বাঁ পায়ের ফুটবল জাদুকর চিংহ্লা মং চৌধুরী মারী। ‘মাঠের প্রান্তসীমা বরাবর হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে চলে সে। তার জন্য একদিকে অপেক্ষা করছে স্বর্গের মহিমা, আর অন্যদিকে—নারকীয় পতন!’ ফুটবলার নিয়ে এমন নাটকীয় লাইন বিখ্যাত লেখক এদুয়ার্দো গালিয়ানোর। ফুটবলের কবি খ্যাত গালিয়ানোর এই পঙ্ক্তি যেন অদ্ভুত এক নিয়তির প্রতিচ্ছবি হয়ে ধরা দেয় চিং হ্লা মং চৌধুরী মারীর জীবনে। মাঠে তিনি ছিলেন বিস্ময়, শিল্প আর আনন্দের আরেক নাম। দর্শক, সতীর্থ, প্রতিপক্ষ—সবাইকে মুগ্ধ করে গোলাকৃতির বস্তুটিকে বশ মানিয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের নির্মমতায় সেই উজ্জ্বল নক্ষত্রই ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। মৃত্যুর পর আরও দ্রুত হারিয়ে যান আড়ালে। একসময় যাঁর পায়ের জাদুতে মুখর ছিল স্টেডিয়াম, আজ তিনি বিস্মৃতপ্রায়।
পাহাড়ের উজ্জ্বল ফুটবল নক্ষত্র
রাঙামাটির চন্দ্রঘোনায় জন্ম চিং হ্লা মং চৌধুরী মারী। পরে যিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন মারী চৌধুরী নামেই। তিন ভাই ও এক বোনের সংসারে মারী ছিলেন সবার ছোট। সবচেয়ে ছোট সন্তানটি যেন জন্ম থেকেই ছিল আলাদা। মারীর শৈশব ছিল খেলাধুলায় ভরা। ফুটবল, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, অ্যাথলেটিকস—সবখানেই তাঁর দাপুটে উপস্থিতি। চন্দ্রঘোনা হাসপাতালের পাশের ছোট্ট মাঠেই গড়ে উঠছিল এক ভবিষ্যৎ কিংবদন্তি। মা অচ্চাময়ী চৌধুরীর উৎসাহ তাঁকে ফুটবলের প্রতি আরও নিবেদিত করে তোলে। এমন উৎসর্গ আর বৃথা যায়নি। তবে অন্য খেলাগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। সেগুলোতেও সাফল্যের শিখর স্পর্শ করেছিলেন এই প্রতিভাবান খেলোয়াড়।
খেলোয়াড়ি জীবন
ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগে মারী চৌধুরীর অভিষেক হয় ১৯৫৩ সালে, ফায়ার সার্ভিসের হয়ে। ১৯৫৪ সালে ঢাকা ওয়ান্ডারার্সে যোগ দিয়ে খেলেছিলেন ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত। পরের বছরে চলে আসেন শক্তিশালী ঢাকা মোহামেডানে। ফুটবল সৌরভ ছড়িয়েছিলেন ঢাকার আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব, ইপিআইডিসি দলের হয়ে। মাঠে তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল একধরনের প্রত্যাশা, কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটবে, কিছু অসাধারণ দৃশ্যর জন্ম দেবেন এই জাদুকর। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মাঠে ঝড় তোলা মারীর ঠাঁই হয়েছিল পাকিস্তান জাতীয় দলেও।
জন্মসাল ও শিক্ষা
মারী চৌধুরীর জন্মসাল নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য রয়েছে। ফুটবল লেখক দুলাল মাহমুদের বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩৫ সালে এই ফুটবলারের জন্ম। একটি দৈনিকের তথ্য, ১৯৩৯ সালের ২৩ মার্চ। পার্বত্য অঞ্চল থেকে প্রচারিত সংবাদ পোর্টালে লেখা হয়েছে, ১৯৩৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। বরিশালের ব্যাপটিস্ট মিশন বয়েজ স্কুলে মারীর স্কুলজীবনের শুরু। এই স্কুল থেকেই তিনি ১৯৫৩ সালে এসএসসি পাস করেন। ১৯৫৬ সালে ঢাকার জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে এইচএসসি এবং ১৯৫৯ সালে একই কলেজ থেকে বিএ পাস করেন মারী।
