কালীভক্ত কবি কাজী নজরুল ইসলামের শ্যামাসাধনা ও বাৎসল্য
নজরুলের শ্যামাসাধনা: কালী থেকে কন্যা

"আমার কালো মেয়ে রাগ করেছ (মাকে) কে দিয়েছে গালি?" বাঙালি হিন্দুর আরাধ্যা তান্ত্রিক-দেবী কালী কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের হাত ধরে প্রথম ঘরে উঠেছিলেন; শ্মশানবাসিনী, কৃত্তিবসনা, প্রচণ্ড-চণ্ডী তাঁর উগ্ররূপ ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়েছেন শুভ্রহাসি ও চন্দ্রকান্তি নিয়ে। তাঁর রুদ্র ও ভয়ংকর ধরলো বাৎসল্যরূপ। বাঙালি কবি রামপ্রসাদ ভক্তিনয়ন দিয়ে তাকালেন কালীর দিকে; তো কালী কখনো মা, কখনো শ্যামা, কখনো কন্যা হয়ে দেখা দিলেন। তিনি হয়ে উঠলেন তাঁর সারস্বত-সাধনার কাব্যসরস্বতী। পরবর্তীকালের সাধক কমলাকান্তও একই ধারায় রচনা করেছেন অসংখ্য শাক্তপদ। কিন্তু এমনই বীণাভারতীর অকাট্য-লিপি; তিনি কখন যে কার কণ্ঠে বসে গাইবেন গীত, কার কণ্ঠে ফুঁটিয়ে তুলবেন তাঁর নিজেরই পূজার জবা, কার লীলার হাতে সাজাবেন নিজেরই অর্ঘ্য, সেকথা ভারতীই জানেন।

নজরুলের শ্যামাভক্তি: রামপ্রসাদ ও কমলাকান্তের ধারায়

রামপ্রসাদ ও কমলাকান্তের পরে, কাজী নজরুলই শ্যামাভক্ত সেই কবি, যিনি তাঁর রুদ্রলেখায় ভক্তির গভীর থেকে তুলে এনেছেন সংগীতের লিপিমালা। শ্যামাকে ঘরের মেয়ে করে তুলেছেন ঘরে। অনুরাগে করেছেন শাসন, অভিমানে ফিরিয়েছেন মুখ, তাঁর বাৎসল্য তাঁকেই দিয়েছে এই অধিকার, যেন শ্যামা তাঁর মায়ের অধিক মেয়ে। যখন নজরুল গেয়ে উঠেন, "আমার কালো মেয়ে রাগ করেছে (মাকে) কে দিয়েছে গালি?/ রাগ ক'রে সে সারা গায়ে মেখেছে তাই কালি।" যেন রাঢ়-বঙ্গের কোনো অবাধ্যবালিকা, পড়শি ছিনালের কটুকথা সইতে না পেরে, লজ্জায়-অভিমানে সারা গায়ে কালি মেখে লুকিয়ে আছে নলখাগড়ার বনে কোথাও! যেন নদীয়ার রূঢ়মৃত্তিকার রং ধারণ করে, কোনো ত্রয়োদশী কিশোরী কন্যা, নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে চায়, ঈর্ষাতুরা যুবতীদের কাছ থেকে। সমাজ তাঁর উগ্র সৌন্দর্যকে আবিষ্কার করে ফেলেছে, যেকোনো উপায়ে তা তাঁকে ঢেকে রাখতে হবে; শ্যামা, সেই খর্ববুদ্ধি অসুরলোক থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে অতি সন্তর্পণে ঘরে উঠেছে; তাঁকে আবার কে গালি দেয় গো?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নজরুলের রুদ্র থেকে বাৎসল্যে যাত্রা

