হারুকি মুরাকামির গল্পে মধুভালুক ও ভূমিকম্পের মানব
মুরাকামির গল্প: মধুভালুক মাসাকিচি ও সালার স্বপ্ন

জুনপেই সালাকে মাসাকিচি ভালুকের গল্প শোনায়। মাসাকিচি ছিল সর্বকালের সেরা মধু-ভালুক। সে পাহাড় থেকে মধু সংগ্রহ করে বালতিতে ভরে শহরে নিয়ে যেত এবং খাঁটি সুস্বাদু মধু প্রতি কাপ ২০০ ইয়েনে বিক্রি করত। সালা জানতে চায়, ভালুকের কি বালতি থাকে? জুনপেই ব্যাখ্যা করে, ঘটনাচক্রে মাসাকিচির একটা বালতি ছিল, যা সে রাস্তায় পড়ে থাকতে পেয়ে নিয়ে এসেছিল। ভালুকটি কথা বলতে ও টাকা গুনতে পারত, কারণ ছোটবেলায় মানুষের সঙ্গে বসবাস করেছিল। কিন্তু সাধারণ ভালুকেরা তাকে এড়িয়ে চলত, বিশেষ করে টঙ্কিচি নামের এক দাঙ্গাবাজ ভালুক। মাসাকিচি কোনো জগতেই ঠিকমতো জায়গা পায় না—না ভালুকদের জগতে, না মানব জগতে।

সালার প্রশ্ন আর জুনপেইয়ের গল্প

সালা জুনপেইকে প্রশ্ন করে, মাসাকিচির কোনো বন্ধু নেই কেন? জুনপেই উত্তর দেয়, ভালুকেরা স্কুলে যায় না, তাই বন্ধু বানানোর জায়গা নেই। সালা বলে তার প্রি-স্কুলে বন্ধু আছে। জুনপেই জানায়, তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু সালার বাবা ও মা। সালা যখন ঘুমাতে যায়, জুনপেই প্রায়ই বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলে। সালার প্রশ্নগুলো তীক্ষ্ণ ও মজাদার হয়, আর জুনপেই উত্তর ভেবে গল্পের নতুন মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

সায়োকোর আগমন ও মাসাকিচির গান শোনা

সায়োকো এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে আসে। সালা জানায়, মাসাকিচি সর্বকালের সেরা মধু-ভালুক কিন্তু তার কোনো বন্ধু নেই। সায়োকো জিজ্ঞেস করে ভালুকটা কি বড়? জুনপেই বলে না, সে ছোট, সালার মতোই আকার, আর সে শাস্ত্রীয় সংগীত, বিশেষ করে শুবের্টের 'ট্রাউট' শুনতে ভালোবাসে। সায়োকো সুরটা গুনগুন করে। সালা জিজ্ঞেস করে, মাসাকিচির কি সিডি প্লেয়ার আছে? জুনপেই বলে, সে একদিন মাটিতে পড়ে থাকা একটা বুমবক্স খুঁজে পেয়েছিল। সালা সন্দেহ করে, পাহাড়ে এসব জিনিস পড়ে থাকে কেন? জুনপেই ব্যাখ্যা করে, পাহাড়টা খাড়া, আর হাঁটতে যাওয়া লোকেরা মাথা ঘুরে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাই অপ্রয়োজনীয় জিনিস ফেলে দেয়। মাসাকিচি সেগুলো কুড়িয়ে নেয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সায়োকো মন্তব্য করে, ভারী বোঝা কেমন লাগে তা মায়েরা সবচেয়ে ভালো বোঝে। সালা প্রতিবাদ করে যে সে লোভী নয়। জুনপেই তাকে শান্ত করে বলে, তুমি লোভী নও, শুধু ছোট আর শক্তিতে ভরপুর। সালা দুধ খেয়ে নেয় এবং জিজ্ঞেস করে, মাসাকিচি কেন মধুর কেক বানিয়ে বিক্রি করে না? সায়োকো হাসিমুখে বলে, তাতে মুনাফাও বেশি হবে। জুনপেই বলে, এই মেয়েটি একদিন সত্যিই একজন বড় উদ্যোক্তা হবে।

