হজের স্বপ্নভঙ্গ: তিন দশকে মধ্যবিত্তের সামর্থ্য কমে যাওয়ার বাস্তব চিত্র
হজের স্বপ্নভঙ্গ: মধ্যবিত্তের সামর্থ্য কমে যাওয়া

হজের স্বপ্নভঙ্গ: তিন দশকে মধ্যবিত্তের সামর্থ্য কমে যাওয়ার বাস্তব চিত্র

গত এক দশকে হজের খরচ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে, যা এখন মধ্যবিত্তের জন্য এক দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়েছে। তিন দশক আগে, একজন মহাজন তার গ্রামে হজ করে ফিরে এসে স্যুটকেস ভরা উপহার বিতরণ করতেন, যা গ্রামবাসীর গৌরবের বিষয় ছিল। দেড় দশক পরে, লেখকের বাবা হজে গিয়ে শুধু ধর্মীয় কর্তব্য পালন করেছিলেন, কোনো উপহার আনতে পারেননি। আর বর্তমান প্রজন্মের ছেলে হজই করতে পারছে না। এটি একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের সামর্থ্য কীভাবে কমে এসেছে, তারই একটি বাস্তব চিত্র।

হজের খরচ বৃদ্ধি ও গড় আয়ের অসামঞ্জস্য

২০১৫ সালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজের খরচ ছিল তিন লাখ টাকার নিচে। এক দশকের ব্যবধানে ২০২৬ সালে এসে একই মানের খরচ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ টাকার কাছাকাছি। গত ১০ বছরে হজের খরচ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। অথচ এই সময়ে দেশের মানুষের গড় আয় কি দ্বিগুণ হয়েছে? প্রশ্ন ওঠে, হজ কি এখন শুধু বিত্তশালীদের সংরক্ষিত সুবিধা হয়ে দাঁড়িয়েছে?

২০২৬ সালে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮টি কোটার মধ্যে মাত্র ৭৬ হাজার ৫৮০ জন নিবন্ধন করেছেন। অর্থাৎ কোটার ৪৪ শতাংশ খালি পড়ে আছে। জনসংখ্যা বেড়েছে, মানুষের ভক্তিও কমেনি, কমেছে কেবল হজে যাওয়ার ‘সামর্থ্য’।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সৌদি আরবের পরিবর্তিত নীতি ও বাণিজ্যিক চাপ

একসময় হজযাত্রীরা মক্কা-মদিনায় গিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাড়িতে উঠতে পারতেন। অনেকে কাবা চত্বরে ঘুমিয়ে রাত পার করে দিতেন। এখন সৌদি আরবের কড়া নিয়ম, আবাসনের বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় বাড়ি ভাড়া করা বাধ্যতামূলক। তার ওপর কাবা শরিফের আশপাশের পুরোনো ও সাশ্রয়ী হোটেলগুলো ভেঙে সুউচ্চ সব অট্টালিকা নির্মাণ করা হয়েছে, যার ভাড়া সাধারণ হাজিদের নাগালের বাইরে।

ধীরে ধীরে ধনীদের বেষ্টনীতে আটকা পড়ে যাচ্ছে কাবা। সাদা ইহরাম যেন এখন আর সাম্যের প্রতীক নয়; বিত্তের পতাকা—ধনী-নির্ধন বৈষম্যের উজ্জ্বল বিভাজিকা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিমানভাড়া ও মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব

হজ খরচের একটি বিশাল অংশ গ্রাস করে বিমানভাড়া। ঢাকা-জেদ্দা রুটে সাধারণ সময়ে যে ভাড়া লাগে, হজের মৌসুমে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়। বর্তমান সরকার বিমানভাড়া কিছুটা কমানোর ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে লাগাম পরাবে কে? বিমান প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে বিমানভাড়া আরও ২০ হাজার টাকা কমানোর চেষ্টা চলছে। যদিও মোট খরচের হিসাবে তা ৩ শতাংশের কম, কিন্তু তা-ও কি আদৌ সম্ভব হবে?

বছর বছর মুদ্রাস্ফীতির যোগ তো আছেই। তার ওপর ইরান যুদ্ধে বিশ্বে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া তাদের হজের খরচ ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াচ্ছে। তবে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো নির্দেশ দিয়েছেন যে বাড়তি খরচের বোঝা হাজিদের ওপর চাপানো যাবে না। আমাদের সরকার কি তেমন কোনো সাহসী ভর্তুকির কথা ভাবতে পারবে?

ধর্মীয় অধিকার ও সরকারের ভূমিকা

হজ কোনো পর্যটন নয় যে চাহিদা ও জোগানের ফর্মুলায় এর বিচার হবে। এটি একটি ধর্মীয় আবেগ ও অধিকার। সরকার যদি দ্রুত বিমানভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে না নামায় এবং মুয়াল্লিম ফি কমানোর জন্য সৌদি সরকারের সঙ্গে শক্তিশালী কূটনৈতিক আলোচনায় উদ্যোগী না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কোটা আরও শূন্য হবে। আমরা চাই না আল্লাহর ঘর জিয়ারত কেবল অভিজাতদের বিলাসিতা হয়ে উঠুক। মধ্যবিত্তের কপালে যেন হজের স্বপ্নভঙ্গের দীর্ঘশ্বাস না জোটে। আমরাও কাবার গিলাফ ধরে কাঁদার সুযোগ চাই।

এই অবস্থায়, হজের খরচ নিয়ন্ত্রণ ও সামর্থ্যবান করার জন্য সরকারি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। মধ্যবিত্তের ধর্মীয় স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে সমাজের সকল স্তরের সমন্বিত প্রচেষ্টা আবশ্যক হয়ে পড়েছে।