কাজী নজরুল ইসলাম কেবল সেই রণরঙ্গিণীর সন্তানই নন, শ্যামার ব্যথারও দরদী; তাঁর দুঃখরাতের সান্ত্বনা, তাঁর কিশোরীচিত্তের লজ্জা ও মান লুকোনোর আশ্রয়। কালীর সংগীতে এই বাৎসল্য পূর্বে কোথাও দেখা যায় না। ব্রজগোপীর হোরি খেলার মধ্যে যেই সখ্য-শৃঙ্গার ধরা পড়ে, বাৎসল্য তাঁর নিকটবর্তী। কাজী নজরুল ইসলাম রুদ্র থেকে বাৎসল্যেই যেতে চেয়েছেন চিরদিন, রুদ্র তাঁর বহিরঙ্গ, প্রেম তাঁর অন্তরঙ্গ। পুরাণের রুদ্র তাণ্ডবে মেতেছিলো প্রেমের কারণেই। সতীর মৃতদেহ কাঁধে তুলে নিয়ে বিধ্বংসী নৃত্যে শিব যেই উপমা সৃষ্টি করেছেন, কাজী নজরুল ইসলাম সেই প্রাচীন নৃত্যের মুদ্রায় চরণ ফেলেছেন মাত্র; প্রেমহীন, দয়াহীন সংসারে, বিশ্বসতীর শব-কাঁধে কাজী নজরুল ইসলামও মেতেছেন ভাবের তাণ্ডবে। বাণীর নৃত্যে সুরের ডম্বরু তাঁর বেতাল হয়নি একতিল। কিন্তু তাঁর অন্তরে যে মায়া, শাশ্বতধ্বনি তুলে বেজে চলেছে অবিশ্রান্ত, সে প্রেম নয় তো কী? তাই হিমালয়ে তপস্যা শেষে শিবের সঙ্গে যখন উমার সাক্ষাৎ ঘটে; উমা থরহর কণ্ঠে বলে উঠে, "হে শিব সুন্দর, বাঘছাল পরিহর, ধর নটবর-বেশ, পর নীপ-মালা…/ পার্বতী নহি আমি, আমি শ্রীমতী/ বিষাণ ফেলিয়া হও বাঁশরি-ধারী।"

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কাজী নজরুল ইসলাম যেই বিষের বিষাণ বাজিয়ে গেছেন, তাঁরই সংগীতে বিষাণ ফেলে দেওয়ার আহ্বান, আপাতঅর্থে দ্বান্দ্বিক ঠেকলেও, আমৃত্যু নজরুল বিষাণকে নির্মূল করতেই চেয়েছেন। এই রণরঙ্গ ভঙ্গ হলে, এই চিতাবহ্নি নিভে গেলে, মধুসাগরে আবগান ও বিশ্বকে এর পরিশ্রুত অমৃত উপহার দেবেন বলেই তাঁর এই সারস্বত-সাধনা। বলা-বাহুল্য তাঁর এই প্রেমভক্তির আশ্রয়টুকু মিলেছিলো কালীপদে। পুরাকালে সিন্ধু-মন্থনে হলাহল পান করে ব্যথায় যখন নীল হয়ে গিয়েছিলেন শিব; তখন মাতৃরূপিণী তারা নিজ স্তন্যদান করে শীতল করেছিলেন শিবকণ্ঠের বিষকে। তাঁর দুঃখযন্ত্রণার নিবারণ ছিলো কালী। তেমনই যুগের বিষকে অকুণ্ঠচিত্তে পান করে গেছেন কাজী নজরুল ইসলাম; তাঁর সমসাময়িক কোন কবি কিংবা সাধক এতটা পান করেছেন কিনা তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে; কিন্তু বারংবার এটাই প্রমাণ হবে যে, কাজী নজরুল ইসলামের মতো এমন করে, সুখ ও সংসার, দয়া ও দীনতা, ব্যথা ও মৃত্যুকে কেউ কোনোদিন পান করেননি। কালীস্তন্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর জীবনমন্থনের কালকূটের নিবারণ।

যোগীরাজ বরদাচরণের প্রভাব ও শাক্তপদ রচনা

যোগীরাজ বরদাচরণ মজুমদারের শিষ্যত্ব গ্রহণ কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে তৈরি করেছে এই আধ্যাত্মিক সংযোগ; শাক্তপদ রচনার অনুপ্রেরণা তিনি কেবল তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছিলেন, এইকথাও সর্বাঙ্গে সত্য নয়; কিন্তু একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, যোগীরাজ বরদাচরণ তান্ত্রিক যোগক্রিয়ায় সিদ্ধপুরুষ বলে সমাদৃত হয়েছেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র থেকে শুরু করে শ্রী অরবিন্দ ঠাকুরের মতো মহাজনের নিকটেও; ফলে তাঁর প্রভাব কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে পড়েছে গভীরভাবে; পুত্রহারা কাজী নজরুল ইসলাম খুঁজে পেয়েছিলেন, কালীরূপী কন্যাকে; একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক ও আত্মিক সুখ তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন শ্যামা নাম কীর্তনে।