ফুটবল সৌরভ ছড়াল শহরে
পাহাড়ের এই সন্তানের পায়ের জাদু দেখেছিল ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন ক্লাব। দশম শ্রেণির ছাত্র থাকার সময় ১৯৫১ সালে চট্টগ্রাম প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগে ফিরিঙ্গিবাজারের হয়ে খেলেছিলেন। পরের বছর খেলেছিলেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল স্কুলের হয়ে। পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে দলের হয়ে ঢাকায় রোনাল্ডস শিল্ড খেলেন। এরপরের গল্প শুধু এগিয়ে যাওয়ার। ঢাকার সঙ্গে গড়ে ওঠে নিবিড় বন্ধন। ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগে অভিষেক হয় ১৯৫৩ সালে, ফায়ার সার্ভিসের হয়ে। ১৯৫৪ সালে ঢাকা ওয়ান্ডারার্সে যোগ দিয়ে খেলেছিলেন ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত। পরের বছরে চলে আসেন শক্তিশালী ঢাকা মোহামেডানে। ফুটবল সৌরভ ছড়িয়েছিলেন ঢাকার আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব, ইপিআইডিসি দলের হয়ে। মাঠে তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল এক ধরনের প্রত্যাশা, কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটবে, কিছু অসাধারণ দৃশ্যর জন্ম দেবেন এই জাদুকর।
মাঠ থেকে রণাঙ্গন—দেশের ডাকে সাড়া
খেলার মাঠের নিবেদিত প্রাণ এই খেলোয়াড়ের লড়াই শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের প্রয়োজনে নেমেছিলেন যুদ্ধের ময়দানে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে নেমেছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মারী প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য শাঁখারীবাজার থেকে আগরতলা চলে যান। সেখানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মীর শওকত আলীর সঙ্গে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে খেলার জন্য প্রস্তুতি নেন এই জাত ফুটবলার। কিন্তু জিয়াউর রহমানের কথা ছিল, ‘ইউ প্লে লটস, নাউ ইউ প্লে উইথ বুলেটস।’ এ মন্ত্রে উদ্দীপ্ত হয়ে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে যোগ দেওয়া হয়নি মারীর।
জাতীয় দল ও আন্তর্জাতিক অর্জন
ঢাকা ও চট্টগ্রামের মাঠে ঝড় তোলা মারীর ঠাঁই হয়েছিল পাকিস্তান জাতীয় দলেও। ওই সময় পাকিস্তানের জাতীয় দলে এই অঞ্চল থেকে হাতে গোনা ফুটবলার সুযোগ পেতেন। তাঁদেরই একজন ছিলেন মারী। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান জাতীয় দলে জায়গা পেয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন আরেক বাঙালি নবী চৌধুরী। জাতীয় দলের হয়ে এশিয়ান গেমস ও মালয়েশিয়ার মারদেকা কাপে অংশ নিয়েছিলেন মারী চৌধুরী। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন মারী। ১৯৫৭ সালে জাতীয় ফুটবল প্রতিযোগিতায় পূর্ব পাকিস্তান সাদা দলের অধিনায়ক ছিলেন। তখন এই দলকে ওই সময়ের অন্যতম সেরা দল বিবেচনা করা হতো।
গোল ও অন্যান্য ক্রীড়ায় সাফল্য
