জন্ম থেকেই দুটি হাত নেই শারীরিক প্রতিবন্ধী ভানু আক্তারের। বয়স ৪৫ হলেও শরীরের গঠন শিশুদের মতো। দুই হাত না থাকলেও কারো সাহায্য ছাড়াই দুই পা দিয়ে সমস্ত কাজ করেন তিনি। পা দিয়েই শুইয়ে সুতা লাগিয়ে তৈরি করেন পুঁতির মালা, ব্যাগ, ফুলের টব, কানের দোলসহ বিভিন্ন সামগ্রী। তার মতে, স্বপ্ন দেখা কোনো অপরাধ নয়, স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দেওয়াই আসল পরাজয়।
জীবনযুদ্ধের শুরু
নীলফামারীর ডিমলা থানার ছাতনাই এলাকায় আব্দুস সাত্তারের মেয়ে ভানু আক্তার। একদিকে প্রতিবন্ধী, অন্যদিকে অভাব অনটন। পরিবার কিংবা আত্মীয়-স্বজন কেউই তার পাশে দাঁড়াননি। এরপরও জীবন যুদ্ধে তিনি হার মানেননি। শিশু ছেলেকে নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন তার স্বাভাবিক মানুষের মতো।
প্রেম, বিয়ে ও পরিত্যাগ
নীলফামারীতেই খোরশেদ আলম নামে এক যুবকের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে তারা পরিবারের অমতে বিয়ে করেন। বিষয়টি পরিবার মেনে নেয়নি। পরে ২০১০ সালে ঘরবাড়ি ও পরিবার ছেড়ে অসীম স্বপ্ন নিয়ে স্বামীর হাত ধরে পাড়ি জমান গাজীপুরে। তখন থেকে গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ী দক্ষিণ হরিনাচালা এলাকায় মনসুর পাঠানের বাড়িতে ভাড়া থাকতে শুরু করেন। পরে ভানু আক্তার একটি ঝুট গুদামে ৫০ টাকা রোজ কাজ নেন। বাসা ভাড়া থেকে নিজে উপার্জন করে স্বামীকে লেখাপড়া করান। পরে সচিবালয়ে চাকরি পান স্বামী খুরশেদ আলম; কিন্তু চাকরি পেয়ে তিনি ভুলে যান তার প্রতিবন্ধী স্ত্রীকে। পরে তালাকও দেন। এতে মাঝপথেই থেমে যায় প্রতিবন্ধী ভানু আক্তারের স্বপ্ন।
পা দিয়ে কারুশিল্প
তবুও জীবন যুদ্ধে হার মানতে রাজি নয় ভানু আক্তার। কারো কাছে সাহায্য চাইবেন না, এমন মানসিকতা নিয়েই তিনি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান। প্রতিবন্ধী থাকলেও নিজের সব কাজ নিজেই করেন। পা দিয়েই তিনি তৈরি করেন ফুলের টব, পুঁতির ব্যাগ, মালা, কানের দোলসহ বিভিন্ন সামগ্রী।
বর্তমান সংগ্রাম
তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা এখন অভাব-অনটন। টানাপোড়েনের সংসারে প্রতিটি দিন তার একেকটি যুদ্ধ। প্রতিদিনের খাবার জোগাতে ও বেঁচে থাকার তাগিদে প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাকে। সূর্য ওঠার আগেই ভানুর দিন শুরু হয়। পেটের তাগিদে ভোরে সংসারের কাজ, রান্নাবান্না, কাপড় ধোয়া, ঘর মোছা শেষ করে ছুটে যান দোকানে।
ছেলের পড়াশোনা ও দোকানের অবস্থা
সংসারে ভানু আক্তারের ১২ বছর বয়সি বিল্লাল হোসেন নামে একটি ছেলেসন্তান রয়েছে। তাকে মাদ্রাসায় লেখাপড়া করাচ্ছেন। দোকানে তেমন মালপত্র না থাকায় বেচাকেনা হচ্ছে না। নিজের তৈরি পুঁতির মালা, ব্যাগসহ বিভিন্ন সামগ্রীর চাহিদা কমে যাওয়ায় খুব অভাব-অনটনেই দিন কাটছে তার।
প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য
কোনাবাড়ী হরিনাচলা এলাকার বাসিন্দা আক্কাস আলী বলেন, "ভানুর দুটি হাত নেই। সম্পূর্ণ কাজকর্ম করেন পায়ের উপর। দুই পা দিয়েই তিনি সব করেন। তিনি ছোট্ট একটি দোকানের উপর নির্ভরশীল। আমরা দেখি পা দিয়েই তিনি পুঁতির মালা, ব্যাগ, পাখা এসব তৈরি করে বিক্রি করেন। তবে এখন এসব বেশি বিক্রি হয় না। খুব অসহায় অবস্থায় আছেন তিনি।"
তার পাশের দোকান ব্যবসায়ী আকরাম হোসেন বলেন, "ভানু একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। তার কর্মসংস্থানের তেমন কিছু নাই। তার স্বামী ছিল, সেই স্বামীও তাকে ছেড়ে চলে যায়। এখন তার একটা ছেলে আছে। ছোট্ট একটা দোকান করে সে চলে। তার আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। সরকারিভাবে কিংবা সমাজের বৃত্তবান কেউ যদি তাকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করত তাহলে সে ভালোভাবে চলতে পারত। আমি দাবি করব, সমাজে সচেতন লোক আছেন তারা যদি ভানুর সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেন তাহলে তিনি উপকৃত হবেন।"
ভানুর নিজের ভাষ্যে
শারীরিক প্রতিবন্ধী ভানু আক্তার বলেন, "আমার অনেক স্বপ্ন ছিল। সব ভেঙে গেছে। অভাব অনটনের কাছে এখন হেরে যাচ্ছি। ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে সংসার চালাতে খুব হিমশিম খাচ্ছি। কারো কাছে হাত পাতবো না ভেবেই ছোট্ট একটি দোকান করেছি। এখন দোকানেও মালপত্র নেই, ফলে বেচাকেনা নেই। পা দিয়ে যেসব সামগ্রী তৈরি করেছি সেগুলো এখন তেমন বিক্রি হয় না। এছাড়া পুঁতির দাম বেশি হওয়ায় এখন লাভ হয় না। আমি ভিক্ষা করতে চাই না। দেশ বা সমাজের কেউ যদি দোকানে কিছু মালপত্র তুলে দিতেন দোকানের পুঁজিটা বাড়ত। তাহলে হয়তো একটু ভালোমতো চলতে পারতাম। আমার দুটি হাত না থাকলেও আমি স্বাভাবিক সুস্থ মানুষের মতো সংসারের সব কাজকর্ম নিজেই করি।"