রামপ্রসাদের কাব্যপ্রসাদের উত্তরাধিকারী প্রসাদী সুর ছেড়ে কীর্তন অঙ্গেও গেয়েছেন শাক্তপদ; "আমার শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে/ জপি আমি শ্যামের নাম/ মা হলো তাঁর মন্ত্র-গুরু/ ঠাকুর হলেন রাধা-শ্যাম" –পদটি সিন্ধু-কাফির কীর্তনঅঙ্গে গাওয়া। কালী ও কৃষ্ণের অভেদকল্পনা পূর্ববর্তী সাধক কবি কমলাকান্তের পদে পাওয়া যায়, যেখানে কমলাকান্ত বলেছেন, "জানো না রে মন, পরমকারণ, কালী কেবল মেয়ে নয়/ সে যে মেঘের বরণ করিয়া ধারণ/ কখনো কখনো পুরুষ হয়।" হাজার বছরের কালী-কৃষ্ণের ভেদ মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলেছে সাধকদের গীতি ও পদাবলীতে। ঋষিরা উচ্চারণ করেছেন সংস্কৃত শ্লোক; মার্কণ্ডেয় চণ্ডীতে আছে, কালী স্বয়ং বলেছেন, তিনি কৃষ্ণরূপে আবির্ভূত হবেন দ্বাপরে, নন্দের ঘরে (নন্দগোপ গৃহেজাতা যশোদাগর্ভসম্ভবা), অর্থাৎ, দ্বাপরে কংসাসুরবধের জন্য দেবী কালীই কৃষ্ণ হয়ে জন্ম নেবেন; কেবল সংস্কৃত শ্লোকেই যখন বিভেদ ঘুচেনি, তখন কালীভক্ত কবিগণ প্রাকৃতজনের মুখের ভাষায় বেঁধেছেন শাক্ত ও বৈষ্ণবের মিলনের গীতিকা। কাজী নজরুল ইসলামও এমন কিছু শাক্ত-পদের রচয়িতা, যেমন, "মহাকালের কোলে বসে কৃষ্ণ হলেন মহাকালী" ইত্যাদি। শুধু পদ-রচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি নজরুল; শাক্তসুর ও কীর্তনের সুরকে একাকার করে দিয়ে গেয়ে উঠেছেন এই নবধারার শ্যামাসংগীত।

ভাষার সৌকর্য: রামপ্রসাদ বনাম নজরুল

ভাষার সৌকর্যে, ভাবের ঔদার্যে বলা বাহুল্য কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন রামপ্রসাদের চেয়ে অগ্রগামী; বেঁছে বেঁছে ধ্রুপদী শব্দচয়ন করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম, এটা জেনেও শ্যামা-সংগীতের প্রচলিত ধারায় আটপৌরে বাংলা শব্দের চল আছে; যা রামপ্রসাদ সেনের ভাষাবোধ থেকে তৈরি। "দে মা আমায় তহশিলদারি" "একবার কালী নামের দিলে বেড়া ফসলে তছরুপ হবে না" ইত্যাদি পদে তহশিলদারি, তসরুপের মতো আটপৌরে শব্দচয়ন করেছেন রামপ্রসাদ সেন। এছাড়াও, যাবনি মেশাল বাংলা, যেমন খাস তালুক, উকিল, মেজিস্টারি, ডিক্রীজারি, নিলাম জারি, জমিদারি, সরকারি, ভূতের বেগার খাটা, হুজুরে-দরখাস্ত ইত্যাদি অসংখ্য চলতি শব্দ, শত বৎসরের মুসলমানি শব্দ ও তদানীন্তন ইংরেজ-রাজ বলবৎ থাকায়, হঠাৎ করেই বাংলার অন্দরমহলে ঢুকে পড়া কিছু বেগানা ইংরেজি শব্দকে দারুণ চাতুর্যে ও পাণ্ডিত্যে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের মতোই ব্যবহার করেছিলেন সাধক রামপ্রসাদ সেন। সাধক কমলাকান্তও এর অনুকরণ করেছেন। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলামের শ্যামাসংগীতে লোকায়ত বাংলা শব্দের পরিবর্তে চিরায়ত শব্দচয়ন যেন তাঁর কাব্যলক্ষ্মীর অকৃপণ দান গ্রহণের সাক্ষী। "অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারী" রাগ আহির ভৈরবে গাওয়া শিব-সংগীত, কিংবা "ব্রজগোপী খেলে হোরি" ইত্যাদি সংগীতের শব্দচয়ন যেকোন ভাষার শ্রেষ্ঠ কবিদের ধ্রুপদী কবিতায় ঘটে থাকে কেবল; এইক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলাম চাইলেই পারতেন রামপ্রসাদী প্রয়োগ ঘটাতে, আরবি-ফারসি ভাষা রামপ্রসাদ সেনের চেয়ে কিছু কম জানতেন না কাজী নজরুল ইসলাম, কিন্তু তিনি তা না করে হেঁটেছেন নিজের তৈরি কাব্যিক কক্ষে। সাধক রামপ্রসাদের ভাষা ললিত, কাজী নজরুল ইসলামের ভাষা ওজগুণসম্পন্ন; রামপ্রসাদ রূপকের প্রয়োগ করে তৈরি করেন লোকায়ত দৃশ্যপট; রামপ্রসাদের একেকটা পদ যেন পটে আঁকা চিত্র; পক্ষান্তরে কাজী নজরুলের ইসলামের অন্তর্ভেদী শব্দ কেন্দ্রকে বিচ্ছুরিত করে ছড়িয়ে পড়ে, যেন ক্যানভাস ছাপিয়ে রং গড়িয়ে যায়, দৃশ্য থেকে গড়িয়ে যায় অর্থদ্যোতনার দিকে। রামপ্রসাদে আছে ভক্তিরসের আতিশয্য, নজরুলে আছে পরিমিতি; এই কারণেই যে রামপ্রসাদ মূলতই সাধক, কাব্যসংগীত তাঁর সাধনার পথে হয়ে ওঠা বিষয়; আর নজরুল মূলতই কবি, কাব্যসিদ্ধির পথে তাঁর সাধনাকে ছোঁবার প্রয়াস। তবে একটা ব্যাপারে উভয় কবি বড়ো অভিন্ন, আর তা হচ্ছে ভাবের বিহ্বলতা। শ্যামা নামে উভয়ের চিত্তে যেই ভাব জেগেছে, একে পৃথক করার সক্ষমতা তাত্ত্বিকের নাই। যেন চিনির দানা চিনিতে মিশে গেছে, এইজন্যেই রসের এই অভিন্নতা তৈরি হয়েছে দুই কবির মধ্যে। এইকথা বলা সত্যের অপলাপ নয় যে, রামপ্রসাদ যদি শ্যামা-সংগীতের শ্রেষ্ঠ আদিপুরুষ হন, কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর শ্রেষ্ঠ উত্তরপুরুষ।

