নিঃসঙ্গ নক্ষত্রের প্রেমে ইসিদোরা: পরিণামহীন ভালোবাসার গল্প
নিঃসঙ্গ নক্ষত্রের প্রেমে ইসিদোরা: পরিণামহীন প্রেমের গল্প

পৃথিবীতে সবচেয়ে পরিণামহীন প্রেম করেছিল ইসিদোরা মোরালেস। আকাশের দূর কোণে এক নিঃসঙ্গ নক্ষত্রের প্রেমে পড়েছিল সে। কোনো উপমা বা রূপক নয়; ইসিদোরা আক্ষরিক অর্থেই একটি নক্ষত্রের কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল। তার হৃদয়ের সব উষ্ণতা, সব ভালোবাসা ধাবিত হয়েছিল অন্ধকার আকাশে জ্বলজ্বল করা এক নক্ষত্রের দিকে।

নক্ষত্রটির আলো ছিল ঈষৎ নীলচে, যেন নীলাভ আগুন জ্বলছে তার বুকে—উত্তাপহীন নীলাভ আগুন। ইসিদোরা সেই নীলাভতায় নয়, বরং নক্ষত্রটির নিঃসঙ্গতায় মুগ্ধ হয়েছিল। নক্ষত্রটি একেবারে একা ছিল, যা বিরল। নক্ষত্রেরা সাধারণত কোনো না কোনো ছায়াপথে পরিবারবদ্ধ হয়ে থাকে, কিন্তু এই নক্ষত্রটি জন্মেছিল প্যানডোরা ক্লাস্টারের ওপারে এক আয়নিক কুয়াশায় ঢাকা নিথর অঞ্চলে, একটি স্পাইরাল গ্যালাক্সির বাইরের বাহুতে। পরে ভাগ্য আর অভিকর্ষের খেয়ালে তা গ্যালাক্সি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে, এখন এক ছায়াপথ থেকে আরেক ছায়াপথের মাঝখানের শূন্যতায় অভিমানবশে ভেসে চলেছে—একা, সংস্রবহীন।

নক্ষত্রের নামকরণ ও ইসিদোরার দিনলিপি

নক্ষত্রটির কেতাবি নাম এজিসি ওয়ান-নাইন-এইট-সেভেন-বিএল-ওয়ান-টু। কিন্তু ইসিদোরা এটিকে ডাকে ‘এল আজুল সোলো’—নিঃসঙ্গ নীলাভতা। তার দিনলিপির পাতায় পাতায় লেখা এই নক্ষত্রের কথা। প্রায় প্রতিদিন সে কিছু না কিছু লেখে। কী লেখে? মানুষের ভাষার সীমাবদ্ধতা, ‘নিঃসঙ্গতা’ শব্দটির অর্থহীনতা আন্তনাক্ষত্রিক মাপকাঠিতে। এল আজুল সোলোর চারপাশে নিঃসীম, নিষ্ঠুর, নিরাবেগ শূন্যতা ছড়িয়ে আছে নিযুত ক্রোশজুড়ে। এর সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী একটি অশ্বখুরাকৃতি সোনালি নীহারিকা সাড়ে চার হাজার আলোকবর্ষ দূরে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইসিদোরা ‘বুভেত’ দ্বীপের কথাও লিখেছে—আটলান্টিক মহাসাগরে পৃথিবীর নিঃসঙ্গতম দ্বীপ, যার সবচেয়ে কাছের মনুষ্যবসতি দুই হাজার কিলোমিটার দূরে। কিন্তু বুভেত দ্বীপও এল আজুল সোলোর নিঃসঙ্গতার কাছাকাছি যেতে পারে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইসিদোরার শৈশব ও জ্যোতির্বিদ্যার প্রতি আগ্রহ

