১৯৬১ সালে ঢাকায় রানি এলিজাবেথ: সাইদা খানমের ক্যামেরায় এক ঐতিহাসিক সফরের কাহিনী
রানি এলিজাবেথের ঢাকা সফর: সাইদা খানমের ক্যামেরায়

১৯৬১ সালে ঢাকায় রানি এলিজাবেথ: সাইদা খানমের ক্যামেরায় এক ঐতিহাসিক সফরের কাহিনী

১৯৬১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথ ও এডিনবরা ডিউক ঢাকায় পদার্পণ করেন। সেই সময় ঢাকা ছিল প্রাদেশিক রাজধানী, কিন্তু গাছগাছালিতে ছাওয়া ও মফস্বল শহরের মতো পরিবেশে আবৃত। বড় বড় অট্টালিকার অভাব ছিল স্পষ্ট। রানির আগমন উপলক্ষে শহর উৎসবমুখর হয়ে ওঠে, আর এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত ধারণ করতে এগিয়ে আসেন সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকার আলোকচিত্রী সাইদা খানম।

সাইদা খানমের সংগ্রাম ও নিরাপত্তা পাসের যাত্রা

রানির আগমনের সংবাদ সাইদা খানম পেয়েছিলেন ঢাকার বিখ্যাত স্টুডিও জাইদী ফটোগ্রাফার্সের স্বত্বাধিকারী সগীর আলী জাইদীর কাছ থেকে। উত্তেজনা ও চিন্তায় তাঁর ঘুম হারাম হয়ে যায়, কারণ প্রেস ফটোগ্রাফার ছাড়া রানির কাছে যাওয়া সম্ভব ছিল না। নিরাপত্তা পাসের জন্য তিনি বেগম সম্পাদক নূরজাহান বেগম ও সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের শরণাপন্ন হন, কিন্তু তাঁরা নিরুপায় ছিলেন। তাঁরা শুধু তাঁর যোগ্যতার সনদ দিতে পেরেছিলেন।

সেই সনদ নিয়ে সাইদা খানম তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাদেশিক জনসংযোগ ও প্রচার বিভাগে যান, যেখানে তাঁকে দিনের পর দিন ঘোরানো হয়। পরে তিনি বুঝতে পারেন, এই সময়ে তাঁর সম্পর্কে পুলিশি তদন্ত চলছিল। অবশেষে প্রেস কার্ড হাতে পেয়ে আনন্দিত হলেও, অস্থিরতা বেড়ে যায়। এই বড় অ্যাসাইনমেন্টের জন্য তিনি গোলাম কাসেম ড্যাডির কাছ থেকে সাহস ও পরামর্শ নেন।

তেজগাঁও বিমানবন্দরে রানির অভ্যর্থনা

নির্ধারিত সময় বিকেল চারটার আগেই সাইদা খানম তেজগাঁওয়ের পুরোনো বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখানে শতাধিক দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও প্রেস ফটোগ্রাফারের মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র বাঙালি নারী। পৌনে চারটায়, মেঘাচ্ছন্ন আকাশে রানির বিমান দৃশ্যমান হলে, জনতা উল্লাস করতে থাকে। বিমান অবতরণের মুহূর্তে আকাশ মেঘমুক্ত হয় এবং পশ্চিম দিকে সূর্যের দেখা মেলে।

সাইদা খানমের পাশে দাঁড়ানো এক সাহেব তাঁর লেন্স ঢেকে রাখেন, যা দেখে তাঁর হাসি পায়। সাহেব তাঁকে আলো জ্বললে ছবি তোলার সুযোগ দেন। রানিকে মানপত্র দেওয়া হয়, যা বাংলায় পাঠ করেন খাজা খায়েরউদ্দীন এবং ইংরেজিতে তর্জমা করেন সালাহ উদ্দিন আহমদ। রানি ইংরেজিতে অভিভাষণ দেন, যার বাংলা তর্জমা পেশ করেন বেগম খুরশেদা আলম। ঢাকার নাগরিকরা রানিকে দেড় শ বছরের পুরোনো একটি আতরদান উপহার দেন।

রানির বক্তব্য ও ঢাকার প্রতি শ্রদ্ধা

রানি এলিজাবেথ তাঁর বক্তব্যে বলেন, পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে তিনি অনেক কিছু শুনেছেন, যেমন বড় নদী, উর্বর ভূমি এবং আতিথেয়তার খ্যাতি। তিনি ঢাকার সবুজ পল্লি অঞ্চল ও হৃদয়স্পর্শী অভ্যর্থনার প্রশংসা করেন। রানি আরও উল্লেখ করেন যে তাঁর স্বামী পূর্বে এখানে সফর করেছেন এবং ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি জ্ঞান ও শিল্প উন্নয়নের প্রচেষ্টা তাঁকে আনন্দিত করেছে। তিনি ব্রিটেনের জনসাধারণের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানান এবং আতরদানটিকে স্মরণীয় উপহার হিসেবে গ্রহণ করেন।

সাইদা খানমের ছবি তোলার চ্যালেঞ্জ ও সাফল্য

রানি লালগালিচায় পা রাখার সময়, সাইদা খানমের ফ্ল্যাশ কাজ করেনি। তিনি দ্রুত অন্য ক্যামেরায় হাইস্পিড ফিল্ম ভরে ছবি তুলতে সক্ষম হন। পরে ফিল্ম ডেভেলপ করে দেখেন, বিনা ফ্ল্যাশে তোলা সব ছবিই শার্প হয়েছে। রমনা পার্কে নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে, আতশবাজির আলোয় রানির মুখমণ্ডল অপূর্ব দেখাচ্ছিল। সাইদা খানম লেন্সের মাধ্যমে রানিকে দেখতে গিয়ে অন্ধকার দেখেন, কিন্তু পরে রহস্য সমাধান হয়।

অনুষ্ঠান শেষে মানুষের ভিড়ে সাইদা খানম নিচে পড়ে গেলে, একজন ফটোসাংবাদিক তাঁকে উঠতে সাহায্য করেন। পরের দিনগুলোতে রানি চট্টগ্রাম যান এবং নৌভ্রমণে বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার সৌন্দর্য উপভোগ করেন। সাইদা খানম লঞ্চ থেকে রানির ছবি তুলতে সক্ষম হন, এমনকি আদমজী জুট মিলে কাছাকাছি থেকে ফ্রেম ধরে নেন।

বিদায়ের আগের দিনের স্মরণীয় মুহূর্ত

বিদায়ের আগের দিন, গভর্নর হাউসে ডিনার পার্টির সময়, রানি হীরা বসানো মুকুট ও নেকলেস পরিহিত অবস্থায় হুড খোলা গাড়িতে করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আসেন। সাইদা খানম সেই দৃশ্য তাঁর ক্যামেরায় বন্দী করেন, যা ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। এই সফরটি শুধু রাজকীয় একটি ঘটনা নয়, বরং সাইদা খানমের দৃঢ়তা ও প্রতিভার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।