মধ্যরাতের আলোচনা

প্রায় রাত দুইটায় সালা ঘুমিয়ে পড়লে জুনপেই আর সায়োকো রান্নাঘরের টেবিলে বসে এক ক্যান বিয়ার ভাগাভাগি করে খায়। সায়োকো দুঃখ প্রকাশ করে যে তাকে মাঝরাতে ডেকে এনেছে। জুনপেই বলে, চিন্তা করো না, সে সূর্য ওঠা পর্যন্ত জাগবে। সায়োকো জানায়, সালা প্রায় প্রতি রাতেই মাঝরাতে হিস্টিরিয়ার মতো খিঁচুনি নিয়ে জেগে ওঠে এবং কাঁপুনি থামে না। সায়োকো মনে করেন, ভূমিকম্পের অনেক রিপোর্ট দেখে সালার এই অবস্থা। সালা বলে, এক অজানা-অচেনা লোক, যাকে সে 'ভূমিকম্পের মানব' নামে ডাকে, তাকে জাগিয়ে তোলে এবং তাকে একটা ছোট্ট বাক্সের ভেতর ঢোকাতে চায়। সালা চিৎকার করে ঘুম ভেঙে যায় এবং তারপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাড়ির সব জায়গায় 'ভূমিকম্পের মানব'কে খোঁজে।

জুনপেই পরামর্শ দেয়, খবর দেখা বাদ দিতে এবং টিভি না চালাতে। সায়োকো বলে, সে টিভি প্রায় দেখে না, কিন্তু সালার কাছে 'ভূমিকম্পের মানব' আসে। ডাক্তার শুধু ঘুমের ওষুধ দিয়েছে। জুনপেই প্রস্তাব করে, রোববার চিড়িয়াখানায় যাওয়া যাক, সালা সত্যিকারের ভালুক দেখতে চায়। সায়োকো রাজি হয় এবং বলে, চারজনই যাবে।

জুনপেইয়ের অতীত

জুনপেইর বয়স ছত্রিশ। তার জন্ম হিয়োগো প্রিফেকচারের নিশিনোমিয়া শহরে। তার ছয় বছরের ছোট বোন আছে। বাবা ওসাকা ও কোবেতে গয়নার দোকান চালান। জুনপেই টোকিওর ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হয়, যদিও বাবা-মা ভেবেছিল সে ব্যবসা বিভাগে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সে দুজন বন্ধু পায়: তাকাতসুকি ও সায়োকো। তাকাতসুকি নাগানো থেকে এসেছিল, লম্বা ও প্রশস্ত কাঁধের অধিকারী, ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিল। সায়োকো টোকিওর পুরোনো বণিক এলাকার মেয়ে, তার বাবা ঐতিহ্যবাহী জাপানি অলংকারের দোকান চালান। সায়োকো ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করে শিক্ষক হতে চায়। জুনপেই সায়োকোর প্রেমে পড়ে, কিন্তু তাকে জানাতে সাহস পায় না। তাকাতসুকি জুনপেইকে জানায় যে সে সায়োকোর প্রেমে পড়েছে। জুনপেই মেনে নেয়, কিন্তু ভেতরে ভেঙে পড়ে।

পাঁচ দিন ক্লাসে না গেলে সায়োকো জুনপেইর বাসায় আসে। তারা বিয়ার খায় এবং সায়োকো কাঁদে। জুনপেই তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায়, কিন্তু সায়োকো বলে, 'আমরা এটা করতে পারি না।' তারপর তারা আবার বন্ধুত্ব বজায় রাখে। জুনপেই গল্প লেখা চালিয়ে যায় এবং সায়োকোর মতামত নেয়। তার গল্প 'আকুতাগাওয়া পুরস্কারের' জন্য মনোনীত হয় কিন্তু জিতে না। সে ছোটগল্প লেখক হিসেবেই থেকে যায়। তাকাতসুকি পত্রিকার প্রতিবেদক হয়, সায়োকো মাস্টার্স শেষ করে। তারা বিয়ে করে এবং সালার জন্ম হয়। জুনপেই সালার নাম দেয়।

বিবাহবিচ্ছেদ ও নতুন সম্পর্ক

সালার দ্বিতীয় জন্মদিনের আগে জুনপেই জানতে পারে যে তাকাতসুকি অন্য এক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে। সায়োকো ও তাকাতসুকির বিবাহবিচ্ছেদ হয়। তারা সপ্তাহে একবার সালাকে নিয়ে একসঙ্গে সময় কাটায়। তাকাতসুকি জুনপেইকে সায়োকোকে বিয়ে করার পরামর্শ দেয়। জুনপেই দ্বিধায় থাকে। ভূমিকম্পের সময় জুনপেই বার্সেলোনায় থাকে। সে টোকিওতে ফিরে আসে এবং নিজের মধ্যে নিঃসঙ্গতা অনুভব করে।