শ্রীরামকৃষ্ণের প্রভাব ও নজরুলের শ্যামাপ্রীতি

কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন কালীভক্ত, এমনকি কালীভক্তদেরও ভক্ত। পরমপুরুষ শ্রী রামকৃষ্ণ ভারতবর্ষে যুগস্রষ্টা মহাত্মাগণের একজন; দক্ষিণেশ্বর শাক্ত-মার্গের প্রধানপুরুষদের মধ্যে অন্যতম; কালীকে আশ্রয় করেই যার মহাযোগের সিদ্ধি; তাঁর যুগে এবং তাঁর পরবর্তীকালের মহাপুরুষদের মধ্যে কে না ভক্তি করেছেন তাঁকে? রামকৃষ্ণ পরমহংসের সর্বধর্ম সমন্বয়বাদী দর্শন, 'যত মত তত পথ' -এর মতো উদারনীতিক দর্শন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও আগেপরের লেখক-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী, সাধক সকলকেই অনুপ্রাণিত করেছে। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সমগ্রজীবনে যে গুটিকয়েক মানুষের স্তুতি রচনা করেছেন, তন্মধ্যে শ্রীরামকৃষ্ণ অন্যতম। নজরুল বিরচিত, "জয়তু শ্রীরামকৃষ্ণ নমো নমঃ / সর্ব-ধর্ম-সমন্বয়কারী নব-রূপে অবতার পুরুষ পরম।" এই গানে রামকৃষ্ণ কথামৃতকে 'কলির নববেদ' অর্থাৎ কলিযুগের নতুন বেদ বলে ঘোষণা করেছেন নজরুল, এবং বলেছেন এই গ্রন্থ একাধারে রামায়ণ, গীতা। রামকৃষ্ণের প্রতি গভীর অনুরাগের যথেষ্ট কারণও ছিলো তাঁর। কাজী নজরুল ইসলাম ধর্মের তথাকথিত আচারসর্বস্ব সংকীর্ণতাকে উপেক্ষা করে, নতুন কালের, নতুন মানুষের উপযোগী ঔদার্যপূর্ণ এক মতের সন্ধান করেছেন, রামকৃষ্ণই ছিলো তাঁর প্রেম-নদীয়ার সেই নব-গৌরাঙ্গ; জ্ঞান-নদীয়ার কৃষ্ণানন্দ। শ্রীরামকৃষ্ণ ও তাঁর আরাধ্য দেবীকে বন্দনা করে কবি উদ্বোধন করেছেন ভারত-শক্তির আদ্যাকেই। যখন দক্ষিণেশ্বরের কালী কল্পতরুকে আহ্বান করেছেন নজরুল তখন রামকৃষ্ণই ছিলেন তাঁর ভাবের গুরু, যোগের উপায়, তাঁর প্রকৃতিচিত্তের পরমপুরুষ; "আমার মা ত্বং হি তারাতুমি ত্রিগুণধরা পরাৎপরাআমি জানি মা ও দীনদয়াময়ীতুমি দুর্গমেতে দুঃখহরা।"

