খাম। খামটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ফয়সাল সাহেব, এটা আপনার জন্য।

—কী এটা?—একটা চিঠি। তবে এটা এখন পড়বেন না। আমি কাল যখন চলে যাব, তখন পড়বেন।

নীরার চোখে আজ কাজল নেই, কিন্তু চোখ দুটো অদ্ভুত মায়াবী দেখাচ্ছে। ও চলে যাওয়ার সময় একটু দাঁড়াল৷ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জানো ফয়সাল, আমি চেয়েছিলাম কেউ একজন আমার হাত ধরে বলুক, যেয়ো না। কিন্তু…’

নীরার কণ্ঠে ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে চলে আসার পরিবর্তনটা কানে বাজতে থাকল। নীরা চলে গেল। আমি সারা রাত ঘুমাতে পারলাম না। আমার যুক্তিবাদী মন বারবার বলছিল, ‘তুমি ঠিক করেছ, ফয়সাল। তুমি নীরাকে সুখী করতে পারতে না।’ কিন্তু আমার অবচেতন মন এককোনায় বসে নীরবে কাঁদছে।

রাতে নীরার দেওয়া চিঠিটা খুললাম। চিঠিতে লেখা,

‘ফয়সাল সাহেব, আপনি কি জানেন ক্যাকটাস কেন মরুভূমিতে জন্মায়? কারণ, ও জানে কেউ ওকে পানি দেবে না। ও নিজেই নিজের ভেতর বৃষ্টির জল জমিয়ে রাখে। আমি সারা জীবন ক্যাকটাসের মতোই বাঁচতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মাঝখানে আপনার মতো একজন মানুষকে দেখে মনে হয়েছিল, বৃষ্টি ছাড়াও বোধ হয় জীবন চলে।

ক্যাকটাসটা আপনার জন্য রেখে গেলাম। ওটার যত্ন নেবেন। আর মনে রাখবেন, জীবনের সব হিসাব অঙ্ক দিয়ে মেলে না। কিছু কিছু হিসাবে অমিল থাকাই সুন্দর।’

চিঠিটা পড়ার পর ছাদে গেলাম। নীরার ক্যাকটাসের টবটা ছাদের এককোনায়। টবটা হাতে নিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম, আকাশের কোথাও আজ চাঁদ নেই। ঘোর অমাবস্যা। চারদিকে অন্ধকার।

অন্ধকারে ক্যাকটাসটার গায়ে হাত দিলাম। একটা কাঁটা আঙুলে বিঁধল। রক্ত বের হচ্ছে কি না, দেখা যাচ্ছে না, তবে তীব্র ব্যথা অনুভব করলাম। রঞ্জু সেদিন ঠিকই বলেছিল, আমার বাঁহাতের কনিষ্ঠ আঙুলটা কিছুটা বাঁকা। ভাগ্য একটা বড় বাঁক নিল ঠিকই, কিন্তু সেই বাঁক আমাকে কোথায় নিয়ে এল? আমি আসলে সারা জীবন জ্যোৎস্নার ফেরিওয়ালা হতে চেয়েছিলাম কিন্তু হাতে করে নিয়ে এসেছি একমুঠো অন্ধকার।

ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়ালাম। নিচে মজিদ মিয়ার দোকানের চুলা জ্বলছে। আগুনের আভা দেখা যাচ্ছে।

সাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর বন্ধুসভাবন্ধুদের লেখা থেকে আরও পড়ুনগল্পবন্ধুসভা গল্প