ঢাকা লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের একজন মারী তাঁর ক্যারিয়ারে ২০০–এর বেশি গোল করেছিলেন। ১৯৬৭ সালে ইপিআইডিসিতে খেলার সময় ইনজুরিতে পড়েছিলেন। পরে আর ফিরতে পারেননি। ওই বছর অবসর নিয়েছিলেন। তবে অবসর নেওয়ার আগে নিজের প্রতিভার জানান দিয়েছিলেন আরেকবার, অসাধারণ নৈপুণ্যে দলকে চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন। ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পর প্রশিক্ষক হিসেবে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন মারী চৌধুরী। ১৯৮২ সালে তাঁর প্রশিক্ষণে বিআরটিসি দ্বিতীয় বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে উন্নীত হয়েছিল। ফুটবলের সঙ্গে সঙ্গে অ্যাথলেটিকসেও অবিশ্বাস্য দক্ষতা ছিল মারী চৌধুরীর। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান অলিম্পিকে হাইজাম্পে সোনা জিতেছিলেন, ১০০ মিটার স্প্রিন্টে পেয়েছিলেন রুপা। ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান ভলিবল দলের অধিনায়ক ছিলেন।
অদ্ভুত এক সৌন্দর্যের গল্প
একসময় ঢাকা-চট্টগ্রামের ক্লাব পাড়ায়, স্টেডিয়াম পাড়ায় মানুষের মুখে মুখে ফিরত মারী চৌধুরীর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের গল্প। তাঁর ক্রীড়া নৈপুণ্য দিনের পর দিন দর্শকদের আনন্দে মাতিয়ে রাখত। শুধু কি দর্শক, খেলোয়াড়রাও মুগ্ধ নয়নে এই ফুটবল তারকার মাঠে রাজত্ব করার ক্ষণগুলো উপভোগ করতেন। ২০১২ সালে মারীর চৌধুরীর মৃত্যুর পর কিংবদন্তি ফুটবলারকে নিয়ে লেখেন আরেক কিংবদন্তি ফুটবলার। তিনি হচ্ছেন গোলাম সারোয়ার টিপু। যিনি নিজেও পাকিস্তান জাতীয় দলে খেলেছিলেন। মাঠে মারী চৌধুরীর উপস্থিতি মানেই ছিল এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য। তাঁর মৃত্যুর খবর শুনতেই মাঠের মারী চৌধুরীকেই বারবার মনে পড়ছিল গোলাম সারোয়ার টিপুর। সে সময়ের স্মৃতি নিয়ে প্রথম আলোতে লিখেছিলেন, ‘মারীদার চলে যাওয়ার খবরটা যখন শুনলাম, চোখের সামনে একটা খেলার দৃশ্য ভেসে উঠল। ১৯৫৬ সালে ঢাকা স্টেডিয়ামে আমি প্রথম খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। আমি তখন ফাইভ-টাইভে পড়ি। খেলা হচ্ছিল মোহামেডান ও আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের মধ্যে। মনে আছে, মাঠটা ছিল ভেজা। আর মনে আছে, বারবার আমি একজন খেলোয়াড়কেই ফিরে ফিরে দেখেছিলাম। সেই খেলোয়াড়ের নাম চিহ্লা মং চৌধুরী মারী। তাঁর চেহারা, মাঠে হাঁটাচলা, শরীরী ভাষা—সবকিছুই ছিল অন্য রকম।’
সাবেক ফুটবলার গোলাম সারোয়ার টিপুর মূল্যায়ন
দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও বিখ্যাত ফুটবলারের প্রতি মুগ্ধতা শেষ হয়নি বাংলাদেশ দলের সাবেক ম্যানেজারের। তিনি লেখেন, ‘মারীদার কথা বললেই কবীর-মারী-আশরাফ বিখ্যাত সেই “ত্রয়ী”র কথা আসবে। লেফট ইনসাইড ফরোয়ার্ড মারী, রাইট ইনসাইড ফরোয়ার্ড কবীর আর স্ট্রাইকার আশরাফ। আশরাফ ভাই ছিলেন দুর্দান্ত ফিনিশার। কবীর ভাইও খুব স্টাইলিশ ছিলেন। তবে সবাইকে ম্লান করে জ্বলজ্বল করতেন মারীদা। ওয়ান অব দ্য বেস্ট-টেস্ট নয়, আমি বলব, আমাদের এই ভূখণ্ডে মারীদাই অলটাইম গ্রেট ফুটবলার। তাঁর মতো ফুটবলার আর আসেনি। ভবিষ্যতেও আসবে বলে মনে হয় না।’
বাঁ পায়ের জাদুকর