তারাভাব ও বাৎসল্য: নজরুলের শ্যামাসাধনার শেষ কথা

তারা ভাবের আরো কিছু পদ রচনা করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম; মধ্যযুগের কোন এক অজ্ঞাতনামা কবির জনমধন্য একটি পদ বহুকাল ধরে গেয়েছেন শাক্ত কবিগণ, তা হচ্ছে, "আমি এই ভয়ে মুদি নে আঁখি/ নয়ন মুদিলে পাছে তারা হারা হয়ে থাকি/ যখন থাকি শয়নে, তখন এই ভয় মনে/ না হেরে হারাই পাছে, চাহিয়ে ঘুমায়ে থাকি।" এরই অনুরূপ নজরুল লিখেছেন, "থির হয়ে তুই বস দেখি মা, খানিক আমার আঁখির আগে/ দেখব নিত্য লীলাময়ী-মা থির হলে তুই কেমন লাগে।" দক্ষিণেশ্বর তারাপীঠের সাধকগণই শাক্তমার্গে ভক্তিরসকে বাৎসল্যে রূপান্তরিত করে তুলেছিলেন, নজরুলের শাক্ত-পদেও এর প্রভাবই বেশি, ফলে একথাও জোর দিয়ে বলা যায়, যে, কাজী নজরুল শ্যামার এই বাৎসল্যভাবটি তারাপীঠ থেকেই পেয়েছেন। দেবী তারাকে শাক্ত-পদের কবিগণ ইচ্ছাময়ী তারা, বাঞ্ছাকল্পতরু, বড়মা নানা নামে ডেকেছেন। কাজী নজরুল ইসলামও ইচ্ছাময়ীকে নিয়ে পদ বেঁধেছেন; শ্যামা, উমা, কালী, নানান রূপের পাশে তারার জয়গান করেছেন। কালী নজরুলের কাছে আদি-কারণ শক্তিরূপিণী; তারা যেন মায়া-চঞ্চলা জগন্মাতা; উমা কন্যারূপিণী, আর শ্যামা তাঁর অন্তিমের আশ্রয়। যখন মৃত্যু এসে গ্রাস করে নেবে, তখন আঁচল বিছিয়ে কোলে তুলে নেবে তাঁকে শ্মশানের শ্যামা। শ্যামা একইসঙ্গে মাতৃ-কন্যারূপিণী। লোলজিহ্ব যোগিনী বেষ্টিত প্রলয়নৃত্যরতা কালীর সঙ্গে নজরুলের যতোটা যোগাযোগ; শান্ত, নবমেঘ-শ্যামলকান্তি শ্যামার সঙ্গেই তাঁর ভাবখানা বেশি। চতুর্দশীর অমাবস্যায়য় নয়, জ্যোৎস্নার লাস্যেই তাঁর পূজার আয়োজন করেন নজরুল; সেই পূর্ণশশী যেন শ্যামার মুখ। ভক্তির নয়নলোরে শ্যামার দীপ-আরতি করেন কবি নজরুল। তাঁর শ্যামাপ্রীতি ভাবুকের চিত্তে ভাবোন্মাদনা এনে দেয়; যখন নজরুল গেয়ে উঠেন; "আমার লেখাপড়া হলো না মাআমি 'ম' দেখিতেই দেখি শ্যামাআমি 'ক' দেখিতেই কালী ব'লেনাচি দিয়ে করতালি।" তখন, শ্যামাভক্ত কোন সাধক আর স্থির থাকতে পারেন? এমনই ভাবোন্মাদনায় মত্ত হয়ে, নজরুলের সঙ্গে শ্যামাভক্ত মাত্রই গেয়ে উঠবেন এই সংগীত, আর তখন, ব্রহ্মময়ীর নামই পরমব্রহ্ম হয়ে দেখা দেবে; এইসব পরমবাক্য সাক্ষ্য দেয়, সাধক কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের শ্যামাপ্রাপ্তিই তাঁর ভাগবৎ-প্রাপ্তি।