চিড়িয়াখানা ও ভালুকের গল্প

রোববার তারা চিড়িয়াখানায় যায়। সালা ভালুক দেখে জিজ্ঞেস করে, ওটা কি মাসাকিচি? জুনপেই বলে না, ওটা টোনকিচি। সালা টোনকিচি সম্পর্কে গল্প চায়। জুনপেই বলে, টোনকিচি স্যামন মাছ ধরায় দক্ষ, কিন্তু কথা বলতে পারে না। সালা পরামর্শ দেয়, টোনকিচি তার বাড়তি স্যামন মাসাকিচির মধুর সঙ্গে বদল করুক। জুনপেই বলে, তাই তারা বন্ধু হয়ে যায়। কিন্তু একদিন নদী থেকে সব স্যামন মাছ উধাও হয়ে যায়। টোনকিচি আর স্যামন ধরতে পারে না। মাসাকিচি তাকে বিনা মূল্যে মধু দেয়, কিন্তু টোনকিচি তা নিতে চায় না। শেষে টোনকিচি পাহাড় ছেড়ে চলে যায় এবং শিকারির ফাঁদে পড়ে চিড়িয়াখানায় আসে।

ফিরে এসে তারা একসঙ্গে রাতের খাবার খায়। সায়োকো 'ট্রাউট' সুর গুনগুন করে পাস্তা রান্না করে, জুনপেই সালাদ বানায়। সালা ঘুমাতে না চেয়ে সায়োকোর ব্রা খোলার খেলা দেখাতে বলে। সায়োকো লজ্জা পায় কিন্তু শেষ পর্যন্ত খেলাটি দেখায়। সালা সময় ধরে, সায়োকো ২৫ সেকেন্ডে ব্রা খুলে ফেলে, যা আগের রেকর্ড ৩৬ সেকেন্ডের চেয়ে ভালো। পরে সায়োকো স্বীকার করে যে সে ব্রা আবার পরার ভান করেছিল, আসলে মেঝেতে ফেলে দিয়েছিল।

রাতের ঘনিষ্ঠতা ও 'ভূমিকম্পের মানব'

সালা ঘুমিয়ে পড়লে জুনপেই ও সায়োকো সোফায় জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। তারা শোবার ঘরে যায় এবং একে অপরের কাছাকাছি হয়। হঠাৎ সালা দরজায় দাঁড়িয়ে বলে, 'ভূমিকম্পের লোকটা আমাকে এখানে আসতে বলেছে। সে বলেছে, সবার জন্য বাক্সটা রেডি করে রেখেছে।' সালা সায়োকোর বিছানায় ঘুমায়, জুনপেই সোফায় শুয়ে থাকে কিন্তু ঘুমাতে পারে না। সে ভাবে, তাকাতসুকির বন্ধু বেছে নেওয়ার প্রতিভা ছিল, কিন্তু ভালোবাসার জন্য মানুষ খুঁজে পাওয়া আলাদা। সকালে জুনপেই সিদ্ধান্ত নেয় যে সে সায়োকোকে বিয়ে করবে। সে তাদের ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে এবং ভাবে, সে এমন গল্প লিখতে চায় যা আগে লেখেনি—স্বপ্নদর্শী মানুষদের নিয়ে, যারা আলোর জন্য আকুল।

জুনপেই সালার জন্য গল্পের নতুন সমাপ্তি ভাবে: টোনকিচি মধুর কেক বানায়, মাসাকিচি তা শহরে বিক্রি করে, আর তারা চিরদিনের সেরা বন্ধু হয়ে পাহাড়ে সুখে-শান্তিতে থাকে। জুনপেই নিশ্চিত, এই সমাপ্তি সালা ও সায়োকো পছন্দ করবে। সে প্রতিজ্ঞা করে, সে কখনোই তাদের 'ভূমিকম্পের মানবের' বাক্সে ঢোকাতে দেবে না—আকাশ ভেঙে পড়লেও বা পৃথিবী গর্জন করলেও না।