মারী চৌধুরীর মতো পাকিস্তান জাতীয় দলে খেলা খেলোয়াড়দের নিয়ে ‘পাকিস্তান জাতীয় দলে বাঙালি খেলোয়াড়’ নামে বই লেখেন সাংবাদিক দুলাল মাহমুদ। বইয়ে চিং হ্লা মং চৌধুরী সম্পর্কে দুলাল মাহমুদের বর্ণনা, ‘তিনি ছিলেন ফুটবলের নিপুণ শিল্পী। ফুটবলকে কেন্দ্র করে কত যে দুর্লভ সব চিত্র তিনি অবলীলায় এঁকেছেন, তা পঞ্চাশ ও ষাট দশকের দর্শকদের হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে।...খেলা দেখে দর্শকেরা ফিরতেন বুকের মধ্যে মুগ্ধতার আবেশ নিয়ে। খেলার জয়-পরাজয়ের চেয়ে বেশি আলোচনায় থাকতো তাঁর বাঁ পায়ের শিল্পিত কারুকাজ।’ মাঠে জাদু ছড়ানোর মুহূর্তগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখেন, ‘খেলার মাঠে অনায়াসেই বুঝিয়ে দিতেন, তিনি অন্য সবার চেয়ে আলাদা। আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতেই তিনি পছন্দ করতেন। এক পায়ের খেলোয়াড় হলেও প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের পক্ষে তাঁকে আটকে রাখা ছিল দুরূহ। তাঁকে আটকানোর কোনো কৌশলই যেন কাজে লাগত না। চাতুর্যের সঙ্গে নিজে কিংবা অন্যকে দিয়ে গোল আদায় করে নিতে পারতেন।’
স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল
পাহাড় থেকে বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলেছিলেন বরুন বিকাশ দেওয়ান। বয়সভিত্তিক দল থেকে ধাপে ধাপে মূল দলে সুযোগ পেয়েছিলেন এই সাবেক ফুটবলার। এখন থাকেন রাঙামাটিতেই। সম্প্রতি রাঙামাটি মারী স্টেডিয়ামে এসেছিলেন অনুশীলন করতে। এখনো ফুটবলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি তাঁর। ছিলেন রাঙামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক। বর্তমানে রাঙামাটি জেলা পরিষদের সদস্য। পাহাড়ের উজ্জ্বল নক্ষত্র মারীর চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় আজ থেকে ৩২ বছর আগে, ১৯৮৪ সালে। তখন অনূর্ধ্ব-১৪ দলের খেলোয়াড় হিসেবে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে আসা-যাওয়া বরুনের। মারীর চৌধুরীর কথা তুলতেই তিনি বলেন, ‘মারী কাকুকে নিয়ে কথা বলতে গেলে অনেক স্টোরি (গল্প) আছে। আমি তাঁকে ১৯৮৪ এ পেয়েছি। যখন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে অনূর্ধ্ব-১৪ এর ক্যাম্পে গিয়েছিলাম। ওখানে ওনার স্ত্রী চাকরি করতেন। তৎকালীন ওনার কাছে শুনলাম, উনি পার্বত্য এলাকার মানুষ। ভালো খেলোয়াড় ছিলেন। পরে জানতে পারলাম উনি শুধু ভালো খেলোয়াড় নয়, খুব হাই কোয়ালিটির খেলোয়াড় ছিলেন।’
মারী স্টেডিয়াম ও স্মৃতিচারণ
চিং হ্লা মং চৌধুরী মারীর নামে রাঙামাটির মারী স্টেডিয়াম। খেলা দেখার সুযোগ না হলেও মারী চৌধুরীর খেলোয়াড়ির জীবনের ইতিহাস নখদর্পণে বরুন বিকাশ দেওয়ানের। তিনি বলেন, ‘ওনার খেলা দেখার সুযোগ হয়নি। হিস্ট্রি (ইতিহাস) জেনে আমার কিছুটা অনুভূতি হলো, পার্বত্য এলাকায় এই ধরনের খেলোয়াড় ছিলেন, তা আমরা জানতাম না। তবে ফুটবল জীবন যখন শুরু করলাম, তখন থেকে তাঁর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছি। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে নিয়মিত দেখা হতো। নিয়মিত যোগাযোগ হতো। তিনি ছিলেন আমাদের অনুপ্রেরণা।’ একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মারীর চৌধুরীকে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ গর্ব অনুভব করেন বলে জানান বরুন বিকাশ দেওয়ান। তবে পার্বত্যাঞ্চলের এমন ক্ষণজন্মা মানুষটির স্মরণে তেমন কোনো উদ্যোগ না থাকার আক্ষেপ ছিল সাবেক জাতীয় দলের এই খেলোয়াড়ের। ২০১০ সালে রাঙামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে কিংবদন্তির স্মৃতি ধরে রাখার ব্যাপারে উদ্যোগী হন বলে জানান বরুণ বিকাশ দেওয়ান। এরপর রাঙামাটি জেলা স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হলো মারী চৌধুরীর নামেই। প্রবেশ ফটকের পাশে আছে ম্যুরাল। তবে সেখানে নেই বিস্তারিত পরিচয়। এই বিখ্যাত খেলোয়াড়কে নিয়ে রাঙামাটিতে একটি জাদুঘর জাতীয় কিছু করার আহ্বান স্থানীয় মানুষের, যাতে তরুণ প্রজন্মের খেলোয়াড়রা তাঁর কৃতিত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ি জীবন নিয়ে উৎসাহিত হবে, অনুপ্রাণিত হবে।
স্বাধীনতা পুরস্কার, অপূর্ণ শেষ ইচ্ছা
ফুটবল কবি এদুয়ার্দো গালিয়ানো খেলোয়াড় নিয়ে লেখা শেষ করছেন এভাবে, ‘খ্যাতি নামের সেই চনমনে নারী, ওকে নিঃস্ব, রিক্ত অবস্থায় ত্যাগ করার সময় বিদায় বলা তো দূর, একটিবার ফিরে পর্যন্ত তাকায়নি।’ কী করুণভাবে এই বাস্তবতা মিলে যায় মারী চৌধুরীর সঙ্গে। ফুটবল–জগৎ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন অনেক আগেই। ২০১২ সালের ৯ মে পৃথিবীর সঙ্গেও বিচ্ছেদ ঘটে এই কিংবদন্তির। খেলোয়াড়ি জীবনের স্বর্গীয় আনন্দ উদ্যাপনের মুহূর্তগুলো আর ছিল না শেষের জীবনে। রোগশয্যায় এই জীবনটা কেটেছিল আর্থিক সংকটে। পুরো পরিবারে যার প্রভাব পড়ে, দিশেহারা ছিল তাঁরা। শেষ জীবনে দুটি ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন মারী। এক সময় খেলার মাঠে ফুটবলকে বশ মানিয়েছিলেন। তবে ইচ্ছাপূরণের ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না। প্রথম ইচ্ছা রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের বাড়িতে, যেখানে পারিবারিক কবরস্থানে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পাবেন গার্ড অব অনারও। সে ইচ্ছা পূরণ হলেও দ্বিতীয় ইচ্ছাটা পূরণ হয়নি। একে তো কিংবদন্তি ফুটবলার, তার ওপর ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাই স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য মনে করতেন নিজেকে। কিন্তু মারী তা পাননি। মৃত্যুর পর পার হয়েছে ১৪ বছর। প্রতিবার ঘোষিত হয় স্বাধীনতা পুরস্কার। কিন্তু অপেক্ষার অবসান হয়নি মারীর পরিবারের।
বিবর্ণ বিদায়
জীবনের শেষ বিদায়টাও ছিল বড় বেশি বিবর্ণ, অনাড়ম্বর। কিংবদন্তি ফুটবলারের শেষ যাত্রায় ফুটবলারদের ঢল নামেনি। ফুটবল ফেডারেশনের উপস্থিতিও ছিল আনুষ্ঠানিকতা। এসেছিলেন তখনকার পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার। ফোন করেছিলেন তখনকার ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীকে আসার জন্য। কিন্তু আসেননি। এদুয়ার্দো গালিয়ানো লিখেছিলেন—খ্যাতি নামের নারী বিদায় নেওয়ার সময় ফিরে তাকায় না। মারী চৌধুরীর জীবন যেন সেই কথারই নির্মম প্রতিফলন। একসময় স্বর্গীয় উল্লাসে ভেসে যাওয়া এই ফুটবলশিল্পী শেষ পর্যন্ত হারিয়ে গেলেন নিঃশব্দ অবহেলায়। তবু ইতিহাসের পাতায়, যারা জানে, তাদের স্মৃতিতে, চিং হ্লা মং মারী চৌধুরী রয়ে যাবেন এক অমলিন নাম, এক অপূরণীয় শূন্যতা।