ইসিদোরার বাবা মরিসিও মোরালেস একজন শৌখিন জ্যোতির্বিদ। উত্তর চিলির বন্দর শহর আন্তোফাগাস্তার নিভৃত শহরতলি কোভিয়েফির বাড়ির ছাদে তারা টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশ দেখতেন। ইসিদোরার বয়স যখন ১২, একদিন মরিসিও তাকে কারিনা নক্ষত্রপুঞ্জের নক্ষত্র কেনোপাস দেখিয়েছিলেন, বলেছিলেন প্রাচীন নাবিকেরা কীভাবে তা দেখে সমুদ্রপথ চিনত। আরেকবার এরিদানুস নক্ষত্রপুঞ্জের নীলাভ সাদা নক্ষত্র আচেরনারকে চিনিয়েছিলেন। অত্যন্ত উষ্ণ এই নক্ষত্র বন বন করে ঘোরে।

ইসিদোরার বয়স যখন সাড়ে ১৩, একদিন মরিসিও আকাশের একটা শূন্য অংশের দিকে টেলিস্কোপ তাক করে মেয়েকে বলেন, ‘এইখানে চোখ রাখ। কী দেখছিস?’ সেদিনই প্রথম ইসিদোরা এল আজুল সোলোকে দেখেছিল—একটা নীলাভ বিন্দু, কালো আকাশের পটভূমিতে। শুরুতে টেলিস্কোপ আউট অব ফোকাস থাকায় ঘোলা লাগছিল, তারপর ধীরে ধীরে ফোকাস ঠিক হলে ফুটে ওঠে নক্ষত্রটি।

প্রেমের ব্যাখ্যা ও মহাকাশযাত্রা

ইসিদোরা কখনো তার মুগ্ধতার ব্যাখ্যা খুঁজতে যায়নি। তোমাস রিকেলমে নামের এক ছেলে তার ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকত, কিন্তু ইসিদোরা তা খেয়াল করেনি। সে শুধু বলেছে, নীলাভ আলোর কারণ সম্ভবত নক্ষত্রটির জঠরের দানবীয় উষ্ণতা—কেন্দ্রের উষ্ণতা ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস, যেখানে হাইড্রোজেন আয়নের ফিউশন ঘটে হিলিয়াম আয়ন তৈরি হচ্ছে।

ইসিদোরার প্রেম পরিণামহীন, কিন্তু তা আকারহীন থাকেনি। ২০৪৭ সালে নাসা ভয়েজারের তৃতীয় মিশন পাঠায় অনন্ত নক্ষত্রপুঞ্জের উদ্দেশে। ১৯৭৭ সালের প্রথম ও দ্বিতীয় মিশনে মানবসভ্যতার কিছু শব্দ রেকর্ড করে পাঠানো হয়েছিল। এবার তৃতীয় মিশনে এক মনুষ্যযাত্রী আরোহী হিসেবে যুক্ত হয়। একমুখী যাত্রায় ভলান্টিয়ার পাওয়া নিয়ে সন্দিহান ছিল নাসার জেট প্রোপালশন ইউনিট, কিন্তু বিজ্ঞাপন দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে ইসিদোরা আগ্রহ প্রকাশ করে।

২০৪৭ সালের ৪ আগস্ট উৎক্ষেপণ করা হয় ভয়েজার-৩ মিশন। ইসিদোরা চেয়েছিল তার প্রেমিকের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছাতে। কিন্তু তাদের মাঝখানে নিঃসীম দূরত্ব—পৃথিবী থেকে ওই নক্ষত্রের দূরত্ব প্রায় পাঁচ লাখ আলোকবর্ষ। আর সময়ের দেয়ালও আছে: ইসিদোরা সবসময় তার প্রেমিকের পাঁচ লাখ বছর অতীতের ছবি দেখেছে। যেদিন সে রওনা হয়, সে নিশ্চিত জানত না যে নক্ষত্রটি তারও বহু বছর পূর্বে এক বিশাল সুপারনোভায় বিস্ফোরিত হয়ে শূন্যে বিলীন হয়ে গেছে কি না।

পৃথিবীতে ইসিদোরার মতো এত পরিণামহীন প্রেম কেউ করেনি। এমন পরিণামহীন মিলনযাত্রাও আর কখনো ঘটবে না।